কোরানে কি সময়ের আপেক্ষিকতা উল্লেখ আছে?

কোরানের ২২ঃ৪৭, ৭০ঃ০৪৩২ঃঃ০৫ আয়াতের উদ্বৃতি দিয়ে অনেকেই প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে কোরানে নাকি সময়ের আপেক্ষিকতার কথা উল্লেখ আছে।

প্রিয় পাঠক তাহলে চলুন আমরা দেখে নিই কোরানের উপরোক্ত আয়াতে আসলে কি বলা হয়েছে।

কোরান ২২ঃ৪৭----> তারা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি কখনও ভংগ করেননা। তোমার রবের একদিন তোমাদের গণনায় সহস্র বছরের সমান।

কোরান ৭০ঃ০৪----> মালাক/ফেরেশতা এবং রুহ আল্লাহর দিকে উর্ধ্বগামী হয় এমন একদিনে, যা পার্থিব পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।

কোরান ৩২ঃ৫---> তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন, অতঃপর সকল বিষয়াদি তাঁর কাছে পৌছবে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান।


উপরোক্ত আয়াতসমূহের তাফসীর থেকে আমরা জানতে পারি যে এখানে সহস্র বছর বা পঞ্চাশ হাজার বছরের হিসাবটা কিয়ামত দিবসের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ কিয়ামত দিবসের একদিন পৃথিবীর হিসাবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবে। [তাবারী ৬৩/৬০৩]


এবার তাহলে আসুন আমরা জেনে নিই সময়ের আপেক্ষিকতা বলতে আসলে কি বোঝায়।


আইন্সটাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী গতি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে সময় ধীর হয়ে যায়। অর্থাৎ আমারা যখন কোন গাড়িতে দ্রুত বেগে গমন করবো তখন আমাদের গাড়ির ভেতরের সময় ধীর হয়ে যাবে। বিষয়টা একটু সহজ করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।

ধরেন, আপনি বাসে করে একদিন ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় যাবেন।


এখন আপনি যদি ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে ১০ সেকেন্ড যান তাহলে আপনার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে

(দূরত্ব = বেগ >< সময় সূত্রানুসারে)

১০><১০ = ১০০ কি.মি.।

এবার বাসের বেগ দুই গুন বাড়িয়ে ২০ কি.মি./সেকেন্ড করা হলো। স্পেশাল রিলেটিভিটি থিওরি অনুসারে বেগ বৃদ্ধির ফলে সময় ধীরে চলবে। বেগ দ্বিগুণ করার ফলে সময় অর্ধেক হয়ে যাবে। ১০ সেকেন্ডের জায়গায় ৫ সেকেন্ড। ফলে অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে ২০><৫ = ১০০ কি.মি.। এবার আমরা বেগ আরও দ্বিগুণ করে ৪০ কি.মি./সেকেন্ড করে দিলাম। ফলে সময় আরও ধীর হয়ে ২.৫ সেকেন্ড হয়ে যাবে ফলে অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে ৪০>< ২.৫ = ১০০ কি.মি.। এভাবে বেগ যত বাড়ানো হবে সময় তত ধীরে চলবে, কিন্তু আমরা হিসাব করলে দেখতে পাবো অতিক্রান্ত দূরত্ব ঠিকই আছে ।

উল্লেখ্য, এই উদাহরণটি কিন্তু সঠিক না। শুধুমাত্র বুঝানোর সুবিধার্থে বাসের বেগের এই বিষয়টি দেখানো হয়েছে।


সত্যি কথা হল গতিবেগ বৃদ্ধির ফলে সময় ধীর হয়ে যাবার এই প্রভাব আমরা আমাদের পরিচিত যানবাহনের (বাস, ট্রেন, বিমান,ইত্যাদি) গতির আলোকে বুঝতে পারবো না। এর জন্য আমাদেরকে আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ভ্রমণ করার মতো দ্রুতগামী যান আবিষ্কার করতে হবে। কারণ সময় ধীর হয়ে যাবার প্রভাব সবচেয়ে ভালোভাবে অনুধাবন করা যায় আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ভ্রমণ করলে। আলোর বেগ অস্বাভাবিক রকম দ্রুত, সেকেন্ডে প্রায় ৩০০০০০ কি. মি., যা আমাদের পরিচিত যে কোন কিছুর বেগের চেয়ে অনেক গুন বেশি। তাই বাস্তব জীবনে আমরা সময় ধীর হবার এই প্রভাব বুঝতে পারি না।


এরকম দ্রুতগামী যান বিজ্ঞানীরা এখনো আবিষ্কার করতে পারে নি, তাতে কি হয়েছে। আমাদের কল্পনা করতে তো কোন সমস্যা নেই। আমরা কল্পনা করে নিলাম NASA' র বিজ্ঞানীরা এমন একটি রকেট আবিষ্কার করেছে যা আলোর বেগের কাছাকাছি (৯৯.৯৯%) বেগে ভ্রমণ করতে পারে।

ধরা যাক, এই রকেটে চড়ে আমাদের রকেট সায়িন্টিস্ট আল্লামা তারেক মনোয়ার হুজুর ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে মহাকাশ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওয়না দিলেন। তিনি আলোর বেগের ৯৯.৯৯% গতিতে মহাকাশে ১ বছর কাটিয়ে এলেন। ফিরে এসে তিনি কি দেখবেন ? যা দেখবেন তা এককথায় অবিশ্বাস্য। তিনি রকেটের ভেতরে থাকায় তার বয়স বেড়েছে মাত্র ১ বছর। কিন্তু এদিকে পৃথিবীতে কেটে গেছে ৭০ টি বছর। ফিরে এসে তিনি তার বেশিরভাগ সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রী ও বন্ধুদের জীবিত পাবেন না। আর যারা জীবিত আছে তারা এতোটাই বৃদ্ধ হয়ে গেছে যে তিনি তাদেরকে চিনতেই পারবেন না।


প্রিয় পাঠক সংক্ষেপে বলতে গেলে এটাই হল সময়ের আপেক্ষিকতা। আর সময়ের এই আপেক্ষিকতা বুঝতে গিয়ে আমাদের দুইটা রেফারেন্স কাঠামোর দরকার হয়েছে। একটা হল স্থির রেফারেন্স কাঠামো এবং অন্যটা হল গতিশীল রেফারেন্স কাঠামো। উপরের উদাহরণে পৃথিবী মানে যেখান থেকে রকেট বিজ্ঞানী তারেক মনোয়ার হুজুর মহাকাশ ভ্রমণে গিয়েছিলেন সেটা হল স্থির রেফারেন্স কাঠামো এবং মহাকাশে তাকে নিয়ে আলোর গতির ৯৯.৯৯% দ্রুততাই ছুটে চলা রকেট হল গতিশীল রেফারেন্স কাঠামো।


এক্ষেত্রে আমরা দেখতে পেলাম দুই রেফারেন্স কাঠামোতে সময়ের হিসাব দুইরকম। অর্থাৎ গতিশীল কাঠামোতে মানে দ্রুত গতিতে চলমান রকেটের ভেতরে সময় খুব ধীরে চলেছিল, তাই তারেক মনোয়ার হুজুরের বয়স কেবল এক বছর বেড়েছিল। অন্যদিকে স্থির রেফারেন্স কাঠামোতে অর্থাৎ পৃথিবীতে সময় ঠিকই দ্রুত মানে আমাদের পৃথিবীর হিসাব অনুযায়ী চলেছিল, তাই পৃথিবীতে ৭০ বছর কেটে গেছে।

আপনি চাইলে পৃথিবীতে বসে একই সাথে দুই রেফারেন্স কাঠামোর সময় পরিমাপ করতে পারবেন। আপনি যদি একটি শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশে ছুটে চলা রকেটের ভেতরটা দেখতে চেষ্টা করেন, আপনি দেখতে পাবেন রকেটের ভেতরের সবকিছু ধীর হয়ে গেছে। যদি তারেক মনোয়ার হুজুরের হাতে কোন ঘড়ি থাকে তাহলে সেই ঘড়িও ধীর হয়ে গেছে , তার হাত-পা চলার গতিও ধীর হয়ে গেছে। আপনি পৃথিবীতে বসে টেলিস্কোপের মাধ্যমে সেটি বুঝতে পারলেও রকেটের ভেতরে অবস্থান করা তারেক মনোয়ার হুজুর কিন্তু সেটা বুঝতে পারবে না। কারণ তখন তার দেহঘড়িও একই তালে চলবে।


এবার ফিরে আসি কোরানের আয়াত প্রসঙ্গে। কোরানের উপরোক্ত আয়াতসমূহের তাফসীর থেকে জানা যায় যে, এখানে সহস্র বছর বা পঞ্চাশ হাজার বছরের হিসাবটা কিয়ামত দিবসের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। মানে কিয়ামত দিবসের একদিন পৃথিবীর হিসাবে সহস্র বছরের সমান। এটা থেকে কিছুতেই বুঝা যায় না যে এখানে সময়ের আপেক্ষিকতার কথা বলা হয়েছে। কারণ উপরেই আমরা আলোচনা করেছি যে সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে হলে আমাদের দুইটা প্রসঙ্গ কাঠামোর দরকার হবে এবং আমরা চাইলে দুই প্রসঙ্গ কাঠামোর সময় একই সাথে পরিমাপ করতে পারি। কিন্তু কোরানের আয়াত অনুযায়ী এরকম কোন প্রসঙ্গ কাঠামোর প্রমাণ আমরা পাচ্ছি না। তাফসিরে বলা হচ্ছে কিয়ামত দিবসের একদিন পৃথিবীর হিসাবে সহস্র বছরের সমান। এখানে পৃথিবী ও কল্পিত কিয়ামত দিবসকে প্রসঙ্গ কাঠামো বলা যায় না।কারণ ইহকাল ও কল্পিত পরকাল দুইটা ভিন্ন ভিন্ন জগত। অথচ আপেক্ষিকতা বিষয়টা আমরা বাস্তব জগতেই অনুধাবন করতে পারি।

কোরানের উপরোক্ত আয়াতসমূহ দিয়ে যদি সময়ের আপেক্ষিকতাকে বুঝানো হতো তাহলে আমরা আপেক্ষিক তত্ত্বের আলোকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ এর মেরাজ ভ্রমণকে জাস্টিফাই করতে পারতাম। কিন্তু পূর্বের এক আলোচনায় আমরা দেখিয়েছি আপেক্ষিক তত্ত্বের আলোকে কিছুতেই মিরাজভ্রমণেরসত্যতা প্রমাণ করা যায় না ।

_______________________________


তথ্যসূত্রঃ

স্ট্রিং থিওরি

------ হিমাংশু কর




Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen