• Arean

বিবর্তন তত্ত্ব যে সত্য তার প্রমাণ কি ? (পর্ব-৩)


যারা ১ম ও ২য় পর্ব এখনো পড়েন নি, এখান থেকে পড়ে নিন-

https://www.justanotherbangladeshi.com/post/evidence-of-evolution-part-2


এই পর্বে আমরা শুধুমাত্র জীবাশ্ম বা ফসিল সংক্রান্ত প্রমাণ নিয়ে আলোচনা করবো।


জীবাশ্ম বা ফসিলের প্রমাণঃ

পৃথিবীর লুকানো ধনগুলির একটি হল জীবাশ্ম বা ফসিল। জীবাশ্ম বা ফসিল

হ'ল প্রাচীন জীবগুলির সংরক্ষিত অবশেষ বা ছাপ। প্রাগৈতিওহাসিক যুগের উদ্ভিদ ও প্রাণীর ধ্বংসাবশেষ তথা মৃতদেহের চিহ্ন পাওয়া যায় ভূগর্ভ কিংবা ভূ-পৃষ্ঠের কঠিন স্তরে সংরক্ষিত পাললিক শিলায় অথবা যৌগিক পদার্থে মিশ্রিত ও রূপান্তরিত অবস্থায়। অধিকাংশ জীবিত প্রাণীকুলেরই জীবাশ্ম সংগৃহীত হয়েছে। এছাড়াও, অনেক প্রজাতিরই জীবাশ্ম আবিষ্কৃত  হয়েছে যারা পৃথিবীতে বর্তমানে বিলুপ্ত । ৩৪০ কোটি বছর থেকে দশ হাজার বছর পূর্বেকার তুষার যুগের প্রাণী ও উদ্ভিদ দেহের ধ্বংসাবশেষ জীবাশ্মরূপে সংরক্ষিত আছে। ফসিলগুলি সাধারণত একটি সম্পূর্ণ জীব বা জীবদেহের একটি মাত্র অংশকেও সংরক্ষণ করতে পারে। হাড়, ত্বক, শাঁস, পালক, পদচিহ্ন এবং পাতা সমস্তই জীবাশ্মে পরিণত হতে পারে।

ফসিলগুলি খুব বড় বা খুব ছোটও হতে পারে। মাইক্রোফসিলগুলি কেবল মাইক্রোস্কোপ দ্বারাই দেখা যায়। যেমন, ব্যাকটেরিয়া ও পরাগরেণু হতে পারে মাইক্রোফসিল।


অন্যদিকে ম্যাক্রোফসিলগুলি কয়েক মিটার দীর্ঘ এবং কয়েক টন ওজনের হতে পারে। ম্যাক্রোফসিলগুলি হতে পারে প্রস্তরীভূত গাছপালা বা ডাইনোসরের হাড়। সংরক্ষিত অবশেষগুলি প্রায় 10,000 বছর বয়সে পৌঁছালেই সেগুলো জীবাশ্মে পরিণত হয়। ফসিলগুলো আর্কিয়ান যুগ

(যা প্রায় ৪ বিলিয়ন বছর আগে শুরু হয়েছিল) থেকে পুরো হলোসিন যুগ (যা এখনো অব্যাহত আছে) পর্যন্ত আসতে পারে। ফসিলগুলি বিবর্তনের পক্ষে সব ধরনের প্রমাণ দেয়। ফসিল রেকর্ড জীবাশ্মবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভূতাত্ত্বিকদের বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক যুগে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং প্রজাতির বিবর্তনীয় ইতিহাস সম্পর্কে জানতে সহায়তা করে।

শিলাস্তরে সংরক্ষিত এসব ফসিলের সাথে আধুনিক জীবদের সমসংস্থ অঙ্গানুর মিল থেকে বিজ্ঞানীরা প্রাণের বিবর্তনীয় ইতিহাস সম্পর্কে অনেক পরিজ্ঞান অর্জন করতে পারেন।

Image source: By H. Zell (User:Llez) CC BY-SA 3.0, via Wikimedia Commons


ফসিল রেকর্ডের মাধ্যমে আমরা দেখতে পারি যে তিমিগুলি চার পা ওয়ালা স্থলচর প্রাণী ছিল যারা গিলের পরিবর্তে ফুসফুস থাকা সত্ত্বেও সমুদ্রে বেঁচে থাকার জন্য বিকশিত হয়েছিল। আমরা দেখতে পারি যে বর্তমান সময়ের ঘোড়াগুলি কীভাবে তাদের ক্ষুদ্রকায় পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এসেছে। এমনকি আমরা জীবাশ্মের অবস্থানগুলিকে pangaea 'র মতো প্রাগৈতিহাসিক ভূখণ্ডের কাঠামো তৈরি করতে ব্যবহার করতে পারি।


১৮৫৯ সালে ডারউইন যখন তার অরিজিন অব স্পিসিজ প্রকাশ করেন তখন ফসিল রেকর্ডে খুব বেশি প্রমাণ ছিল না। কিন্তু এর মাত্র দুই বছর পরেই  'আর্কিওপটেরিক্স'র (Archeopteryx) প্রথম নমুনা আবিষ্কৃত হয়, যাকে অনেকে পাখি ও সরীসৃপের মধ্যকার ‘মিসিং লিঙ্ক’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিভিন্ন প্রজাতির প্রচুর সংখ্যক ফসিল আবিষ্কৃত হয়েছে।

বিগত কয়েক দশক ধরে প্রচুর সংখ্যক ফসিলের আবিষ্কারের ফলে জীববিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ডিএনএ গবেষণা থেকে আরো স্পষ্ট হয়েছে কিভাবে এই রেকর্ডগুলো পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ প্রকাশ করে চলেছে।

নিচে ফসিল রেকর্ডের ভিত্তিতে আমরা এখানে তিমি, পাখি, ঘোড়া ও মানুষের বিবর্তন নিয়ে অতি সংক্ষেপে আলোচনা করবো।


১) তিমির বিবর্তনঃ

তিমিগুলো মিলিয়ন বছর ধরে টিকে আছে। এ পর্যন্ত প্রায় ডজনেরও বেশি তিমির ট্রাঞ্জিশনাল ফসিল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই ধরনের প্রাণীর ফসিল পাওয়া অত্যন্ত দুর্লভ। জীবিত প্রজাতিগুলোর ডিএনএ থেকে পাওয়া সূত্র অনুসারে ধরে নেয়া হয় তিমিরা বিবর্তিত হয়েছে artiodactyls (আর্টিওডাক্টাইলস) নামক ক্ষুরবিশিষ্ট এবং সমান আঙুলওয়ালা পায়ের অধিকারী স্তন্যপায়ী প্রাণী হতে। সহজ ভাষায় জলহস্তীর মত প্রাণী থেকে। অর্থাৎ ফসিল রেকর্ডের মাধ্যমে আমরা দেখতে পারি যে এরা চার পা ওয়ালা স্থলচর প্রাণী ছিল যারা গিলের পরিবর্তে ফুসফুস থাকা সত্ত্বেও সমুদ্রে বেঁচে থাকার জন্য বিকশিত হয়েছিল। নিচের ইভোগ্রামের দিকে তাকান এখানে দেখানো হয়েছে কিভাবে বর্তমানের জীবিত তিমিগুলো জলহস্তী জাতীয় ডাঙার প্রাণীদের সাথে সম্পর্কিত।

স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউট এর তৈরী করা এই অ্যানিমেশনটি দেখুন, এতে দেখানো হয়েছে তিমিগুলি কীভাবে ভূমি-বাসিন্দা থেকে আজ আমাদের পরিচিত সামুদ্রিক প্রাণীসমূহে বিকশিত হয়েছিল।

https://ocean.si.edu/through-time/ancient-seas/evolution-whales-animation

নিচের ইভোগ্রামের দিকে তাকান। এতে দেখানো হয়েছে কিভাবে বর্তমানের জীবিত তিমিগুলো জলহস্তী জাতীয় ডাঙার প্রাণীদের সাথে সম্পর্কিত।


এই ইবোগ্রামে প্রথম যে বিষয়টি লক্ষ্য করা যায় তা হল জলহস্তীরা তিমিদের নিকটতম জীবিত আত্মীয়, তবে তারা তিমির পূর্বপুরুষ নয়। প্রকৃতপক্ষে, ইভোগ্রামে পৃথক প্রাণীগুলির কোনটিই অন্য যে কোনটির সরাসরি পূর্বপুরুষ নয়, যতদূর আমরা জানি। এ কারণে তাদের প্রত্যেকেরই জাতিজনি বৃক্ষের নিজস্ব শাখা পাওয়া যায়।


[এ নিয়ে বিস্তারিত লিখবো 'তিমির বিবর্তন' শিরোনামে অন্য আরেকটি পর্বে]


২) পাখির বিবর্তনঃ

সাম্প্রতিক কালে চাইনা, দক্ষিন আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে আবিষ্কৃত ফসিলসমূহের আলোকে এবং সেই সাথে পুরানো জাদুঘরের নমূনাগুলোকে নতুন পদ্ধতি ও নতুন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করে এটা জানা সম্ভব হয়েছিল যে পাখিগুলোর উদ্ভব হয়েছে পুরাতন জুরাসিক যুগের ক্ষুদ্র মাংসাশী ডাইনোসর থেকে। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের আসল আর্কিওপেটেরিক্স কঙ্কালটি "লন্ডন নমুনা" হিসাবে পরিচিত, এবং এর একটি প্রতিলিপি সেখানে পাবলিক ডিসপ্লেতে রয়েছে। সব মিলিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব জার্মানির বাভারিয়ায় প্রায় 15 মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে 10 টি প্রত্নতাত্ত্বিক কঙ্কালের সন্ধান পাওয়া গেছে। জীবাশ্মগুলি সলনোফেন গ্রামের কাছে খুব সূক্ষ্ম চুনযুক্ত পাথরগুলিতে সমাহিত ছিলো (জুরাসিক আমলে, জার্মানির এই অংশটি একটি উষ্ণ, অগভীর উপকূল দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল যা নরম মাটির নীচে ছিল এবং ইহা প্রাচীন জীবাশ্ম সংরক্ষণের জন্য আদর্শ প্রমাণিত হয়েছে)।

Image: ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত Archaeopteryx এর ফসিল


জীবিত পাখির পূর্বপুরুষদের সন্ধান খোঁজা শুরু হয়েছিল 1860 এর দশকের গোড়ার দিকে আবিষ্কৃত প্রথম Archaeopteryx 'র নমুনা দিয়ে যাকে সরিসৃপ ও পাখির মিসিং লিংক হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

পাখিদের মতো এর বাহু এবং লেজসহ পালক ছিল, তবে জীবন্ত পাখিদের মতো নয়। এটির দাঁত এবং একটি দীর্ঘ হাড়যুক্ত লেজও ছিল। তদুপরি, Archaeopteryx 'এর হাত , কাঁধের প্যাঁচ, পেলভিস এবং পায়ের অনেক স্বতন্ত্র হাড় ছিল যা জীবন্ত পাখির মধ্যেও রয়ে গেছে। এই বৈশিষ্টগুলোর উপর ভিত্তি করে Archaeopteryx কে সরীসৃপ ও পাখির মধ্যবর্তী প্রজাতি তথা মিসিং লিংক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

ছবিঃ শিল্পীর রঙতুলিতে আঁকা Archaeopteryx এর একটি কাল্পনিক চিত্র


১৯৭০-এর দশকে, প্রত্নতত্ত্ববিদরা লক্ষ করেছেন যে আর্কিওপটেরিক্স'রা থেরোপড নামে পরিচিত ছোট মাংসাশী ডাইনোসরদের থেকে তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলি পেয়েছে। তাদের শেয়ারকৃত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে সম্ভবত থেরোপড নামক ডাইনোসরগুলোই পাখিদের পূর্বপুরুষ ছিল। পরবর্তীতে এ বিষয়ে আরও জানতে প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন বিবর্তন বৃক্ষ তৈরি করলেন, তখন তারা এ ব্যাপারে আরও দৃড় প্রত্যয়ী ছিলেন। তারা দেখলেন জীবন জীবন বৃক্ষের মাঝে পাখিগুলি হল ডাইনাসর ব্রাঞ্চের কেবল একটি ডালপালা। এই থেরোপড ডাইনোসর থেকে পাখিগুলি বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে তাদের অনেকগুলি বৈশিষ্ট্যই পরিবর্তিত হয়েছে।

[ এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখবো অন্য আরেকটি লেখায় ]


৩) ঘোড়ার বিবর্তনঃ

ঘোড়ার বিবর্তন বিবর্তন তত্ত্বের পক্ষে একটি চমৎকার উদাহরণ হতে পারে।

ঘোড়ার জীবাশ্মগুলি প্রায় ৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে (Uniformitarian ডেটিং অনুসারে) ইওসিন যুগের শুরুর দিকে পাললিক শিলাস্তরের মধ্যে পাওয়া গেছে। এগুলোকে সাধারণত Eohippus হিসেবে লেভেল করা হয়েছে।

Image: Hyracotherium, or

Eohippus' এর fossil

বিবর্তন তত্ত্ব অনুসারে ঘোড়ার বিবর্তনকে মিলিয়ন বছর ধরে অনুসরণ করা সম্ভব। কিভাবে তারা ধীরে ধীরে বড় ও শক্তিশালী হয়ে ওঠেছে তা প্রাপ্ত ফসিলগুলোর আলোকে সহজেই অনুসরণ করা সম্ভব ।

বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত ঘোড়ার পূর্বসূরি ও উত্তরসূরিদের ফসিলগুলো একসাথে সাজিয়ে ফসিলবিদরা ঘোড়ার সাধারণ বংশক্রমটিকে স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন। এই ফসিলগুলো এখন ঘোড়ার বিবর্তন সম্পর্কে বিভিন্ন পূর্বপুরুষের (যার অনেকগুলোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে) অস্তিত্বের প্রমাণসহ বিবর্তনের ধারা সম্পর্কে আমাদেরকে স্পষ্ট চিত্র দেখাতে পারে। আমেরিকার নেব্রাস্কার একটি পাথর খনির শিলাখণ্ডে প্রায় ১২ মিলিয়ন বছর পুরানো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির ঘোড়ার ফসিল দেখা গেছে। একেবারে প্রথম দিকের প্রজাতির ঘোড়াদেরকে (যেমন Hyracotherium or Eohippus যা ৫০ মিলিয়ন বছর আগের ইওসিন যুগের প্রথম দিকের) বংশক্রমের শুরুর দিকের প্রজাতির ঘোড়াদের যেমন Homogalax থেকে আলাদা করা দৃশ্যত সম্ভব নয়। এই Homogalax থেকে আবার টাপির ও গন্ডারের উদ্ভবও হয়েছিল।


৪) মানুষের বিবর্তনঃ

মানুষের বিবর্তন বলতে সেই বিবর্তনকে বুঝায় যা আমাদের প্রজাতি Homo sapiens গঠনে ভূমিকা রেখেছে। কিছু দিন আগেও হোমো গোত্রের ফসিলের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত ছিল। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে ফসিলের আবিষ্কারগুলো আশার আলো নিয়ে এসেছে। আফ্রিকার শাদে ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন বছর পুরনো  Sahelanthropus এর ফসিল আবিস্কৃত হয়। ইথিয়োপিয়ায় ২ থেকে ৫ মিলিয়ন পুরনো রেকর্ডে নতুন গণ  Ardipithecus ও Australopithecus -এর নতুন দুইটি প্রজাতির

(A. anamensis ও A. bahrelghazali) ফসিলও বের করা সম্ভব হয়।

সংক্ষেপে বলা যায় মানুষের ফসিল রেকর্ড এখন অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও সম্পূর্ণ।

এ যাবৎ আবিষ্কৃত মানব ফসিলগুলোর বিস্তারিত তথ্য ও সময় রেখা জানতে ঢু মারুন অস্ট্রালিয়ান মিউজিয়ামের ওয়েবসাইটে। লিংক- https://australian.museum/learn/science/human-evolution/a-timeline-of-fossil-discoveries/ -


---------------------০-----------------------

তথ্যসূত্রঃ

https://www.expii.com/t/fossils-evidence-of-evolution-overview-examples-10255

https://www.researchgate.net/publication/22093853_The_evolution_of_the_horse

https://www.nationalgeographic.org/encyclopedia/fossil/

https://amp.theguardian.com/science/2009/feb/07/archaeopteryx-natural-history-museum-london

https://evolution.berkeley.edu/evolibrary/article/evograms_03


https://blog.mukto-mona.com/2014/04/07/40964/




0 comments
Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen