top of page

সাদা কাঠগোলাপ


আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে সাহানা এক কাপড়ে ঘর ছেড়েছিল আমার জন্য। আমি তখন এক বেকার বোহেমিয়ান। তার দুই মাস আগেই আম্মা রাগ করে বাড়ি থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে।

আম্মার কথা হলো চাকরি বাকরি ই যখন না করবি ঢাকা শহরে থেকে খালি খালি পয়সা নষ্ট ক্যান করবি? অন্তত বাড়ি এসে ব্যাবসা বাণিজ্য কিছু একটা করার চেষ্টা কর, না হলে বাকি জীবনটা কেমনে চলবে তোর? শেষ পর্যন্ত তো কোন কানা খোঁড়া মেয়েও তোকে বিয়ে করতে রাজি হবে না। ঐসব ছবি আঁকা দেখে কি আর পেটের ক্ষুধা মেটে?

সাহানা উচ্চ শিক্ষিতা, ওর গায়ের রং ময়লা মুখচ্ছবি ও তেমন একটা ভালো না, তবে আমার আঁকা ছবির গুণমুগ্ধ দর্শক, ভক্ত ও। সাহানার সাথে এক মায়ার বাঁধনে ধিরে ধিরে আমিও কেমন যেন জড়িয়ে যাই, তখন আর ওর চেহারা গায়ের রং নিয়ে আমার কোন সমস্যা হয় না। বর্ষার প্রথম কদম ফুল নিয়ে আমি সাহানার জন্য অপেক্ষা করি।

যাই হোক সাহানার সাথে বিয়ের পরে আমার সব ভাবনা চিন্তা অনেকটা দূর হয়েছে বলতে হবে। কারণ আম্মা একেবারে ভুল বলেননি, পেটের টান নিয়ে শিল্প সাহিত্যের চর্চাও চলে না। সাহানা চাকরি করতো, সংসারের হাল সেই ধরলো, আর আমি ছবি আঁকার। এই যে আমি এখন দেশের প্রথম সারির চিত্রশিল্পী এই যায়গায় সাহানার অবদান অনেক।

আমার বিয়ের সাড়ে তিন মাস পরে আম্মা ঢাকায় আসলেন। সাহানা তার খুব আদর যত্ন ও করলো, তবু আম্মার মন সারে না, আক্ষেপ, তার অমন রাজপুত্রের মতো ছেলের পাশে এমন কালো কুৎসিত বউ। আমি আম্মাকে বললাম আম্মা সাহানা কালো, রূপবতী না হলেও অনেক গুনী একটা মেয়ে আর মানুষের মনটাই আসল, আম্মাও আস্তে আস্তে আমার কথায় সায় দিলেন। তবে সমস্যা হলো সাহানাকে নিয়ে, আড়াল থেকে সে মা ছেলের কথা শুনে ফেলেছে, আমার উত্তর তার পছন্দ হয় নি।

তার মতে, আমার বলা উচিত ছিল আম্মা সাহানাকে আমি ভালোবাসি, তার বাইরের চেহারা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয়েছে ঐ মূহুর্তে আমি ঐ কথাটা বললে আম্মা আরো রেগে যেতেন, অবশ্য আমি ভুল ও হতে পরি। মানুষের মনের গতিপ্রকৃতি বড়ো বিচিত্র, মেয়েদের ক্ষেত্রে এই বিচিত্রতার ধরন বোধহয় আরো কিছুটা সুক্ষ্ম। এদেরকে ঠিকঠাক চিনতে পারাটা বেশ কঠিন।

আমার জানা মতে একজনই তা পেরেছিলেন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে সেখানেও সমস্যা হচ্ছে তিনিও শুধু বিদেশি মেয়েদেরকেই চিনেছিলেন। নিজের ঘরের মেয়ে যেমন, মা, বউ, কন্যা এদেরকে ঠিকঠাক চিনে বুঝে উঠতে পারাটা অত্যন্ত দূরহ ব্যাপার। অবশ্য মেয়েদের কাছে বিষয়টার উল্টোটাও মনে হতে পারে।

মুখে তেমন কিছু না বললেও সাহানার মধ্যে ধিরে ধিরে আমি বেশ পরিবর্তন দেখেছি ঐ দিনের পর থেকে। তার কাছে আমার গুরুত্ব একটু একটু করে কমার শুরুটাও ঐখান থেকেই। পরে অবশ্য পরিস্থিতি সময়ের সাথে সাথে অনেকটা শীতল হয়েছে তবে বিয়ের পরে প্রথম সাড়ে তিন মাসের সাহানাকে আমি আজ পর্যন্ত খুঁজে পাই নি।

শাওনের জন্মের পরে, সাহানার জীবনের প্রায় পুরোটা জুড়েই বলাযায় তার ছেলে। ছেলের বিষয়ে কোন কিছুতেই নূন্যতম ছাড় দিতেও নারাজ সে। সেইখানেই ঘটেছে যত বিপত্তি।

আজ সাহানার জন্মদিন, কিন্তু গতকাল রাত থেকেই তার মেজাজ রিতিমত তিরিক্ষি হয়ে আছে। কারনটা বাতাসি। আমি অবশ্য ভাবছি কাঠগোলাপের খোঁজে বের হবো। সাহানার প্রিয় ফুল এক নম্বরে কদম দুই নম্বরে কাঠগোলাপ। এখন বর্ষাকাল না তাই কদম পাওয়া সম্ভব না, তাই কাঠগোলাপেই ভরসা।

তার আগে আমাকে একবার বাতাসির বাড়িতে যেতে হবে। বাতাসি শাওনের গার্লফ্রেন্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে শাওনের সাথেই। বাতাসির বাবা একটা সরকারি অফিসের দারোয়ান। শাওনের মোবাইলে যে ছবি পাওয়া গেছে সে অনুযায়ী বাতাসির দেখতে আহামরি সুন্দরী না হলেও অসুন্দর না।

কিন্তু একে তো দারোয়ানের মেয়ে তার ওপর নাম বাতাসি, নাম শুনলেই কেমন সুইপার কাজের বুয়া টাইপ লাগে, দেখতেও আহামরি তেমন কিছু না এমন মেয়েকে নিজের ছেলের বউ হিসেবে কিছুতেই মেনে নেবে না সাহানা পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে। শাওনের ভার্সিটিতে শীতকালীন ছুটি চলছে এখন।

এখন ঘড়িতে দশটা পাঁচ বাজে আমি বাতাসিদের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লাম। বাতাসি দরজা খুলল, আমাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো সে, ভেতরে এসে বসতে বলল।

না আমি একটুও অবাক হয়নি। আজ থেকে পনের বছর আগে হলে হয়তো আমি অবাক হতাম। এখন মোবাইল ফেইসবুকের যুগে কোন দিন দেখেননি, বলতে গেলে একেবারে অপরিচিত মানুষও যদি রাস্তাঘাটে আপনাকে দেখে চিনে ফেলে সেখানেও অবাক হওয়ার তেমন কিছু নেই। সেই যায়গায় বাতাসির আমাকে চিনতে পারাটা খুব স্বাভাবিক।

বাতাসি আমার জন্য গাজর আর বুটের দুই ধরনের হালুয়া গরম গরম রুটি আর চা নিয়ে এলো। বাতাসির মা বেঁচে নেই। বাবা মেয়ের সংসার, রুটি, হালুয়া,চা সেই বানিয়েছে। এপর্যন্ত রুটি হালুয়ায় তাকে আমি একশো তে পঁচাশি দেব। তবে চায়ের জন্য একশো তে একশো পাবে সে।

তার চা খেয়ে, পুরান ঢাকার তাঁতি বাজারে গলির মোড়ে মালেক মিঞার চায়ের কথা মনে পরে গেল আমার এতো দিন পরে। পাশ করার পরে হলের সিট ছেড়ে দিতে হয়েছিল। আমি তখন কয়েক বছর তাঁতি বাজারে একটা মেসে থাকতাম। বিয়ের পরে নতুন ঢাকায় বাসা নিয়েছিলাম সাহানার অফিসের কাছাকাছি। তখন আর মালেক মিঞার চায়ের কথা মনে হয় নি আমার। বছর দশেক পরে একদিন মনে পরলো, খোঁজ নিলাম ততদিনে মালেক মিঞা অন্য ভুবনের বাসিন্দা।

তারপর বহুদিন সেই স্বাদ খুঁজেছি আমি, আজ পেলাম। বাতাসির বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাঠগোলাপ খুঁজে বাসায় ফিরতে ফিরতে তিনটা সাড়ে তিনটা বেজে গেছে । বসার ঘরে দেখলাম মা ছেলের তর্ক চলছে। :পৃথিবী উল্টে গেলেও তোমার বউ হিসেবে ঐ দারোয়ানের মেয়েকে আমি মেনে নেব না, মানুষ তো একটা কিছু দেখে আগায়, হয় রূপ, গুন না টাকা পয়সা, পারিবারিক অবস্থান...... : মা বাতাসিকে আমি ভালোবাসি, তাই ওর বাহ্যিক বা পারিপার্শ্বিক কোন কিছু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার হাতে ধবধবে সাদা কাঠগোলাপ, সাহানার রাগ এরিমধ্যে চরমে উঠে গেছে,কাঠগোলাপে কোন কাজ হবে কিনা জানিনা, আজ সাহানার জন্মদিন। তবে সেসব নিয়ে এই মুহূর্তে আমি ঠিক ভাবছি না, পঁচিশ বছর আগের কোন একটা দিন হঠাৎ আমার চোখের সামনে যেন স্পষ্ট হয়ে উঠলো। শুধু দৃশ্যপট আলাদা, সত্যিই বড়ো বিচিত্র মানুষের মন।

0 comments