বিজ্ঞানীরা কি জিন বা শয়তানের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পেরেছে ? (পর্ব-২)

প্রথম পর্বের লিংক -

https://www.justanotherbangladeshi.com/post/scientific-explanation-of-ghost-1


দ্বিতীয় অংশঃ

এই পর্বে আমরা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আলোকে দেখানোর চেষ্টা করবো যে, কোরান - হাদিসে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যমন্ডিত জ্বিনের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নাকি নয়।


পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যয়ন থেকে আমরা জানি যে, এই ইউনিভার্স এ যা কিছু আছে তা হয় পদার্থ নয় শক্তি। আইনস্টাইনের ভর-শক্তির সমীকরণ (E= mc^2) হতে আমরা জানি, পদার্থ ও শক্তি পরস্পর রুপান্তরযোগ্য। আবার বিকিরণের কোয়ান্টাম তত্ত্ব সম্পর্কিত ম্যাক্স প্ল্যাংকের সমীকরণ ( E= nhf ) থেকে আমরা জানি, শক্তি বা বিকিরণ হল কতগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্যাকেটের সমষ্টি। শক্তির এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ বা প্যাকেটগুলিকে বলা হয় কোয়ান্টা বা ফোটন। আমাদের এই ইউনিভার্সে বিদ্যমান বিলিয়ন বিলিয়ন গ্যালাক্সি, ব্ল্যাকহোল, গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, উল্কাপিণ্ড ও অন্যান্য জোতিষ্কসহ যা কিছু আছে তার সবই হল ভর-শক্তি। অর্থাৎ আমাদের এই বস্তুবাদী মহাবিশ্বে ভরশক্তির বাহিরে কিছুই নেই। আমাদের পৃথিবী, এর সাগর, মহাসাগর, প্রান্তর, নদ, নদী, গাছপালা, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীসহ যা কিছু আছে তার সবই আসলে ভর-শক্তি ছাড়া কিছুই নয়। এবার আসি জিনের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে। কোরানে বলা হয়েছে যে, জিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে অগ্নি শিখা থেকে এবং হাদিসে বলা হয়েছে নির্ধুম অগ্নি শিখার কথা। তাহলে এবার আমাদের জানতে হবে অগ্নি বা আগুন এবং নির্ধুম অগ্নি বলতে আসলে কি বোঝায়।


সংক্ষিপ্ত ও সহজ করে বলতে গেলে, আগুন হলো প্লাজমা, যাকে মাঝেমাঝে ‘পদার্থের চতুর্থ দশা’ বা ‘Fourth State of Matter’ আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে | এর কারণ যে কোনো পদার্থের গ্যাসীয় রূপকে যখন যথেষ্ট পরিমানে শক্তি বা তাপমাত্রা প্রদান করা হয়, তখন সে প্লাজ্মায় রুপান্তরিত হয় | এই অবস্থায় গ্যাসীয় পদার্থটির পরমাণুর ইলেক্ট্রনগুলি মুক্ত হয়ে পড়ে যার ফলে অবশিষ্ট পরমাণু একটি ‘পজিটিভ চার্জ’ ধারণ করে ও তাকে তখন ‘পজিটিভ আয়ন’ বলা হয়; এই পজিটিভ আয়ন ও ইলেক্ট্রনের সমষ্টিকেই আমরা বলি ‘প্লাজমা’ | উল্লেখ্য, সব আগুনই প্লাজমা না। তাপমাত্রা এবং পদার্থটি কতটা আয়নাইজড হয়েছে সেটার ওপর নির্ভর করে তাকে প্লাজমা বলা যাবে নাকি না। তাপমাত্রা ৩০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এর নীচে হলে তাকে প্লাজমা বলা যায় না।

ছবিঃ অগ্নি শিখা


অন্যভাবে বলতে গেলে, আগুন হল একটি রাসায়ণিক বিক্রিয়া, যাকে দহন বিক্রিয়া বলা

হয়। এটি একটি তাপোৎপাদী বিক্রিয়া (Exothermic Reaction)। অর্থাৎ এই বিক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন হয়। দাহ্যবস্তু, অক্সিজেন বা অন্য কোন জারক পদার্থ ও তাপ এই তিনটি উপাদানের সমন্বয়ে যে বিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় সাধারনতঃ তাকেই আগুন বলে। যে কোন একটি উপাদানের কমতি থাকলে আগুনের সৃষ্টি কখনোই হবেনা।

এই দহন বিক্রিয়া ( Combustion Reaction) আবার দুই ধরনের হয়। যথা-


১) Complete Combustion:

যখন কোনো জ্বালানি পর্যাপ্ত অক্সিজেনের উপস্থিতিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপ পায় তখন যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে এবং শক্তি উৎপন্ন হয় তাকে বলা হয় complete combustion বা পূর্ণ দহন। এই Complete Combustion এর সময় যে শিখার সৃষ্টি হয় তাকে বলা হয় নির্ধুম অগ্নিশিখা বা ধোঁয়াহীন আগুন। কারণ এক্ষেত্রে কোন ধোঁয়া সৃষ্টি হয় না। গ্যাসবার্নারে ও মোমবাতির শিখার গোড়ায় এ ধরনের আগুন তৈরি হয়।


2) Incomplete Combustion:

পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে কিংবা যথেষ্ট পরিমাণ তাপ না পেলে যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে তাকে Incomplete Combustion বা অপূর্ণ দহন বলে। Incomplete Combustion-এ কার্বন মনোক্সাইড ও অন্যান্য জটিল যৌগ উৎপন্ন হয়, এগুলো এবং অবশিষ্ট হাইড্রোকার্বনগুলো ধোঁয়া হিসেবে পরিচিত। মোমবাতির শিখার উপরের অংশে, কেরোসিন, পেট্রোল, ডিজেল, কাঠ ইত্যাদিতে এই ধরনের আগুন তৈরি হয়।


যাইহোক আবার ফিরে আসি মূল আলোচনায়। এতোক্ষনে আমরা জেনে গেছি যে, আগুন আসলে একধরনের গ্যাসমিশ্রণের বিক্রিয়াকালীন অবস্থা যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বা তাপ প্রদানের ফলে সংগঠিত হয় এবং বিক্রিয়ার ফলে সেখান থেকে তাপ উৎপন্ন হয়। কাজেই আগুনকেও আমরা পদার্থ বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে ভর-শক্তি বা শুধু শক্তি বলতে পারি।

সুতরাং কোন কিছু যদি আগুনের তৈরী হয়ে থাকে, তাহলে ম্যাক্স প্লাংকের সমীকরণ অনুযায়ী সেটার একটা ফ্রিকোয়েন্সী থাকবে, একটা তরঙ্গ দৈর্ঘ থাকবে, সেই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের একটা রেঞ্জ বা সীমা থাকবে। যেমনঃ দৃশ্যমান, অবলোহিত , তড়িচ্চুম্বকীয়, অতিবেগুনী, মাইক্রোওয়েব ইত্যাদি বিকিরণের প্রতিটির ক্ষেত্রে তাদের আলাদা আলাদা ফ্রিকোয়েন্সি, তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি রয়েছে। কেবল দৃশ্যমান আলো তথা বিকিরণ (বেগুনি, নীল, আসমানী, সবুজ, হলুধ, কমলা লাল) বাধে অন্যান্য বিকিরণ সমূহকে আমরা খালি চোখে দেখতে পারি না। তবে যতো ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বা দুর্বল শক্তির বিকিরণই হোক না কেন আধুনিক উন্নত সেন্সর মেশিন ও ডিটেক্টর গুলোতে বিজ্ঞানীরা সেটা অবশ্যই ধরতে পারেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ অবধি বিজ্ঞানীরা জিন/ভূত /প্রেতাত্মা নামক অতিপ্রাকৃতিক কোন কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পান নি। আসল কথা হল জিন,ভূত, প্রেতাত্মাদের মতো অতিপ্রাকৃতিক কোন কিছু নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করেন না।

বিভিন্ন ভুতুড়ে স্থানে ডিটেক্টর মেশিন গুলোতে যেসব রেডিয়েশন ধরা পরে সেগুলোকে অনেকে জিন ভুতের অস্তিত্বের প্রমাণ বলে চালানোর চেষ্টা করে। অথচ তাড়া জানেই না যে, ডিটেক্টরে ধরা পরা বিকিরণ গুলো আমাদের খুবই পরিচিত ও স্বাভাবিক। এই যেমন, ধরেন আপনি ভুতুড়ে স্থান নামে পরিচিত কোন এক প্রকান্ড ঝোপঝাড়ের নিকট গিয়ে যদি একটি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড ডিটেক্টর বা EMF মিটার স্থাপন করেন তাহলে দেখবেন সেখানে যন্ত্রটি অনেক সিগনাল দিচ্ছে। কিন্তু এই সিগনাল গুলোকে যদি কেউ ভূত-প্রেত বা জিনের অস্তিত্ব বলে দাবি তাহলে এরচেয়ে বড় মুর্খতা আর হয় না। কারণ এই যন্ত্রটি বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন বিভিন্ন ধরনের তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ শনাক্ত করার জন্য। আপনার পরিক্ষনীয় স্থানের আশেপাশে বিভিন্ন উৎস থেকে ( যেমনঃ বজ্রপাত বা পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র থেকে সৃষ্ট চার্জসমূহ, এক্স-রে, টিভি অ্যান্টেনা, বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং, পাওয়ার লাইন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম

ইত্যাদি) এই তরঙ্গের সৃষ্টি হতে পারে যা আপনার সেট করা সেন্সর বা ডিটেক্টরে ধরা পরে।

ছবিঃ একটি EMF মিটার


নীচে আপনাদের জানার সুবিধার্থে কয়েকটি ডিটেক্টরের নাম উল্লেখ করলাম। এই যন্ত্রগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আপনারা গোগলে খুঁজুন।

১) ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড ডিটেক্টর বা EMF মিটার

২) ইলেকট্রনিক ভয়েস ফেনোমেনা বা EVP

৩) এক্সটার্নাল থারমোমিটার

৪) ডিজিটাল ইনফ্রারেড ক্যামেরা

৫) আল্ট্রাভায়োলেট লাইট ইত্যাদি।


আবার ফিরে আসি জিন প্রসঙ্গে। হাদিস থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, জিনেরা মানুষের মতো পানাহার, যোনক্রিয়া ও অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করতে পার এবং তাদের শ্রবণশক্তি আছে। তারা মানুষের ফেলে দেয়া হাড়-হাড্ডি খেয়ে বেঁচে থাকে। তাহলে মুমিন ভাই বোন ও ইসলামিক স্কলারদের নিকট আমার কয়েকটি প্রশ্ন।

১) জিনদের কি মানুষের মতো পরিপাকতন্ত্র আছে ? না থাকলে তারা হাড়-হাড্ডি খেয়ে হজম করে কিভাবে?

২) জিনদের কি শ্রবণঅঙ্গ আছে? না থাকলে তারা শ্রবণ করে কিভাবে ?

৩) বলা হয়েছে জিনদের প্রকৃত আকৃতি মানবচোখে অবলোকনযোগ্য, তাহলে আমরা তাদেরকে দেখতে পাই না কেন?

৪) জিনদের কি আমাদের মতো জনন অঙ্গ আছে? না থাকলে তারা যোন কর্ম ও বংশবিস্তার করে কিভাবে ?

৫) বলা হয়েছে জিনরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি ও নিজেদের মধ্যে রক্তপাত ঘটিয়েছিল । জিনদের দেহ তো আমাদের মতো রক্তমাংস দিয়ে তৈরি না, তাহলে তারা রক্তপাত ঘটায় কি করে?

৬) পৃথিবীতে আদমকে পাঠানোর আগে জিনদের খাবার কি ছিলো ? তখন তো আর আমরা হাড়-হাড্ডি, উচ্ছিস্ট, গোবড় এসব ফেলে রাখতাম না।

৭) আমরা জানি আলো একধরনের শক্তি, আবার আগুনও একধরনের শক্তি। শক্তিকে একরূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তরিত করা যায়। যেমনঃ আগুন জ্বালানোর সময় তাপ ও আলো পাওয়া যায়। আবার আলোর সাহায্যেও আগুন ধরানো যায়। অর্থাৎ দুটোই একই জিনিস। তাহলে "ফেরেশতারা আলোর তৈরী এবং জিনেরা আগুনের তৈরি " এই কথার কোন বিশেষত্ব থাকলো?


আশা করি এর একটি গ্রহনযোগ্য উত্তর আপনারা আমাকে দিবেন।

--------------------------০---------------------------

তথ্যসূত্রঃ

https://wmap.gsfc.nasa.gov/universe/uni_matter.html


https://www.plasma-universe.com/fire-flame

https://www.theguardian.com/notesandqueries/query/0,,-200587,00.html


https://www.livescience.com/32389-what-is-fire.html

https://www.britannica.com/science/combustion

https://www.instrumentchoice.com.au/news/what-is-an-emf-meter

https://bn.quora.com/%E0%A6%86%E0%A6%97%E0%A7%81%E0%A6%A8-%E0%A6%A5%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%A7%E0%A7%8B%E0%A6%81%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A7%80%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87

Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen