সমগ্র জগতের সৃষ্টি কিভাবে হল?

এই সমগ্র জগতের সৃষ্টি কিভাবে হল? এর শুরু কোথায়, শেষ ই বা কোথায়? মানবজাতির চিরন্তন এই জিজ্ঞাসা।আমরা একে বলি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বা ব্রহ্মাণ্ড।কিন্তু কেন এর নাম অণ্ড?এ নিয়ে বিজ্ঞানের স্বিদ্ধান্ত কি? এ নিয়ে সনাতন ধর্মের স্থিতি ই বা কি?


এই একবিংশ শতকে এসে সৃষ্টিরহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞান কিন্তু অভূতপূর্ব অগ্রগতি লাভ করেছে।আধুনিক সৃষ্টিরহস্য উন্মোচন ধারার শুরু স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন করে গেলেও এর টার্নিং পয়েন্ট আসে ১৯২৭ সালে।সেটা আবার করেন এমন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী যিনি বেলজিয়ামের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একইসাথে খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ও ক্যাথলিক ধর্মপ্রচারক!তার নাম জর্জ ল্যামেটর।তিনি কি করেছিলেন? তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বলেছিলেন যে এই সমগ্র জগত নাকি একটা নির্দিষ্ট পুঞ্জীভূত বিন্দু হতে উৎপন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে যা বর্তমানে বিগ ব্যাং তত্ত্ব নামে খ্যাত।

ধর্ম প্রচারক ব্যাক্তির এরকম অসাধারণ জ্ঞান কিন্তু নতুন নয়।ম্যাক্স মুলার নামক বিখ্যাত প্রাচ্য গবেষক তার লেখা গুণী ব্যাক্তিদের জীবনীসংগ্রহে আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর জীবনী লিখেছিলেন।সেখানে তিনি আশ্চর্যের সাথে বলেছিলেন যে দয়ানন্দ সরস্বতী প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা জানতেন না,সারাজীবন পাহাড়-পর্বত,বনে-বাদাড়ে, আশ্রমে আশ্রমে দূর্গম এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন অথচ সেই দয়ানন্দ সরস্বতী নিজের করা বিখ্যাত ঋগ্বেদের অনুবাদে বেদমন্ত্র হতে দেখিয়েছিলেন সৌরজগতের নিখুঁত বৈজ্ঞানিক বর্ণনা,গ্রহসমূহের ঘূর্ণন গতি,মহাকর্ষ বল।এই আশ্চর্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করে ম্যাক্স মুলার যারপরনাই অভিভূত হয়েছিলেন।

মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক।জর্জ লেমেটর এর পর জর্জ গ্যামফ ও শেষে এডুইন হাবলের হাত ধরে বিশ্ব জানল যে মহাবিশ্ব একটি ডিমের ন্যায় Super Atom নামক অতি ঘনত্ব ও তাপমাত্রা বিশিষ্ট বিন্দু হতে বিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে।একটি ডিম ঠাস করে ফেটে গেলে কি হয়? সবগুলো কণা একে অপরের থেকে দূরে চলে যায়।এডুইন হাবল তার হাবল টেলিস্কোপ দিয়েও তাই আবিস্কার করলেন,দেখালেন মহাবিশ্ব ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে,দূরে চলে যাচ্ছে ছায়াপথগুলো একে অপরের হতে।এই ডিমকে বা আদিগর্ভ যা হতে সমগ্র জগতের সৃষ্টি তাকে আমাদের পবিত্র বেদ,উপনিষদ বলছে ব্রহ্মাণ্ড, হিরণ্যগর্ভ।

এখন সহজভাষায় বলি সৃষ্টির রহস্য নিয়ে বিজ্ঞানের আবিস্কার সম্বন্ধে।আজ হতে প্রায় ১৩৭৫ কোটি বছর আগে এই Super Atom বা ডিমের মত ব্রহ্মাণ্ড তথা হিরণ্যগর্ভ ছিল।সেই হিরণ্যগর্ভ ছিল অতি উত্তপ্ত,খুব ঘন,তখন আর কিছুর ই অস্তিত্ব ছিলনা,স্থান,কাল কিছুই ছিলনা।

পবিত্র বেদ বলছে-

"হিরন্যগর্ভ সমবর্তনাগ্রে ভূতস্য জাতঃ.." "সমগ্রের অগ্রে বা আদিতে ছিল হিরন্যগর্ভ।" (ঋগ্বেদ ১০/১২১/১)

এই হিরণ্যগর্ভের বাংলা নাম স্বর্ণডিম্ব,ইংরেজিতে বলে Golden Egg.

"নাসাদাসিন্নো সদাসিত্তদানীং নাসিদ্রজো ন ব্যাোমা পরো যৎ... কিম আসীদ ঘনম্ গভীরম্" (ঋগ্বেদ ১০/১২৯/১)

"শুরুতে কোন অস্তিত্ব(সৎ) বা অনস্তিত্ব(অসৎ) ছিলনা।সেখানে ছিলনা কোন বায়ুমন্ডল বা কোনকিছুই,ঘন,গভীর,কি তা?কিছুই না হয়েও কিছু"

"তম অসিৎ তমস... তপসস্তন্মহিনাজায়াতৈকম” "সমস্ত ছিল কেবল অন্ধকার।সমস্ত কিছু ছিল জানার অতীত ধোঁয়াশাময়।সেই রহস্য অস্তিত্ব তার চেয়েও রহস্যময়তায় ছিল আবৃত আর তা স্বতস্ফুর্তভাবে প্রচন্ড তাপ ও ক্ষমতা নিয়ে বিদ্যমান হল।" (ঋগ্বেদ ১০/১২৯/৩)

এরপর কি হল? এই Super Atom এর মধ্যে অবস্থিত ছিল ফোটন।ফোটন ভেঙে হল Matter এবং Antimatter নামের দুই ধরনের কণা।কিন্তু সমস্যা হল এরা আবার পরস্পরের সাথে বিক্রিয়া করে পুনরায় Photon এ পরিণত হল।কিন্তু দেখা গেল ১০ বিলিয়ন ফোটন কণা ভাঙলে যে পরিমাণ Anti Matter কণা তৈরী হয় তার চেয়ে ১ টি Matter কণিকা বেশী তৈরী হয়।অর্থাৎ তৈরী হবার পরে Matter আর Anti Matter আবারও মিলিত হয়ে Photon হয়ে গেলেও ১ টি অতিরিক্ত Matter কণাটি রয়েই গেল।এভাবে তৈরী হল শত শত কোটি Matter কণা।এই Matter কণা মূলত দুইরকম-Quarks এবং Lepton.বিজ্ঞান বলছে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় অসংখ্য Matter কণা গলিত তরলাকারে অবস্থান করছিল,যার নাম বিজ্ঞানীরা দেন Quarks Gluon Plasma.সেই Quarks গুলো মিলিত হয়ে হল Hedron নামক যৌগিক কণিকা।আর এই Hedron এর দুটো প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল Neutron ও Proton যা বিগ ব্যাং এর ৩ লক্ষ ৮০ হাজার বছর পর মিলিত হয়ে তৈরী করল Hydrogen কণা,আরও পরে তৈরী হল Helium,Lithium কণা,এর আরও পরে বিশাল বিশাল নক্ষত্রসমূহে উচ্চ চাপে ও তাপে ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরী হল Iron সহ ভারী সব মৌল যা দিয়ে তৈরী হল সমগ্র জগত,গ্রহ,উপগ্রহ সবকিছু।অর্থাৎ সেই গলিত তরল Quarks Gluon Plasma এর মধ্যেই ছিল সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সকল কণা।

পবিত্র বেদ বলছে-

"আপ হ য়দ বৃহাতিরিবিশ্বমায়ান গর্ভম..." "সেই হিরন্যগর্ভে ছিল থাকা উত্তপ্ত তরল হতে যাতে ছিল সৃষ্টির সমস্ত বীজ তা হতে সকল সৃষ্টি ব্যাক্ত হল।" (ঋগ্বেদ ১০/১২১/৭)

শতপথ ব্রাক্ষ্মন ১১.১.৬.১ বলছে, আপো হ বা ইদমগ্রে সলিলমেবাস অকামযন্ত....হিরণ্ময়মাণ্ডং সম্বভূবাজানো হ নহি সংবৎসর..." অর্থাৎ "এই সকল কিছুর অগ্রে হিরণ্যগর্ভে ছিল তরলের সমুদ্র যা মহাশুন্যে ভাসমান।অসংখ্য বছরের পর বছর এই অবস্থায় অতিক্রান্ত হয়।"

"তারপর যেখানে বিস্ফোরন ঘটল ,ব্রহ্ম বিন্দু থেকে যেন সব গতিময় প্রসারিত করতে শুরু করলেন,অব্যাক্ত হতে সব হতে লাগল ব্যাক্ত।" (ঋগ্বেদ ১০.৭২.২)

আর এই হিরণ্যগর্ভের বিস্ফোরণ তথা Big Bang হতে সকল দিকে সমভাবে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র মহাজগত যা আজও সম্প্রসারিত হচ্ছে।আর বিস্ফোরণকালে কম্পনের ফলে যে ধ্বনিতরঙ্গ উৎপন্ন হয়েছিল সেই তরঙ্গটিকে ১৯৪৮ সালে খুঁজে বের করতে সক্ষম হন জর্জ গ্যামফ।বিজ্ঞানীরা একে বলেন Cosmic Background Wave.আমরা বৈদিকরা সেই দৈব,জগতের আদি ধ্বনিকে ভালোবেসে বলি ওঁ!

সেই কসমিক তরঙ্গ নিয়ে ঋগ্বেদ বলছে- তিরশ্চিনো বিততো রশ্মিরেষামধঃ (ঋগ্বেদ ১০.১২৯.৫) অর্থাৎ, সেই তরঙ্গ সমগ্র দিকে সমগ্রদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হল।

আর একদিন এই মহাজগতের পরিণতি কি হবে?স্টিফেন হকিং তাঁর A Brief History Of Time গ্রন্থে মহাবিশ্বের Fate বা নিয়তি নিয়ে বলেছেন যে সম্প্রসারণমান এই জগত একসময় আবার সংকুচিত হতে শুরু করবে।সংকুচিত হতে হতে আবার সেই আগের ন্যায় এক বিন্দুতে পরিণত হবে,সবকিছু আবার ০ তে পরিণত হবে যার নাম তিনি দিয়েছেন Big Crunch বা মহা সংকোচন।

আর পবিত্র বেদে কেবল এক বাক্যেই এই Big Bang ও Big Crunch সম্পর্কে বলে দেওয়া হয়েছে-

বেনস্তৎপশ্যন্নিহিতং গুহা সদ্যত্রবিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম। তস্মিন্নিদং সং চ বি চৈতু সর্বেং স আোতঃ প্রোতশ্চ বিভু প্রজাসু।। (যজুর্বেদ ৩২/৮)

" জ্ঞানি ব্যাক্তিরা সেই পরমাত্মাকে জ্ঞান দৃষ্টিতে দর্শন করেন যার মধ্যে এই সমগ্র জগত অাশ্রয় গ্রহণ করেছে। তার মধ্যেই এই সমগ্র জগত একত্রে মিলিত হয় এবং তার মধ্যে হতেই তা বিছিন্ন হয়।"

অর্থাৎ তার মধ্য হতেই বিস্ফোরণের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়ে জগত সৃষ্টি হয় আর তার মধ্যেই অন্তে সংকুচিত হয়ে সমগ্র জগত আবার মিলিত হয়ে যায়!

এখানে একটি মজার তথ্য দিয়ে রাখি।এই মন্ত্রের 'যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম' অংশটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের মোটো লাইন যার অর্থ 'সমগ্র বিশ্বের যেখানে নীড়' বা 'সমস্ত বিশ্ব যেখানে মিলিত'।

আমরা যেখান থেকে এসেছি অন্তে সেখানেই আবার ফিরে যাব,আবার নতুন করে শুরু হবে সৃষ্টি,এভাবে পুনঃপুনঃ সৃষ্টি-ধ্বংসের মাধ্যমে অনাদি-অনন্ত পরমেশ্বরের সাথে অনাদি প্রকৃতি ও জীবাত্মাও বর্তমান থাকবে।তাই গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন,

ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ। ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মতঃপরম্।। (ভগবদগীতা ২.১২)

অর্থাৎ এমন কোন সময় ছিলনা যখন তুমি বা আমি ছিলাম না,আর এমন কোন সময় থাকবেনা যখন তুমি বা আমি থাকবনা।শুধু পরিবর্তন হবে স্থিতির।পরিবর্তন ই এই ধ্রুব জগতের নিয়ম।

Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen