বর্ষা ও আমাদের জীবন

বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ । আর এই ছয় ঋতুর অন্যতম হল বর্ষা । সেই বর্ষার বিচিত্র প্রকৃতি আমাদের জন্য শিক্ষা স্বরূপ । এই বিষয়টি শ্রীল প্রভুপাদ অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে শ্রীমদ্ভাগবতের আলোকে তুলে ধরেছেন । শ্রীমদ্ভাগতম অনুসারে এ বিচিত্র প্রকৃতি ও আমাদের জীবনধারারা মধ্যে অনেক সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় । সেই সাদৃশ্যসমূহের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হল । আশা করি এ লেখাটির মাধ্যমে পাঠকরা বর্ষাকে নবরূপে দর্শন করবেন । এবং সে সাথে নিজের জীবনের আমূল পরিবর্তন ঘটবে ।

বর্ষার সন্ধ্যাতে, অন্ধকার নেমে আসে চতুর্দিক থেকে । থাকে না কোনো তারার ঝিকিমিকি অথবা পূর্ণিমার মনোহর চাঁদ, মেঘে ঢাকা চন্দ্রহীন সেই রাতে মুক্ত আকাশে জেগে ওঠে জোনাকিগুলো আরো উজ্জ্বল হয়ে ।


তাৎপর্য – যেমন করে ঋতুর পরিবর্তন হয় কালের পরিক্রমায় তেমনি বৈশ্বিক ব্রহ্মাণ্ডের সময়ের পরিবর্তন হয় এই সময়ের পরিবর্তনকে বলা হয় যুগ । যেহেতু প্রকৃতিতে তিনটি গুণ রয়েছে । তাই এই যুগগুলো গুণের প্রভাবে প্রভাবিত । ভাল গুণের (সত্ত্বগুণ) দ্বারা যে যুগ প্রভাবিত থাকে তাকে বলা হয় সত্যযুগ । রজোগুণের (অহংকারী গুণ) যে যুগ প্রভাবিত থাকে তাকে বলা হয় ত্রেতাযুগ । (রজো অহংকার) তমো (অজ্ঞতা) গুণের দ্বারা মিশ্রিত যুগকে বলা হয় দ্বাপর এবং অন্ধকার ও অজ্ঞতা রূপ গুণে পূর্ণ যুগকে বলা হয় কলিযুগ (ঝগড়ার যুগ) অথবা শেষযুগ । এটিকে বর্ষা ঋতুর সাথে তুলনা করা যায় । কেননা এই কর্দমাক্ত ঋতুতে আমাদের অনেক কঠিন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় ।

কলিযুগে যথাযথ পথ দেখাতে (অভিভাবকত্ব) এমন লোকের অভাব রয়েছে । হয় চন্দ্র ও তারা রাতে আলো দিয়ে পথ দেখাতে পারে কিন্তু বর্ষায় পথ দেখানোর দায়িত্ব নেয় জোনাকিরা । জীবের সত্যিকার আলো হচ্ছে বৈদিক জ্ঞান । ভগবদ্গীতা বলেছে, সকল বৈদিক জ্ঞানের উদ্দেশ্য হচ্ছে সর্বশক্তিশালী পরমেশ্বর ভগবানকে জানা ।

সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং চ । বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো বেদান্তকৃদ্‌ বেদবিদেব চাহম্‌ ।। (ভগবদগীতা ১৫/১৫) অনুবাদ – আমি সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থিত এবং আমার থেকেই স্মৃতি, জ্ঞান ও বিলোপ হয় । আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য এবং আমিই বেদান্তকর্তা ও বেদবিৎ ।

কিন্তু ঝগড়ার যুগে বিপর্যয় এমন হয়েছে যে, ভগবানের অস্তিত্ব নিয়েও ঝগড়া করে । এই হচ্ছে ঈশ্বরহীন বিবাদপূর্ণ সভ্যতা । এখানে রয়েছে অগণিত ধর্মীয় সমাজ, সম্প্রদায় এবং ধার্মিক শ্রেণী এবং তাদের মধ্যে অনেকে ধর্ম থেকে ঈশ্বরকে বিতাড়িত করতে চায় । যেমন করে সূর্য চন্দ্রের অনুপস্থিতিতে আলো দিতে চায় জোনাকিরা । বর্তমানে অনেকগুলো আত্মস্বীকৃত অবতারের আবির্ভাব রয়েছে যাদের কেউই বৈদিক সাহিত্যের ভিত্তিতে অনুমোদিত নয় । তারপরেও অজ্ঞ মানুষ তাদের অনুসরণ করছে । তাছাড়া এক অবতারের লোকদের সাথে অন্য অবতারের লোকদের ঝগড়া প্রায় নিয়মিত ঘটনা । বৈদিক জ্ঞান এসেছে গুরুশিষ্য পরম্পরা রূপ শৃঙ্খলের মাধ্যমে এবং এই প্রথার বা শৃঙ্খলের মাধ্যমে বৈদিক জ্ঞান অর্জন করতে হয়, এখানে এর কোনো ব্যত্যয় ঘটানো যায় না ।

কিন্তু বর্তমানে এই ঝগড়ার যুগে (কলিযুগে) এই শৃঙ্খল যত্রতত্র ভেঙ্গে যেখানে সেখানে ভেঙ্গে গেছে এবং এভাবে বেদ এখন অননুমোদিত আত্মউপলব্ধিহীন ব্যক্তিদের দ্বারা তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে । তাই তথাকথিত বেদের এই অনুসারীরা ঈশ্বরের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে যেমন করে মেঘাচ্ছন্ন রাতে জোনাকি পোকা চাঁদ ও তারা আলোকে উল্লঙ্ঘন করে নিজেই আলো দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে । তাও সুবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিদের কখনো এই অপ্রকৃতিস্থ, অবিবেকী লোকের দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত নয় ।

ভগবদ্গীতা হচ্ছে সকল বৈদিক শাস্ত্রের সারস্বরূপ । কেননা এটি কথিত হয়েছে সেই একই পরমেশ্বরের দ্বারা যিনি মহাবিশ্বের প্রথম জীব ব্রহ্মার হৃদয়ে বৈদিক জ্ঞান দান করেছিলেন । শ্রীমদভাগবত বিশেষ করে এই যুগের লোকদের পথ প্রদর্শনের জন্যই প্রদান করা হয়েছে । যারা অজ্ঞাতরূপ মেঘের আধারে দিক-ভ্রান্ত হয়েছেন ।

@@ সদয়ভাব নিয়ে ভগবৎ বিজ্ঞান প্রচার @@

বৃষ্টির সেই টুপটাপ শব্দ শুনে ব্যাঙেরা বেরিয়ে পড়ে আলয় (গর্ত) হতে । মুখর করে তাদের ডাকে । যেন ব্রহ্মচারী তার গুরুর আদেশে উচ্চারণ করতে শুরু করেছে বৈদিক মন্ত্রধ্বনি ।

তাৎপর্য – ঈশ্বর বিহীন সভ্যতার যুগে, বিশ্বস্বীকৃত ধর্মগুলির সাধু সন্তরা যারা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী তাদের ঈশ্বরের ইচ্ছানুসারেই বেরিয়ে পড়তে হবে সর্বত্র সাধারণ মানুষের মাঝে ঈশ্বরতত্ত্ব বিজ্ঞান প্রচারে । হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান অথবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী যারা ঈশ্বরের কর্তৃত্বে বিশ্বাসী তাদের অবশ্যই এই ঈশ্বরবিহীন সভ্যতার তড়িৎ প্রবৃদ্ধি দর্শন করে অলস বসে থাকা উচিত নয় । ঈশ্বরের একটি অপ্রাকৃত ইচ্ছা রয়েছে এবং কোনো জাতি, সমাজ এই পরম সত্যকে অগ্রাহ্য করে শান্তি ও সমৃদ্ধিময়ভাবে বাস করতে পারবে না । সতর্কবার্তা এখানে আছে এবং ধর্মীয় দায়িত্ববান নেতাদের অবশ্যই এক মঞ্চে দাড়াতে হবে । গঠন করতে হবে ধর্ম বিশ্বাসীদের একটি দল । আত্মউপলব্ধিকাল ব্যক্তিদের বিক্ষিপ্ত থাকা উচিত নয় । যথার্থ আত্মা সর্বদা পরমেশ্বরের প্রীতিবিধান ও সেবায় যুক্ত থাকে সে মায়ার ভয়ে ভীত হয় না । যেমন আইন মান্যকারী ব্যক্তির পুলিশের ভয় থাকে না । এই ধরনের নির্ভয় ব্যক্তি নির্ভিকভাবে বিজ্ঞান ও বিভিন্ন উপায়ে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে প্রমাণ ও প্রচার করেন । এমনকি মৃত্যুকেও ভয় পায় না । এই ধরনের ভক্ত, যারা ভগবানকে ভুলে গিয়ে ইন্দ্রিয়ের জড় উপভোগের আশায় মিথ্যা জড় আনন্দ নিয়ে উন্মত্ত আছে তাদের জন্য হৃদয়ে অনুকম্পা অনুভব করে ।

এই প্রতিবেদনের আলোচ্য অংশগুলো নেয়া হয়েছে প্রভুপাদের ইংরেজি লাইট অব ভাগবত গ্রন্থ থেকে ।

Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen