মেঘের গর্জন বা বজ্রপাতের শব্দ কি ফেরেশতাদের হাকডাক ?


এই প্রশ্নটা শুনতে খুবই হাস্যকর মনে হলেও প্রশ্নটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রশ্নটার উৎপত্তি একটা প্রসিদ্ধ সহীহ হাদিসকে কেন্দ্র করে। চুলুন তাহলে আমরা সেই হাদিসটি দেখে নিই -


  حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَخْبَرَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْوَلِيدِ، وَكَانَ، يَكُونُ فِي بَنِي عِجْلٍ عَنْ بُكَيْرِ بْنِ شِهَابٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ أَقْبَلَتْ يَهُودُ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالُوا يَا أَبَا الْقَاسِمِ أَخْبِرْنَا عَنِ الرَّعْدِ مَا هُوَ قَالَ ‏"‏ مَلَكٌ مِنَ الْمَلاَئِكَةِ مُوَكَّلٌ بِالسَّحَابِ مَعَهُ مَخَارِيقُ مِنْ نَارٍ يَسُوقُ بِهَا السَّحَابَ حَيْثُ شَاءَ اللَّهُ ‏"‏ ‏.‏ فَقَالُوا فَمَا هَذَا الصَّوْتُ الَّذِي نَسْمَعُ قَالَ ‏"‏ زَجْرُهُ بِالسَّحَابِ إِذَا زَجَرَهُ حَتَّى يَنْتَهِيَ إِلَى حَيْثُ أُمِرَ ‏"‏ ‏.‏ قَالُوا صَدَقْتَ فَأَخْبِرْنَا عَمَّا حَرَّمَ إِسْرَائِيلُ عَلَى نَفْسِهِ قَالَ ‏"‏ اشْتَكَى عِرْقَ النَّسَا فَلَمْ يَجِدْ شَيْئًا يُلاَئِمُهُ إِلاَّ لُحُومَ الإِبِلِ وَأَلْبَانَهَا فَلِذَلِكَ حَرَّمَهَا ‏"‏ ‏.‏ قَالُوا صَدَقْتَ ‏.‏ قَالَ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ ‏.

বাংলা অনুবাদঃ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়াহুদীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আবূল কাসিম! আমাদেরকে রা'দ (মেঘের গর্জন) প্রসঙ্গে বলুন, এটা কি? তিনি বললেনঃ মেঘমালাকে হাকিয়ে নেয়ার জন্য ফেরেশতাদের একজন নিয়োজিত আছে। তার সাথে রয়েছে আগুনের চাবুক। এর সাহায্যে সে মেঘমালাকে সেদিকে পরিচালনা করেন, যেদিকে আল্লাহ তা'আলা চান। তারা বলল, আমরা যে আওয়াজ শুনতে পাই তার তাৎপর্য কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এটা হচ্ছে ফেরেশতার হাকডাক। এভাবে হাকডাক দিয়ে সে মেঘমালাকে তার নির্দেশিত স্থানে নিয়ে যায়। তারা বলল, আপনি সত্য বলেছেন। তারা আবার বলল, আপনি আমাদের বলুন, ইসরাঈল ইয়াকুব (আঃ) কোন জিনিস নিজের জন্য হারাম করেছিলেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তিনি ইরকুন নিসা (স্যায়াটিকা) রোগে আক্রান্ত ছিলেন কিন্তু উটের গোশত ও এর দুধ ছাড়া তার উপযোগী খাদ্য ছিল না। তাই তিনি তা হারাম করে নিয়েছিলেন। তারা বলল, আপনি সত্য বলেছেন। [গ্রন্থঃ সূনান আততিরমিজী,অধ্যায়-৪৪ (তাফসীরুল কুরআন), পরিচ্ছেদ ১৪ (সূরা আর - রা'দ), হাদিস নং ৩১১৭, হাদীসের মান - সহীহ ]

English translation: Narrated Ibn 'Abbas: "The Jews came to the Prophet (ﷺ) and said: 'O Abul-Qasim! Inform us about the thunder, what is it?' He said: 'An angel among the angels, who is responsible for the clouds. He has a piece of fire wherever that he drives the clouds wherever Allah wills.' They said: 'Then what is this noise we hear?' He said: 'It is him, striking the clouds when he drives them on, until it goes where it is ordered.' They said: 'You have told the truth.' They said: 'Then inform us about what Isra'il made unlawful for himself.' He said: 'He suffered from sciatica, and he could not find anything agreeable due to it (to consume) except for camel meat and its milk. So for that reason he made it unlawful.' They said: 'You have told the truth.'"

উপরোক্ত হাদীস'টির প্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রা'দ এর ১৩ নং আয়াতে কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চলুন আমরা সেই আয়াত টি দেখে নিই-

কুরআন ১৩ঃ১৩ ---->

" বজ্রধ্বনি ও মালাইকা (ফেরেশতাগন) সভয়ে তাঁর সপ্রশংস মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি বজ্রপাত ঘটান এবং যাকে ইচ্ছা ওটা দ্বারা আঘাত করেন। তথাপি ওরা আল্লাহ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে ; যদিও তিনি মহাশক্তিশালী। " [ বাংলা তাফসীর - কুর'আনুল কারীম, অনুবাদকঃ ড. মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, দারুসসালাম প্রকাশনি ঢাকা ]

এবার আমরা জানবো,উপরোক্ত হাদিস ও কোরানের আয়াতে বর্ণিত তথ্য আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে সঠিক নাকি ভুল। আমরা জানি বজ্রপাত এবং বজ্রপাতের ফলে সৃষ্ট শব্দ (বজ্রধ্বনি) ও বিদ্যুৎঝিলিক একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। সেই সারে ১৪০০ বছর আগের সময়ে বিজ্ঞান এতো উন্নত ছিলো না। বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ও তত্ত্বসমূহ তখনো আবিষ্কৃত হয় নি ফলে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর কারণ সম্পর্কে অজ্ঞতা তখনকার দিনে মানুষকে বাধ্য করতো বিভিন্ন দেব দেবীর আবিষ্কার করতে কিংবা বিভিন্ন রূপকথার জন্ম দিতে । তবে ঐ সময়গুলোতে বহু দার্শনিক তাদের দর্শনগত জ্ঞানের দিক দিয়ে খুব প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। নবী মোহাম্মদকে ও একজন কালজয়ী দার্শনিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আজকে আমরা কোরানে যেসব বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক আয়াত দেখতে পাই, সেগুলো আসলে তাঁর দর্শনচিন্তার ফলাফল বৈ কিছু নয়। কুরআনের বহু আয়াত ও হাদিস গ্রন্থ থেকে ইহার সত্যতা পাওয়া যায়। উপরে দেয়া তিরমিজী শরিফের হাদিসটি পড়লেও আমরা তা বুঝতে পারি। সেই সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে নবী মোহাম্মদ জানতেন না বজ্রপাত কি, কেন ঘটে, বজ্রপাতের সময় শব্দ ও বিদ্যুৎ চমকায় কেন। তাই তিনি তার নিজস্ব দর্শনলদ্ধ জ্ঞানের আলোকে তার সাহাবিদেরকে যতদুর সম্ভব বোঝানোর চেষ্টা করেছেন এবং এটা করতে গিয়ে তাঁকে আল্লাহ ও ফেরেশতা নামক কাল্পনিক চরিত্র সৃষ্টি করতে হয়েছিলো। আর এখানেই তাঁর সবচেয়ে বড় সফলতা, তিনি তাঁর সময়কে জয় কর‍তে পেরেছিলেন এই একেশ্বরবাদী ধারণা প্রবর্তনের জন্যই।

সে যাইহোক, আমরা এখানে তার ব্যক্তিগত জীবন দর্শন নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছি না। আমরা এখানে দেখাতে চাচ্ছি যে, তিরমিজি শরিফের উপরোক্ত হাদীস টি একটি অবৈজ্ঞানিক হাদিস। তাহলে চলুন আমরা এবার জেনে নিই বজ্রপাত কি, বজ্রপাতের সময় শব্দ কিংবা মেঘেরডাক বা মেঘের গর্জন বা বজ্রধ্বনি কেন সৃষ্টি হয় এবং সেইসময় বিদ্যুৎ কেন চমকায়।

বজ্রপাত হল একটি হিংসাত্মক , স্বল্পকালীন আবহাওয়ার বিশৃঙ্খলা যা প্রায়শই বিদ্যুৎঝলক, বজ্রধ্বনি , ঘন মেঘ, ভারী বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি এবং প্রবল, ঝড়ো বাতাসের সাথে সম্পর্কিত। সূর্যের প্রচন্ড তাপে সমুদ্রের পানি বাষ্পীভূত হয়ে আকাশে ঘুরে বেড়ায়। এই বাষ্পীভবনের সময় উত্তপ্ত জলীয়বাষ্প প্রচন্ড দ্রুতগতিতে উর্ধ্বমুখী হয়। এই উর্ধ্বগমিত গরম বাষ্প বায়ুমন্ডলের শীতল স্তরে এসে ঘনীভূত হয়ে পুঞ্জীভূত মেঘ গঠন করে । মেঘে পরিণত হওয়ার সময় এতে প্রচুর স্থির বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়। এই চার্জ সৃষ্টি হয় মেঘের নিচের দিকের বেশি ঘনীভূত বৃষ্টি বা তুষার কণার সাথে বাষ্পীভূত হয়ে উপরে উঠতে থাকা জলকণার সংঘর্ষের ফলে। এই সংঘর্ষের ফলে পজিটিভ ও নেগেটিভ দুই ধরনের চার্জ সৃষ্টি হয়। অপেক্ষাকৃত হাল্কা পজিটিভ চার্জ থাকে মেঘের উপর পৃষ্ঠে এবং ভারী নেগেটিভ চার্জ থাকে নিচের পৃষ্ঠে। যথেষ্ট পরিমাণ পজিটিভ (+) ও নেগেটিভ (-) চার্জ জমা হওয়ার পর পজিটিভ ও নেগেটিভ চার্জ পরস্পরকে আকর্ষণের দরুণ electrostatic discharge প্রক্রিয়া শুরু হয়। discharge তিন ভাবে হতে পারে- ১) মেঘের নিজস্ব পজিটিভ (+) ও নেগেটিভ (-) চার্জের মধ্যে (একে বলা হয় intra cloud বা, IC discharge) ২) একটি মেঘের পজেটিভ (+) কিংবা নেগেটিভ (-) চার্জের সাথে অন্য মেঘের নেগেটিভ (-) কিংবা পজেটিভ (+) চার্জের সাথে (একে বলা হয় cloud to cloud বা, CC discharging) ৩) মেঘের পজেটিভ (+) চার্জের সাথে ভূমির (একে বলা হয় cloud to ground বা, CG discharging) Discharge হওয়ার সময় পজেটিভ (+) চার্জ থেকে নেগেটিভ (-) চার্জের দিকে বাতাসের মধ্য দিয়ে স্পার্ক আকারে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। এ ঘটনাই হল বজ্রপাত। বজ্রপাতের শাব্দিক অর্থ হলো “ভূমিতে বিদ্যুৎ পতিত হওয়া”। তবে সব বজ্রপাতে ভূমিতে বিদ্যুৎ বা চার্জ পতিত হয় না। শুধু মাত্র CG discharging প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন বজ্রপাতে ভূমিতে বৈদ্যুতিক চার্জ পতিত হয়।

বজ্রপাতের সময় বাতাসের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। আমরা জানি বাতাস বিদ্যুৎ অপরিবাহী। কিন্তু মেঘে জমা হওয়া স্থির বিদ্যুৎ এত উচ্চ বিভব শক্তি (১০ মিলিয়ন ভোল্ট পর্যন্ত) উৎপন্ন করে যে, তা বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার জন্য বাতাসের একটা সরু চ্যানেলকে আয়নিত করে পরিবাহী পথ (conductive path) তৈরি করে । আয়নিত পরমাণু থেকে বিকীর্ণ শক্তি তিব্র আলোক ছটা তৈরি হয়। এভাবে আমরা বিদ্যুৎঝিলিক দেখতে পারি।

আবার, Discharge কালীন সময়ে বাতাসের যে চ্যানেলের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় তার তাপমাত্রা প্রায় ২৭০০০ ডিগ্রি সেঃ (যা সূর্যের তাপমাত্রা থেকে বেশি) এ উন্নীত হয় এবং বাতাসের চাপ স্বাভাবিক চাপ থেকে ১০ থেকে ১০০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এ চাপ এবং তাপমাত্রায় পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র এক সেকেন্ডের কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ। এত কম সময়ে তাপমাত্রা ও চাপের এত ব্যাপক পরিবর্তন চারপাশের বায়ুমণ্ডলকে প্রচণ্ড গতিতে (বিস্ফোরণের মত) সম্প্রসারিত করে। এ সময় যে শব্দ তরঙ্গ উৎপন্ন হয় সেটাই আমরা শুনতে পাই।

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, মেঘের গর্জন বা বজ্রপাতের সময় যে শব্দ উৎপন্ন হয় তা আসলে ফেরেশতার হাকডাক নয় ; এটা হল প্রচন্ড উত্তাপে সম্প্রসারিত বায়ুস্তরের কম্পনের ফলে সৃষ্ট একধরনের তরঙ্গ (শব্দ তরঙ্গ) ।

নবী মোহাম্মদ এসব প্রাকৃতিক ঘটনার কারণ সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। তখনকার সময়ে বিজ্ঞান এতো উন্নত ছিলো না। তাই তিনিও বজ্রপাতের কারণ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। ফলে সে তার দর্শনগত চিন্তার আলোকে "ফেরেশতার হাকডাক " নামক কাল্পনিক মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাঁর সাহাবীদেরকে বুঝ দিয়েছিলেন।

Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen