top of page

আংটি


মা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী ভদ্রলোক পত্রিকা থেকে মুখ তুলে কাউকে দেখলেন না। পত্রিকার পাতায় মনোযোগ ছিল বিধায় পাত্তা দিলেন না। পরক্ষণেই আবার কান খাঁড়া করে ফেললেন। স্বর্ণকারদের সমূহ বিপদ। সাবধান না থাকলে যে কোন সময় চুরি হতে পারে।

'আংকেল, আমি এখানে। ওই যে সোনালী আংটিটার দাম কতো?'

ভদ্রলোক পত্রিকা রেখে টেবিলের ওপাশে উঁকি দিলেন। দোকানের ঝকঝকে মেঝেতে ছোট একটা ৮/৯ বছরের ছেলে দাঁড়ানো। ক্যাশ কাউন্টারের টেবিল উঁচু বলে দেখতে পাননি।

সুন্দর চেহারা বাচ্চাটির। পরনে মার্জিত টিশার্ট ও জিন্স। চুল একদিকে সিঁথি করা। চোখে চশমা। দেখেই বলে দেওয়া যায় ক্লাসের ভালো ও ভদ্র ছাত্রদের একজন এই ছেলেটি। দোকানদার ভদ্রলোক গুরুত্ব দিতে না চাইলেও ছেলেটির ভালো মানুষের মতো চেহারা গুরুত্ব দিতে বাধ্য করলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কি নাম তোমার আংকেল?

'আরমান। এই যে আংটিটা দেখা যাচ্ছে। এটার দাম কতো?'

দোকানদার ভদ্রলোকের পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে গেলো। নতুন নতুন দোকান দিয়েছেন তখন। এখন যেমন জাঁকজমকপূর্ণ ভাবসাব আছে তখন এসব ছিলো না। নিতান্তই সাদামাটা এক স্বর্ণকারের দোকান। মাঝে মাঝে বাচ্চাকাচ্চা আসতো কাস্টোমারদের সাথে। অনেকেই বিভিন্ন গহনা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতো, এটার দাম কতো আংকেল?

তবে সেসব বাচ্চাকাচ্চাদের মধ্যে মেয়েদের আধিক্য ছিলো বেশি। এই ছেলেটি হঠাৎ কোন আগ্রহ বশে আংটির দাম জিজ্ঞেস করছে কে জানে। হয়তো কোন কাস্টোমারের সাথে এসেছে। উনারা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, বাচ্চাটি আগেই ভেতরে চলে এসেছে।

তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার আব্বু কোথায় আংকেল?

সে বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিলো, আব্বু অফিসে। এটার দাম কতো বলেন না...

দোকানদার বিরক্তি উৎপাদন করতে চাইলেন না। তিনি বললেন, এটার দাম একুশ হাজার নয়শো টাকা।

আরমানের নিরীহ প্রশ্ন, এটা কি স্বর্ণের?

লোকটি হাসলেন। বললেন, হ্যাঁ। বাইশ ক্যারেট স্বর্ণের... উপরে ওই যে পাথর দেখা যাচ্ছে...

কাকে কি বোঝাচ্ছেন! এই ছেলেটি স্বর্ণের কিছু বোঝে? তবে ছেলেটি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে দেখে তিনি কথা শেষ করলেন, ওই পাথরগুলোও অনেক দামী।

আরমান কিছু ভাবলো। ভাবুক মুখে জিজ্ঞেস করলো, এটা কি এঙ্গেজমেন্টের আংটি নাকি বিয়ের আংটি?

দোকানদার দোটানায় পড়ে গেলেন। এটা বিয়ের রিং। কিন্তু এঙ্গেজমেন্ট রিং হিসেবে ব্যবহার করতে বাঁধা নেই। তিনি বললেন, দুটোই। কার জন্য নিবে আংকেল?

'আম্মুর জন্য' ছেলেটির গম্ভীর উত্তর।

'ও। তা তোমার আম্মু কোথায়?'

'আম্মুও অফিসে। আচ্ছা, এটা এঙ্গেজমেন্ট আংটি হিসেবে খারাপ হবে?'

দোকানদার লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কার এঙ্গেজমেন্ট?

আরমানের আরও গম্ভীর উত্তর, আম্মুরও... আব্বুরও...

দোকানদার এবার পুরোপুরি ধন্দে পড়ে গেলেন। আব্বু আর আম্মুর এঙ্গেজমেন্ট! মশকারি করছে নাকি ছেলেটা? নাকি সে জানেই না এঙ্গেজমেন্ট কাকে বলে! তিনি ভাবলেন অনেক সময় দিয়ে দিয়েছি তোমাকে, বেঁচাকেনা নেই, তাই বলে আজাইরা টাইমও নেই। সেলসম্যান ছেলে দুটো গেছে কুরিয়ার অফিসে। ওরা থাকলে না হয় ওরা কথা বলতো এর সাথে।

তিনি কিছু বলবেন তার আগেই আরমান নাম্নী পিচ্চিটি বললো, আচ্ছা এটাই দিন তাহলে। টাকা এখান থেকে রাখেন...

বলে সে একটি ক্রেডিট কার্ড বাড়িয়ে ধরলো। দোকানদার আরও হতভম্ব হয়ে গেলেন! বাচ্চা একটা ছেলের কাছে ক্রেডিট কার্ড! সে আবার প্রায় বাইশ হাজার টাকা দামের এঙ্গেজমেন্ট রিং কিনছে।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কার কার্ড?

'আব্বুর। পিন লাগবে? সেটা জানি আমি। মেশিনটা দেন, আমি পিন দিচ্ছি।'

বাহ। ঝানু পিচ্চি।

'কিন্তু তোমার আব্বুকে ছাড়া দেই কিভাবে বলো তো। উনি কিছু বলবেন না?'

আরমানের মনে ডুগডুগি বাজা আরম্ভ হলো। সে কার্ডটা না বলেই এনেছে। তবু কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে সে বললো, সমস্যা নেই। আব্বুই পাঠিয়েছে আমাকে।

দোকানদার ভদ্রলোক কার্ড পাঞ্চ করলেন। পিন চাইলো না। আংটিটি তিনি ছোট বক্সে ভরে প্যাকেট করে ছেলেটির হাতে দুরুদুরু বুকে দিয়ে দিলেন। মনে মনে ভাবলেন ছেলেটির আত্মীয় স্বজন এবার এসে উনাকে না ধরলেই হলো।

আত্মীয়-স্বজন না, কিছুক্ষণ পর ছেলেটিই আবার ফিরে এলো! আপদ!

আবারও ডেস্কের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, আংকেল একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখেছেন?

'না তো। কোন মেয়ে?'

'নিজের গলা সমান উচ্চতায় হাত ধরে বললো, এতটুকু একটা মেয়ে। আমার ছোট বোন। দেখেছেন?'

'না তো। তোমার সাথে এসেছিলো?'

'না। ও বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। এখন খুঁজে পাচ্ছি না।'

'বলো কি! কার সাথে দাঁড়িয়ে ছিলো?'

'একা।'

ছেলেটার চেহারা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেলো। দেখে মায়া লাগলো। আহারে। বাচ্চা একটা ছেলে, তারচেয়েও বাচ্চা একটা বোনকে হারিয়ে বিপদে পড়ে গেছে। দোকানদার ভদ্রলোক বললেন, আংকেল, আমার দোকানে তো এখন কেউ নাই। আমি বের হতে পারছি না। ট্রাফিক পুলিশকে বলে দিচ্ছি। সে খুঁজে দেখবে।

দোকানের সামনে মাঝ রাস্তার ডিভাইডারে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক পুলিশ হাত উঁচিয়ে গাড়িগুলোকে লাইনে আনছেন। উনার মুখে প্রচন্ড বিরক্তি। ড্রাইভার গুলো যদি একটু নিয়ম মেনে চলতো! রাস্তার ধারে আরেক পুলিশ ভদ্রলোক বাইকের উপর বসে আছেন। সানগ্লাস চোখে স্মার্ট একজন তরুণ। সার্জেন্ট হবেন হয়তো। বেয়াড়া বাইকারগণ উনাকে দেখে মাঝ রাস্তায় চলে যাচ্ছে মামলা খাওয়ার ভয়ে।

দোকানী লোকটি সেই সার্জেন্টকে ডাকলেন। ডেকে বললেন, স্যার, এই ছেলেটি ওর বোনকে হারিয়ে ফেলেছে। একটু দেখবেন?

উনি সন্দেহের চোখে একবার দোকানীকে দেখলেন, আবার ছেলেটাকে দেখলেন, তারপর বললেন, আপনি কে?

'আমি এই দোকানের মালিক। এই ছেলেটা এসেছিলো আমার দোকানে। এখন ছোট বোনকে পাচ্ছে না।' দোকানদার ইচ্ছা করেই আংটি কেনার বিষয়টা এড়িয়ে গেলেন। এই বাচ্চা ক্রেডিট কার্ড পেলো কোথায় সেটা আবার আরেক ঝামেলা পাঁকাতে পারে। ক্রেডিট কার্ড দিয়েছে বলে এতটুকু পিচ্চির কাছে অতো দামের একটা আংটিই বা বিক্রি করতে হবে কেন, এমন প্রশ্নও উঠতে পারে।

এবার আরমানকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথা থেকে হারিয়েছে?

আরমান বললো, এখান থেকেই। আমি দোকানে ঢুকেছিলাম। বের হয়ে দেখি নেই।

'কোথায় গেছে?'

আরমান নিরীহ মুখ করে বললো, জানি না। আমি বলেছিলাম এখান থেকে না যেতে। কিন্তু...

'আচ্ছা। নাম কি?'

'আরমান।'

'তোমার বোনের নাম...'

'সুমি।'

'বয়স কত?'

আরমান মনে মনে হিসাব করে বললো, ছয় বছর।

'স্কুলে পড়ে? স্কুল ড্রেস ছিলো গায়ে?'

'না আংকেল। লাল জামা পরা ছিলো।'

'হুঁ।' সার্জেন্ট ভদ্রলোক কাঁধের কাছে মুখ নিয়ে ওয়াকিটকিতে কিছু একটা বলে আবার জিজ্ঞেস করলেন, কতক্ষণ হলো হারিয়েছে?

আরমান আবারও কিছুক্ষণ হিসাব করে বললো, এক ঘন্টা।

'হুঁ। তুমি আসো আমার সাথে।'

সার্জেন্ট গিয়ে আবারও বাইকের উপর বসলেন। আরমানকেও পেছনে বসিয়ে এই গলি দিয়ে ঢুকে অন্য গলি দিয়ে বের হয়ে এই রাস্তায় ওই রাস্তায় খুঁজতে লাগলেন লাল জামা গায়ের পিচ্চি মেয়েটাকে।

এদিকে সুমি তখন আছে মহা বিস্ময়ে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে অনেক হাতি দেখেছে সে। এমনকি চিড়িয়াখানার খাঁচাতে এই বিশাল জন্তুকে আটকে রাখা হয়েছে। সে জানে হাতি থাকে জঙ্গলে। কোন হাতি যদি দুষ্টুমি করে তবে সেটাকে ধরে চিড়িয়াখানায় বন্দী করা হয়। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় হাতি?! রিকশা, গাড়ি, বাইক কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে সে আপন মনে চলেছে! মাঝেমাঝে এই গাড়ি ওই গাড়ির জানালা দিয়ে লম্বা শুড় বাড়িয়ে ধরছে। যাত্রী বা ড্রাইভাররা সম্ভ্রমের সাথে কিছু টাকা ধরিয়ে দেয়।

পিঠের উপর আবার বাচ্চা মতোন এক ছেলে বসে হাতিকে ধমকাচ্ছে, মারছে! সুমির ছোট সদ্য জানতে আরম্ভ করা মনে হাতিটার