ধর্মগ্রন্থগুলোতে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্ব কি আধুনিক "বিগ ব্যাং" তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? (Part- 1)


এই বিষয়টা পরিষ্কারভাবে বুঝতে হলে আপনাকে আগে জানতে হবে সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে ধর্মগ্রন্থগুলোতে কি বলা হয়েছে। তাহলে চলুন দেখে নেয়া যাক, পৃথিবীর প্রধান চারটি ধর্মগ্রন্থ বেধ, কোরান, বাইবেল ও ত্রিপিটকে সৃষ্টিতত্ত্বকে কিভাবে বর্ণনা করা হয়েছে ।

এই প্রশ্নের উত্তরটা একবারে দিতে গেলে লেখাটা বিশাল বড় হয়ে যাবে, এবং এতে অনেকেই পড়ার ধৈর্য হারিয়ে ফেলবে, তাই আমি চারটি আলাদা আলাদা পর্বে উত্তরটা দিতে চেষ্টা করবো। এই পর্বে আমি শুধুমাত্র হিন্দুধর্মগ্রন্থে বর্ণিত সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করবো।



সনাতন ধর্ম অনুযায়ী সৃষ্টিতত্ত্বঃ

প্রাচীন ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃত সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হলো বেদ যা বৈদিক সংস্কৃত ভাষায় রচিত এবং এটি হলো সনাতন ধর্মের সর্বপ্রাচীন পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। অনেক মনিষীর মতে, এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম সাহিত্য। এই বেদ তথা বৈদিক ধর্মগ্রন্থের সংখ্যা আবার চারটি। যথাঃ ঋগ্বেদ, যযুর্বেদ, সামবেদ,ও অথর্ববেদ এরা একসাথে 'বেদ' নামে পরিচিত।

ঋগ্বেদে "নাসাদিয় সূক্ত" "হিরণ্যগর্ভ সূক্ত" নামে দুটি সূক্ত আছে যা সৃষ্টি তত্ত্বের একটি চমৎকার বর্ণনা দেয়। ঋগ্বেদের নাসাদিয় সূক্তে বর্ণিত সংহিতাগুলো নিম্নরূপঃ


ঋগ্বেদ ১০/১২৯/১

"তৎকালে যাহা নাই তাহাও ছিলো না,

যাহা আছে তাহাও ছিলো না। পৃথিবী ও ছিলো না, অতি দূরবিস্তৃত আকাশও ছিলো না। আবরণ করে এমন কি ছিলো? কোথায় কাহার স্থান ছিলো?

দুর্গম ও গম্ভীর জল কি তখন ছিলো?"

ঋগ্বেদ ১০/১২৯/২

"তখন মৃত্যু ছিল না, অমরত্ব ছিল না; রাত্রি ও দিনের প্রভেদ ছিল না। কেবল সেই একমাত্র বস্তু বায়ুর সহকারিতা ব্যতিরেকে আত্মা মাত্র অবলম্বনে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস যুক্ত হয়ে জীবিত ছিলেন। তিনি ব্যতীত আর কিছুই ছিল না।"


ঋগ্বেদ ১০/১২৯/৩

"সর্বপ্রথম অন্ধকার দ্বারা আবৃত ছিল। সমস্তই চিহ্নবর্জিত ও চতুর্দিক জলময় ছিল। অবিদ্যমান বস্তু দ্বারা সে সর্বব্যাপী আচ্ছন্ন ছিলেন। তপস্যার প্রভাবে এক বস্তুর জন্ম নিলেন। সেখান থেকে প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হল।"

ঋগ্বেদ ১০/১২৯/৪

সর্বপ্রথম মনের ওপর কামের আবির্ভাব হইলো,তাহা হইতে সর্বপ্রথম উৎপত্তির কারণ নির্গত হইলো । বুদ্ধিমানগন বুদ্ধির দ্বারা আপন হৃদয়ে পর্যালোচনাপূর্বক অবিদ্যমান বুস্তুতে বিদ্যমান বস্তুর উৎপত্তি স্থান নিরুপন করিলেন।


ঋগ্বেদের হিরণ্যগর্ভ সূক্তে বর্ণিত সংহিতা নিম্নরূপঃ


ঋগ্বেদ ১০/১২১/১

"সর্বপ্রথম হিরণ্যগর্ভই সৃষ্টি হল অর্থাত্‍ সর্বপ্রথম জলময় প্রাণের উত্‍পত্তি হয়। এখানে প্রথম প্রাণকে প্রজাপতি (ব্রহ্মা) বলা হয়েছে।"

ঋগ্বেদ ১০/১২১/৭

"ভূরি পরিমাণ জল সমস্ত বিশ্বভূবন আচ্ছন্ন করিয়াছিল, তাহারা গর্ভধারণপূর্বক অগ্নিকে উত্‍পন্ন করিল ; তাহা হইতে দেবতাগনের একমাত্র প্রাণস্বরুপ যিনি, তিনি আবির্ভুত হইলেন।"


আবার ঋগ্বেদের দশম মন্ডলের ৭২ নং সূক্তে বলা হয়েছে -


১) দেবতারা উৎপন্ন হইবার পূর্বকালে ব্রম্মনস্পতি নামক দেবকর্মকারের ন্যায় দেবতাদিগকে নির্মাণ করিলেন। অবিদ্যমান হইতে বিদ্যমান বস্তু উৎপন্ন হইল।

(ঋগ্বেদ,১০/৭২/২)


২) দেবোৎপত্তির পূর্বতনকালে, অবিদ্যমান হইতে বিদ্যমান বস্তু উৎপন্ন হইলো ,পরে উত্তানপদ হইতে দিক সকল জন্মগ্রহণ করিল।

(ঋগ্বেদ, ১০/৭২/৩)


৩) উত্তানপদ হইতে পৃথিবী জন্মিল,পৃথিবী হইতে দিক সকল জন্মিল,অদিতি হইতে দক্ষ জন্মিলেন, দক্ষ হইতে আবার অদিতি জন্মিলেন।

(ঋগ্বেদ, ১০/৭২/৪)


এছাড়াও দশম মন্ডলের ৭২ নং সূক্তের ৫,৬,৭,৮,৯ নং সংহিতাগুলো পড়ে নিতে পারলে আপনাকে বুঝতে সুবিধা হবে যে, এগুলো বিজ্ঞানসম্মত নাকি কাল্পনিক ও উদ্ভট । লেখাটা অনেক বড় হয়ে যাবে, তাই আমি এই ৭২নং সূক্তের পুরোটাই স্ক্রিনশট তুলে দিয়েছি নিচে(প্রথম কমেন্টে) ।


ওপরে ঋগ্বেদের হিরণ্যগর্ভ সূক্ত থেকে আমরা জানতে পারলাম- হিন্দু ধর্মের যে এক ও অদ্বিতীয় সত্তা, তার নাম হলো ব্রহ্ম। ঈশ উপনিষদে ব্রহ্মের প্রকৃতি হিসাবে বলা হয়েছে-

ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাত্ পূর্ণমুদচ্যতে। পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে


সরলার্থ : উহা (পরব্রহ্ম) পূর্ণ, ইহা (নামরূপে স্থিত ব্রহ্ম) পূর্ণ; এই সকল সূক্ষ্ম ও স্থূল পদার্থ পরিপূর্ণ ব্রহ্ম হইতে উদগত বা অভিব্যক্ত হইয়াছে। আর সেই পূর্ণস্বভাব ব্রহ্ম হইতে পূর্ণত্ব গ্রহণ করিলেও পূর্ণই অর্থাৎ পরব্রহ্মই অবশিষ্ট থাকেন।

------------ ঈশ উপনিষদ, শান্তিপাঠ।

[ অতুলচন্দ্র সেন, সীতানাথ তত্ত্বভূষণ, মহেশচন্দ্র কর্তৃক অনূদিত ও সম্পাদিত- উপনিষদের অখণ্ড সংস্করণ থেকে উদ্ধৃত ]

আবার, মার্কেণ্ডয় পুরাণ মতে-

"যা অব্যক্ত এবং ঋষিরা যাকে প্রকৃতি বলে থাকেন, যা ক্ষয় বা জীর্ণ হয় না, রূপ রস গন্ধ শব্দ ও স্পর্শহীন, যার আদি অন্ত নেই, যেখান থেকে জগতের উদ্ভব হয়েছে, যা চিরকাল আছে এবং যার বিনাশ নেই, যার স্বরূপ জানা যায় না, সেই ব্রহ্ম সবার আগে বিরাজমান থাকেন।"

--------- মার্কেণ্ডয় পুরাণ/শ্রীসুবোধকুমার চক্রবর্তৗ।


মহাভারতের সৃষ্টি বর্ণন অনুযায়ী -

এই বিশ্বসংসার কেবল ঘোরতর অন্ধকারে আবৃত ছিল। অনন্তর সমস্ত বস্তুর বীজভূত এক অণ্ড প্রসূত হইল। ঐ অণ্ডে অনাদি, অনন্ত, অচিন্তনীয়, অনির্বচনীয়, সত্যস্বরূপ নিরাকার, নির্বিকার, জ্যোতির্ময় ব্রহ্ম প্রবিষ্ট হইলেন। অনন্তর ঐ অণ্ডে ভগবান্ প্রজাপতি ব্রহ্মা স্বয়ং জন্ম পরিগ্রহ করিলেন। তত্পরে স্থাণু, স্বায়ম্ভু মনু দশ প্রচেতা, দক্ষ, দক্ষের সপ্ত পুত্র, সপ্তর্ষি, চতুর্দশ মনু জন্মলাভ করিলেন। মহর্ষিগণ একতানমনে যাঁর গুণকীর্তন করিয়া থাকেন, সেই অপ্রমেয় পুরুষ, দশ বিশ্বদেব, দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টবসু, যমজ অশ্বিনীকুমার, যক্ষ, সাধুগণ, পিশাচ, গুহ্যক এবং পিতৃগণ উত্পন্ন হইলেন। তত্পরে জল, পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, দশ দিক্, সংবত্সর, ঋতু, মাস, পক্ষ, রাত্রি ও অন্যান্য বস্ত ক্রমশঃ সঞ্চাত হইল।

(অনুবাদঃ কালীপ্রসন্নসিংহ )

ঋগ্বেদ সংহিতা, মহাভারত, মার্কেন্ডেয় পুরাণ , ও উপনিষদসহ অন্যান্য হিন্দুধর্মগ্রন্থগুলোতে সৃষ্টি তত্ত্বকে মোটামুটি এভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে।

এই সকল বর্ণনার আলোকে হিন্দু-সৃষ্টি তত্ত্বের মূল নির্যাসটুকু হলো -

সৃষ্টির আদিতে সবকিছু অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো এবং চতুর্দিক জল দ্বারা আচ্ছন্ন ছিলো। সেখানে পরব্রহ্ম নামক এক সত্তা বিরাজমান ছিলেন। সেই সত্তা প্রকৃতিকে একটি বিশাল অণ্ড বা ডিম্বে রূপান্তরিত করলেন। উক্ত ডিম্ব থেকেই পরবর্তীতে দেবতারা সহ বিশ্বজগতের সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে।


এখন আমরা দেখবো এই হিন্দু সৃষ্টি তত্ত্ব আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা-

মহাবিশ্বের উৎপত্তি ব্যাখ্যায় সবচেয়ে আধুনিক ও উন্নত যে থিওরি বিজ্ঞানীমহলে স্বীকৃতি পেয়েছে সেটা হল - "ইনফ্লেশনারী বিগ ব্যাং মডেল ", যেটা ১৯৮১ সালে বিজ্ঞানী অ্যালেন গুথ সর্বপ্রথম দিয়েছিলেন। এটাকে সংক্ষেপে "ইনফ্লেশন থিওরি" বা "স্ফীতি তত্ত্ব" বলা হয়।

স্ফীতি তত্ত্ব অনুযায়ী-

আমাদের মহাবিশ্ব প্রাকৃতিক উপায়ে কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের মাধ্যমে শূন্য থেকে সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের যাত্রা শুরু হয়েছে এক শূন্য জ্যামিতি থেকে এবং কোয়ান্টাম টানেলিং এর মধ্য দিয়ে উত্তেজিত হয়েছে অশূন্য অবস্থায়। অবশেষে ইনফ্লেশন বা স্ফীতির মধ্য দিয়ে বেলুনের মতো আকারে বেড়ে আজকের অবস্থানে এসে দাড়িয়েছে।

অর্থাৎ সংক্ষিপ্ত ও সহজভাবে বলতে গেলে, সৃষ্টির শুরুতে শূন্যতা বিরাজমান ছিলো। সেই শূন্যতার মধ্যে তেজময় শক্তি বিরাজমান ছিলো। সেই শূন্যতার মধ্যে নিহিত শক্তি থেকে কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন এর মাধ্যমে ভর বা পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে। তারপর সেখান বিগব্যাং এর মাধ্যমে সম্প্রসারিত হতে হতে আজকের অবস্থানে এসেছে এবং এখনো সম্প্রসারিত হয়েই চলেছে।


কিন্তু, হিন্দু সৃষ্টি তত্ত্বের ধারণাকে যদি আমরা এই বিগব্যাং মডেল এর সাথে মিলানোর চেষ্টা করি তাহলে দেখা যায়-

কিছু কিছু কথা বিগ ব্যাং থিওরি র সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় ঠিকই কিন্তু ইহা সৃষ্টির আদিতে জলের অস্তিত্বের কথা বলে আমাদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছে। কারণ, বিগ ব্যাং এর পূর্বে জলের কোন অস্তিত্বই ছিলো না। জলকে ভাঙলে এর যে গাঠনিক উপাদান পাওয়া যায় তা হলো হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন। এই হাইড্রোজেন তৈরি হয়েছে বিগ ব্যাং এর অনেককাল পরে (প্রায় ৩লক্ষ ৮০ হাজার বছর পরে) এবং প্রথম নক্ষত্র তৈরি হতেই সময় লেগেছিল প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন বছর। তারপর আরও কয়েক কোটি বছর পরে প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্রগুলোর সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে তৈরি হয়েছিল কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন সহ অন্যান্য ভারী মৈলগুলো। তারপর আরও বহুকাল পরে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন একত্রিত হয়ে একত্রিত হয়ে জল সৃষ্টি করেছে।

অতএব উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, হিন্দু তথা সনাতন ধর্মাগ্রন্থে বর্ণিত সৃষ্টি তত্ত্ব আধুনিক বিজ্ঞান সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

-----------------------০--------------------

পরবর্তী পর্বে মুসলিমদের পবিত্র গ্রন্থ "কোরান" এ বর্ণিত সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হবে

Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen