কোরানে কি অতি পারমাণবিক কণিকার উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে ?

আল কোরানে সূরা সাবা এর ৩৪ঃ৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন,

আর কাফিররা বলে, কিয়ামত আমাদের কাছে আসবে না। বলুন, অবশ্যই আমার রবের কসম! যিনি অদৃশ্য সম্পর্কে অবগত, তা তোমাদের কাছে আসবেই। আসমানসমূহে ও জমীনে অণু পরিমাণ কিংবা তারচেয়ে ছোট অথবা বড় কিছুই তার অগোচরে নেই। বরং সবকিছুই কিতাবে (লিপিবদ্ধ) রয়েছে।

এই আয়াতের আলোকে মুমিনরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, এখানে নাকি আল্লাহ অতিপারমানবিক কণিকার অস্তিত্বের কথা বলেছেন। তাহলে চলুন এই আয়াতের বিশ্লেষণটা আমরা নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে বুঝার চেষ্টা করি।

পরমাণু এর আরবি প্রতিশব্দ হল ذرة

(যাররাহ) এবং অণু এর আরবি প্রতিশব্দ হল جزيئات ( যাযি'আত)। আলোচ্য আয়াতে যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সেটা হল ذرة (যাররাহ)। বর্তমানে অনেক ইসলামি পন্ডিত এই ذرة (যাররাহ) শব্দের অনুবাদ করেছেন Atom তথা পরমাণু।


এখন আমরা যদি পরমাণুর ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, পরমাণু (Atom) শব্দটি আসলে এসেছে প্রাচীন গ্রীক ও ভারতীয় দর্শন থেকে । ভারতীয় দার্শনিক কণাদ খ্রীস্টের জন্মের ৬০০ বছর আগে পরমাণুর ধারণা দেন । তিনি বলেন সকল পদার্থই ক্ষুদ্র এবং অবিভাজ্য কণিকা দ্বারা তৈরী।


আবার গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০-৩৭০) ও তার গুরু লিউসিপ্পাসের (খ্রিস্টপূর্ব ৫০০) দর্শন থেকেও আমরা ইহা জানতে পারি। ডেমোক্রিটাসের দর্শন অনুযায়ী, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুই অতি ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত, যাকে আর ভাগ করা যায় না। । তিনি এই ক্ষুদ্র অবিভাজ্য কণার নাম দিয়েছিলেন 'এটম' বা পরমাণু।


অর্থাৎ পরমাণুর ইতিহাস অনেক পুরনো। কাজেই প্রায় ১৫০০ শত বছর পূর্বে এই তথ্যটা তাৎকালীন আরবের মানুষের জানার মধ্যেই ছিলো। এর সাথে নিজের দর্শনলব্ধ জ্ঞান আরেকটু জুড়ে দিয়ে

"পরমাণুর চেয়ে ছোট বা বড় কোন কিছুই তার অগোচরে নেই "

এই কথাটুকু বলতে পারার মধ্যে আমি মিরাকলের কিছু দেখছি না। তবে আমাদের এই আলোচনাটা আমরা এখানেই শেষ করতে চাচ্ছি না। আমরা আলোচ্য আয়াতের কথাগুলোকে আরও বিশ্লেষণ করে দেখতে চাই।


তাহলে চলুন প্রথমেই আমরা জেনে নিই অতিপারমানবিক কণিকা বলতে আসলে কি বোঝায়।


ছোট ক্লাসে থাকতে আমরা পড়েছিলাম প্রত্যেক পদার্থই পরমাণু নামক অতিক্ষুদ্র কণিকা দ্বারা গঠিত। এই পরমাণুকে ভাঙলে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন নামক তিন ধরনের কণিকা পাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তীতে উচ্চতর ক্লাসে উঠে

কণা পদার্থ বিদ্যার (particle physics) আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম যে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনই পরমাণুর একমাত্র কণিকা নয়। এগুলোকে আরও ভাঙ্গা যায় এবং এর ফলে আরও ক্ষুদ্রতর কণিকা পাওয়া যায়।


একটি পার্টিকেল এক্সিলারেটরের ভেতরে মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি দিয়ে পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে আঘাত করা হয়। ফলে শত শত অতিপারমানবিক কণিকা তৈরি হয়। আর এরা প্রত্যেকেই এক একটি মৌলিক কণিকা।

Image: world's largest atom smasher, the Large Hadron Collider, forms a 17-mile-long (27 kilometers) ring under the French-Swiss border. (Image credit: Maximilien Brice/CERN)


মৌলিক কণিকাদেরকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হল -

১) বোসন

২) ফার্মিওন

১) বোসনঃ যেসব কণিকা বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিস্টিক্স মেনে চলে তাদেরকে বোসন বলা হয়। এরা বলের বিনিময়কারী কণা হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ প্রকৃতিতে যে চারটি মৌলিক বল আছে সেগুলো এই কণিকাগুলো দিয়ে তৈরি। বোসন কণাদের প্রাথমিকভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

১.১) মৌলিক বোসন ও

১.২) যৌগিক বোসন

যৌগিক বোসন মূলত মেসন। দুটি বিপরীত কোয়ার্ক (একটি কোয়ার্ক ও একটি অ্যান্টি কোয়ার্ক) মিলে একটি মেসন গঠন করে। তবে সব মেসনই বোস আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে না। তাই সব মেসনকেই যৌগিক বোসন বলা যায় না।

আবার মৌলিক বোসন পাঁচ ধরনের হয়। এগুলো হল -

* চার ধরনের গেজ বোসন (ফোটন,গ্লুওন,গ্র‍্যাভিটন,W+, W-) ও

*হিগস বোসন


২) ফার্মিওনঃ এরা পদার্থের কণিকা হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ সকল প্রকার পদার্থ এই কণিকাগুলো দিয়ে তৈরি। ফার্মিওন কণাদের আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

২.১) কোয়ার্ক ও

২.২) লেপ্টন


২ঃ১ কোয়ার্কঃ কোয়ার্ক একটি মৌলিক কণিকা। অর্থাৎ একে আর ভেঙে অন্য কোন ক্ষুদ্র কণাতে পরিণত করা যায় না (অন্তত আমরা এখনো তা পারি না)।কোয়ার্কের ৬ টি ধরন আছে, এদেরকে বলা হয় ফ্লেভার। এগুলো হলো, ডাউন, চার্ম,স্ট্রেঞ্জ, টপ ও বটম। এই ছয় ধরনের কোয়ার্কের প্রতিটির আবার তিন ধরনের কালার বা রঙ রয়েছে লাল,সবুজ ও নীল। তাহলে বিভিন্ন কালার ও ফ্লেভারযুক্ত মোট কোয়ার্কের সংখ্যা হচ্ছে ৬><৩= ১৮ টি। আবার, প্রতিটি পদার্থ কণিকারই একটি প্রতি পদার্থ বা অ্যান্টি ম্যাটার রয়েছে। তেমনি এই কোয়ার্কগুলো যেহেতু পদার্থের কণিকা, তাই এদেরও একটি করে প্রতি পদার্থ রয়েছে। এদের বলা হয় অ্যান্টি কোয়ার্ক। কোয়ার্ক ও অ্যান্টি-কোয়ার্ক মিলে এদের মোট সংখ্যা (১৮><২)= ৩৬ টি।বিভিন্ন ধরনের কোয়ার্কগুলো দিয়েই পরমাণুর নিউক্লিয়াস গঠিত হয়। তাই এদেরকে নিউক্লিয়াস গঠনকারী কণিকা বলা যেতে পারে। কোয়ার্ক গুলোকে মৌলিক কণিকা বলা গেলেও প্রোটন ও নিউট্রনকে মৌলিক কণিকা বলা যায় না কারণ প্রোটন ও নিউট্রন কে ভাঙলে একাধিক কোায়ার্ক পাওয়া যায়। কিন্তু এরা সবাই ফার্মিওন শ্রেণির মধ্যেই পড়ে। তাহলে দেখা যাচ্ছে ফার্মিওন কণা মৌলিক বা যৌগিক দুরকমই হতে পারে। অর্থাৎ ফার্মিওন মানেই যে,আক্ষরিক অর্থে মৌলিক তা নয়। মূলত যেসব অতি পারমানবিক কণিকারা ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্স মেনে চলে তাদেরকেই ফার্মিওন বলা হয়। ভিন্ন ভিন্ন কোয়ার্ক মিলে যে যৌগিক ফার্মিওন কণা তৈরি করে তাদেরকে বলা হয় হ্যাড্রন। হ্যাড্রনদের আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- *বেরিওন ও

*মেসন

বেরিওনঃ তিনটি কোয়ার্ক মিলে যে যৌগিক ফার্মিওন কণা তৈরি করে তাদেরকে বেরিওন বলা হয়। যেমনঃ প্রোটন, নিউট্রন,ওমেগা, ডেলটা, ল্যামডা,সিগমা,ক্যাসকেড ইত্যাদি। বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত ১২২ টির মতো বেরিওন কণা আবিষ্কার করতে পেরেছেন।

মেসনঃ যেসব যৌগিক কণা ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্স মেনে চলে না তাদেরকে মেসন বলা হয়। মেসন কণিকাগুলো দুটি বিপরীত কোয়ার্ক (কোয়ার্ক ও অ্যান্টি কোয়ার্ক) মিলে তৈরি হয়। এগুলো সাধারণত অস্থায়ী হয় কারণ কণা-প্রতিক্ণা পরস্পরকে ধ্বংস করে দেয়।


২.২) লেপ্টনঃ লেপ্টনগুলো কোয়ার্কদের মতোই মৌলিক কণিকা। আমাদের সবচেয়ে পরিচিত লেপটন হল ইলেকট্রন। লেপ্টনগুলোকে প্রধানত দুটিভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা -

*চার্জ লেপ্টন ও

*নিউওট্রাল লেপটন


চার্জ লেপটনঃ চার্জ লেপটনগুলো অন্য অন্য কণিকাদের সাথে মিলিত হয়ে যৌগিক কণা গঠন করতে পারে। অর্থাৎ একটি এদের মিথস্ক্রিয়া করার প্রবণতা আছে। যেমন, একটি ইলেকট্রন ও তার প্রতি কণিকা পজিট্রন মিলিত হয়ে পজিট্রনিয়াম তৈরি করে। চার্জ লেপ্টনদের মিথস্ক্রিয়ার আরেকটি ফল হল পরমাণু। যেমন, ইলেকট্রন নামের চার্জ লেপটন, নিউট্রন ও প্রোটনের সাথে মিলিত হয়ে পরমাণু গঠন করে। চার্জ লেপটনদের অন্য কণিকাদের সাথে মিলিত হবার প্রবণতা না থাকলে পরমাণু বা পদার্থ বলতেই কিছু থাকতো না।

নিউট্রাল লেপ্টনঃ এগুলো নিউট্রিনো নামে পরিচিত। এরা কোন মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নেয় না। যেমন নিউট্রিনো, অ্যান্টি নিউট্রিনো ইত্যাদি।


যাইহোক আশা করি অতিপারমানবিক কণিকা সম্পর্কে আপনাদেরকে একটুখানি ধারণা দিতে পেরেছি।

এবার আমরা ফিরে আসি মূল আলোচনায়।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় ডি ব্রগলির তরঙ্গ সমীকরণ (lamda= h/mv) থেকে আমরা জানি, সকল কণাই আসলে একই সাথে কণিকা ও তরঙ্গ। অর্থাৎ এদেরকে কণিকাও বলা যাবে আবার তরঙ্গ ও বলা যাবে। কোরানের উপরোক্ত আয়াতে কিংবা সমগ্র কোরানের কোথাও কি ক্ণার দ্বৈত আচরণ তথা কণা ও তরঙ্গ ধর্ম নিয়ে কোন ঈঙ্গিত আছে ? অথবা সমগ্র কোরানের কোথাও কি প্রতিকণা (Anti particle)-দের অস্তিত্ব থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায় ?

যদি না পাওয়া যায় তাহলে আপনার কিভাবে দাবি করেন যে উপরোক্ত আয়াতে অতিপারমানবিক কণিকাদের অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে?


মুমিন ভাই ও ইসলামিক স্কলারদের নিকট প্রশ্নটার একটা গ্রহনযোগ্য উত্তর আশা করছি।


আবার কোরানের ১০ঃ২০, ৫ঃ১০৯, ৬ঃ৫৯, ৭ঃ১৮৮, ৩৪ঃ৩, ২৩ঃ৯২, ১৩ঃ৯, ৩৯ঃ৪৬, ৫৩ঃ৩৫, ৭২ঃ২৬ প্রভৃতি আয়াতে আল্লাহ দাবি করেছেন যে অদৃশ্যের জ্ঞান কেবল তারই অধীনে। অর্থাৎ যেসব জিনিস আমরা খালি চোখে দেখতে পারি না (যেমন, অণু,পরমাণু, অতিপারমানবিক কণিকা, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, তরঙ্গ, মায়ের গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ, কোষীয় অঙ্গাণু, দূরবর্তী গ্যালাক্সি, নক্ষত্র ইত্যাদি) সেগুলো সম্পর্কে কেবল আল্লাহই অবগত আছেন। কিন্তু আমরা জানি বিজ্ঞানীরা আজ ঠিকই এইসব বিষয়ে খুব ভালো করেই অবগত হয়েছেন এবং শক্তিশালী যন্ত্রের সাহায্যে সেগুলোকে আমরা দেখতেও পারি।

তাহলে কি বিজ্ঞানীরা আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করে বসে আছেন?

Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen