বিবর্তন তত্ত্ব যে সত্য তার প্রমাণ কি

এই প্রশ্নের উত্তরে প্রথম পর্বে আমরা জেনেছিলাম বিবর্তন ও বিবর্তন তত্ত্ব বলতে কী বোঝায়। যারা প্রথম পর্ব এখনো পড়েন নি, এখান থেকে পড়ে নিন-

https://m.facebook.com/groups/358524058564502/permalink/423422878741286/


দ্বিতীয় পর্বে আমরা বিবর্তন তত্ত্বের পক্ষের প্রমাণ নিয়ে আলোচনা করবো। বিবর্তনের পক্ষের প্রমাণগুলোকে সহজবোধ্য করে তুলে ধরতে আমরা এগুলোকে কয়েকটি শ্রেনীতে ভাগ করে নিয়েছি। এই শ্রেনীগুলো হলো-

১) প্রাণ রাসায়নিক প্রমাণ

২) ভ্রুণতত্ত্ব বিষয়ক প্রমাণ

৩) শরীরবৃত্তীয় প্রমাণ

৪) জীবাশ্ম বা ফসিলের প্রমাণ

৫) সংযোগকারী জীবের প্রমাণ

৬) ভৌগলিক বিস্তারের প্রমাণ

৭) শ্রেনীকরণ সংক্রান্ত প্রমাণ।

৮) সরাসরি পর্যবেক্ষনযোগ্য প্রমাণ।

তবে লেখাটাকে দীর্ঘায়িত না করার উদ্দেশ্যে আমরা এই পর্বে শুধুমাত্র উপরোক্ত তিনটি শ্রেনী নিয়ে আলোচনা করবো, বাকি গুলো পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে। তাহলে চলুন শুরু করা যাক-

১) প্রাণ রাসায়নিক প্রমাণঃ

মৌলিক বায়োকেমিস্ট্রি অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, বিভিন্ন জীবদেহে বিদ্যমান প্রাণরাসায়নিক সিস্টেম গুলি কীভাবে জীবন বৃক্ষের গোড়ায় বিকশিত হয়েছিল। কতিপয় নির্দিষ্ট মৌলিক অণু এবং জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া আছে যা অবিশ্বাস্যভাবে বিভিন্ন জীবের মধ্যে একইরকম। সকল জীব তাদের জিনগত কোডের জন্য DNA/RNA ব্যবহার করে। সালোকসংশ্লেষণ, সেলুলার শ্বসন, প্রতিলিপি এবং রূপান্তরের মতো প্রক্রিয়াগুলো বিভিন্ন ধরণের প্রাণীর মধ্যে অভিন্ন বা খুব মিল থাকে । যখন আমরা কাছাকাছি তাকাই , আমরা দেখতে পাই যে অনেকগুলি বায়োকেমিক্যাল অণু আছে যা প্রায় সমস্ত জীবনরূপে অভিন্ন।

একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হল সাইটোক্রোম সি, যা সমস্ত জীবনরূপে পাওয়া যায়। যদিও এই অণুর জিনগত কোডিং প্রজাতিভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়, তথাপি এটি সর্বজনীনভাবে একই ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করে। এই অত্যন্ত সংরক্ষিত প্রোটিনটি ইলেক্ট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইনের একটি মূল উপাদান, সেলুলার শ্বসনের একটি অংশ। সাইটোক্রোম সি প্রোগ্রামড কোষের মৃত্যুর সূচনা সহ আরও অনেক বিক্রিয়াতে কাজ করে।

এর সাথে কিছুটা সম্পর্কিত অণু হিমোগ্লোবিন এবং মায়োগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিন একটি অণু যা অক্সিজেন পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং মায়োগ্লোবিন অক্সিজেন সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়। আর একটি খুব সাধারণ অণু ট্রিপসিন, হজমের সময় প্রোটিন শোষণের সাথে জড়িত একটি প্রোটিয়েজ। এই সমস্ত অণুগুলো কোষের ভেতর প্রয়োজনীয় কার্য সম্পাদন করে থাকে ,যা সকল জীবের মধ্যে একই। এগুলির প্রতিটি অণু প্রতিটি প্রজাতির মধ্যে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থিত হলে তা বোঝা যেতো না। সেটা অসম্ভব হতো । এই শেয়ারকৃত বায়োকেমিক্যাল অণু ও প্রক্রিয়া গুলো সাধারণ গোত্র এবং বিবর্তনের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ সরবরাহ করে। অর্থাৎ এসব স্টাডি থেকে আমরা জানতে পারি যে, কিভাবে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এমাইনো এসিড থেকে নিউক্লিয়িক এসিড (RNA) প্রথমে এসেছিলো এবং পরবর্তীতে এটি কিভাবে DNA ভিত্তিক উত্তরাধিকারের দিকে চলে যায়।

জৈব রাসায়নিক প্রমাণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য আসে বিষ্ময়করভাবে সাধারণ অণুর গঠন থেকে। যেমনটি আপনি আশা করতে পারেন, আপনার নিজের কোষে, ছত্রাকের কোষে এবং একটি ব্যাকটেরিয়াল কোষে ঘটে যাওয়া অনেকগুলি রাসায়নিক বিক্রিয়া একে অপরের থেকে একেবারে পৃথক; তবে, তাদের মধ্যে অনেকগুলি ঠিক একই এবং ঠিক একই অণুগুলির উপর নির্ভর করে। যেহেতু এই অণুগুলি বিস্তৃত এবং সমস্ত জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এগুলি জীবনের ইতিহাসের প্রথম দিকে উত্থিত হয়েছিল এবং এদের নাম দেওয়া হয়েছে "আণবিক জীবাশ্ম"। ATP (অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট) এমন একটি অণু । এটি সেলুলার প্রক্রিয়াগুলিকে শক্তিশালী করার জন্য অপরিহার্য এবং এটি সমস্ত আধুনিক জীবনদ্বারায় ব্যবহৃত হয়। ATP এবং অন্যান্য আণবিক ফসিল অধ্যয়নের মাধ্যমে একটি বিষ্ময়কর তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে যে, অনেক আণবিক ফসিল নিউক্লিক এসিডগুলির সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত, নীচের ছবিতে দেখানো হয়েছে।

নিউক্লিক অ্যাসিডের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত প্রভাবকীয় RNA এবং আণবিক জীবাশ্মের আবিষ্কারগুলি সূচিত করে যে নিউক্লিক অ্যাসিডগুলি ( বিশেষত, RNA) পৃথিবীর প্রথম প্রাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই পর্যবেক্ষণগুলি RNA world Hypothesis কে সমর্থন করে যে প্রাথমিক জীবন মৌলিক সেলুলার প্রক্রিয়াগুলির জন্য আধুনিক প্রাণীদের ব্যবহৃত প্রোটিন, RNA এবং DNA মিশ্রণের পরিবর্তে RNA ব্যবহার করেছিল।


) ভ্রুণতত্ত্ব বিষয়ক প্রমাণঃ

ভ্রূণতত্ত্ব বা ভ্রূণের অধ্যয়ন বিবর্তন তত্ত্বকে সমর্থন করার জন্য আমাদের প্রচুর প্রমাণ খুঁজে পেতে সহায়তা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মানুষের মধ্যে লেজ বা গিলের মতো অকেজো কাঠামোগুলো তাদের ভ্রুণের বিকাশের সময়গুলোতে দেখা যায় যায়।

একটি ভ্রণ কতগুলো পর্যায়ে ধাপে ধাপে বিকশিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চায় (জীবন্ত বংশধরে) পরিণত হয়।

ভ্রুনের বিভিন্ন স্তরের বৃদ্ধির সময় যে কাঠামোগত বিকাশ ঘটে তার অধ্যয়নকে ভ্রুণতত্ত্ব বলে। একে জেনেটিক সদৃশ্যতা দেখাতে ব্যবহার করা যায় যা বিবর্তনের নির্দিষ্ট নিদর্শনগুলোর প্রমাণ বহন করে।

একটি নিষিক্ত ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু কোষের প্রাথমিক বিভাজন থেকে ভ্রূণ তৈরি হয়। ভ্রুণের প্রাথমিক বিকাশের সময়, আপনি একটি বিড়াল, একটি মানব বা একটি বাদুড়ের ভ্রূণের মধ্যে কোন পার্থক্য করতে সক্ষম হবেন না।

ছবিঃ বিভিন্ন প্রজাতির ভ্রণের বিকাশ


বিজ্ঞানীরা উদঘাটন করেছেন যে, যেসব প্রজাতি একটি সামপ্রতিক সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছে তাদের ভ্রুণীয় বৃদ্ধি ও বিকাশের মধ্যে একই ধরনের প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। আর একটি বড় প্রমাণ হল হক্স জিন। হক্স জিনসমূহ মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত কোনও জীবের বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে। হক্স জিনগুলো বেশিরভাগ বহুকোষী ইউকারিওয়েটে এমনকি কীটপতঙ্গ এবং মানুষের মধ্যেও একই রকম। বিভিন্ন প্রজাতি তাদের সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে কোথায় বিচ্যুত/পৃথক হয়েছিল তা দেখতে Hox gene DNA ' র ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলো ব্যবহার করতে পারেন।

৩) শরীরবৃত্তীয় প্রমাণঃ

বিবর্তনের শারীরবৃত্তীয় প্রমাণগুলো পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রজাতির দেহের কাঠামোর মিল এবং পার্থক্যগুলো থেকে। এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করে জীববিজ্ঞানের যে শাখা তার নাম তুলনামূলক শারীরবিদ্যা। বিভিন্ন প্রজাতির শারীরবৃত্তীয় কাঠামোর সাদৃশ্য থেকে বোঝা যায় যে দুটি প্রজাতির অপেক্ষাকৃতভাবে একটি সাম্প্রতিক সাধারণ পূর্বপুরুষ রয়েছে। যদিও বিভিন্ন প্রজাতির পক্ষে স্বতন্ত্রভাবে একই জাতীয় দক্ষতার বিকাশ সম্ভব, কিন্তু তাদের একইজাতীয় বা খুব একই রকম হাড়ের গঠন স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা খুব কমই । আমরা শরীরবৃত্তিকভাবে দেহের অনুরূপ অঙ্গকে সমজাতীয় কাঠামো (Homologous Structure) বলে থাকি।

Image Source : by Gabi Slizewska


নোট করে রাখুন যে, Homologous Structure গুলোর একই ফাংশন (কাজ) থাকতে হবে না।

উদাহরণস্বরূপ, মানুষের বাহু এবং তিমির ফ্লিপার সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় অথচ তারা অনুরূপ একইরকম হাড় দিয়ে তৈরি । তাই এগুলোর একটিকে আরেকটির সদৃশ (Homologous) অঙ্গ বলা হয়।

আবার আরেক ধরনের অঙ্গ আছে যাদেরকে বলা হয় Analogous স্ট্রাকচার। এই Analogous স্ট্রাকচারগুলো হল বিভিন্ন প্রজাতির দেহের অংশবিশেষ যা একই রকমের কাজ করে। এই কাঠামোগুলির একই উদ্দেশ্য রয়েছে তবে দেখতে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। যেমন, প্রজাপতি ও বাদুড়ের পাখার কাজ একই, কিন্তু এদের গঠন দেখতে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

Image Source : by Gabi Slizewska


বিলুপ্ত বা অকেজো অঙ্গসমূহ পর্যবেক্ষন করলেও অনেক তথ্য জানা যায়। যেমনঃ মানুষের ককিক্স (tail bone) একটি অন্যতম উদাহরণ যা নির্দেশ করে যে মানুষ এমন একটি প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়েছে যাদের লেজ ছিলো। এছাড়াও মানুষের এপেন্ডিক্স, আক্কেল দাঁত ও টনসিল ইত্যাদি বিলুপ্তপ্রায় বা অকেজো অঙ্গগুলোও বিবর্তনের প্রমাণ বহন করে।


দুটি কাঠামোর ফাংশন একই থাকার মানে এই নয় যে, প্রজাতি দুটি একই সময়ে বিবর্তিত হয়েছিল। যদি দুটি অঙ্গের কাজ একই হয় কিন্তু তাদের গঠন সিমিলার না হয় তাহলে বুঝতে হবে প্রজাতি দুটির কোন কমন এনসেস্টর (সাধারণ পূর্বপুরুষ) নেই।

এনালগাস স্ট্রাকচারগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এগুলো আমাদেরকে দেখায় যে, কিভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে একই ধরনের ফাংশনগুলো বিবর্তিত হয়েছিল। পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে এই অঙ্গগুলোকে তাদের প্রতিনিয়ত ব্যবহার করতে হয়েছিল এবং যে অঙ্গগুলো তাদেরকে পরিবেশে টিকে থাকতে কোনরকম সহায়তা করে নি সেগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে

-------------------------০------------------------

তথ্যসূত্রঃ

https://evolution.berkeley.edu/evolibrary/article/side_0_0/origsoflife_06

https://www.expii.com/t/biochemical-evidence-of-evolution-overview-examples-10259


https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4418793


https://www.expii.com/t/embryological-evidence-of-evolution-summary-examples-10258

https://www.expii.com/t/anatomical-and-physiological-evolution-evidence-types-10256

https://bigganjatra.org/evidence_of_evolution/





6 comments
Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen