top of page

প্রেম কিংবা খুনের গল্প

প্রেমিকার সঙ্গে বিবাহহীন শারীরিক সম্পর্ক আজকাল ডালভাত।কিন্তু আমার গল্পটা একটু ভিন্ন। আমার ভালোবাসার মেয়েটিকে আমি প্রায়ই চুরি করে সিঙ্গারা,জিলাপি,পুরি—এসব খাওয়াতাম।নিজের টাকায় না,বাপের হোটেল থেকে। আসলে আমাদের একটা তেলেভাজা কাম দুপুরে ভাত বেচার দোকান ছিল,পুরান ঢাকার কালিপিচাসের গলিতে।বড়রাস্তা থেকে ডাইনে সোজা মৃত অজগরের মত ঢুকে গেছে পরিচ্ছন্ন গলিটা।সেই গলির শেষ প্রান্তেই মেয়েটির পরিবার একদিন এসে উঠল হলদেটে বাড়ীটায়।ওর বয়স তখন পনেরোর শেষাশেষি।ক্লাস টেনে পড়তো।বয়সের তুলনায় গায়ে গতরে বেশ স্বাস্থ্যবতী আর ভারি মিস্টি ছিল মুখটা।সাদা-ধূসর স্কুল ড্রেসটা পড়ে কোঁকড়া চুলের রাশি খেলিয়ে আমাদের হানিফ বাবুর্চির দোকানের সামনে দিয়ে যখন যেত,তখন আমি হাঁ করে চেয়ে থাকতাম।খদ্দেররা আমার মুখের সামনে টাকার বাতাস করলেও সহজে সম্বিৎ ফিরতো না।


প্রায় ষোড়শীর সঙ্গে আমার পরিচয়ের দিনটা আজো মনে মুক্তোর মত জ্বলজ্বল করছে।টিপে টাপে বৃষ্টি পড়ছিল।দোকানে রহিম চাচা সব ভেজে-ভুজে বসে বসে মাছি মারছে।কাস্টমারের দেখা নেই।আমি টুলের উপর ক্যাসিয়ারে বসে পুরোনো পেপার কাটিং পড়ছিলাম।এমন সময় সে এলো।ড্রেসটা ভিজে গায়ে লেপ্টে আছে।আমি বসে থাকায় সদ্য প্রস্ফুটিত স্তন্যের আভাস প্রথমেই নজরে পড়ল,গা শিরশির করে উঠেছিলো আমার।কিছুটা লজ্জাও ছিল।সে কিন্তু সরল গলায় বলল,”একটা পলিথিন হবে ভাইয়া?”

বোকার মত বললাম,”প-পলিথিন?না,মানে আছে তো,কিন্তু কেন-“

মেয়েটি আন্তরিক গলায় বলল,”দেখছেন না কী রকম ভিজে একসা।সর্দি ফর্দি আজ হবে নির্ঘাত।অন্তত পলিথিনটা মাথায় দিয়ে গেলে বাসায় মা লম্বা লেকচারটা ঝাড়বে না।”

“ও,আচ্ছা -“বলে আমি খুঁজে পেতে একটা বড় পলিথিন বের করে দিয়ে বলেছিলাম,”আর কিছু লাগবে?”

সে অপূর্ব এক মুচকে হেসে বলেছিল,”লাগবে।কিন্তু পলিথিনের মত কি সব ফ্রিতে দেবেন?টাকা নেই আজ।”

মন বলছিল মেয়েটার খিদে পেয়েছে।মিষ্টি মুখটায় কিছুটা নিষ্প্রভ আলো দেখা দিয়েছিল বোধহয়।তাতেই এই আমি কিপ্টে বালক উদার হয়ে বললাম,”কিছু লাগলে নেন।টাকা পরে দিলেও হবে।”

সে খাবারগুলোতে এক নজর বুলিয়ে বলল,”দুইটা সিঙ্গারা আর দুটা জিলাপি।দাম কত পড়বে?”

সামান্য খাবার ক’টা সাদা ঠোঙায় পুরে বলেছিলাম,”বিশ টাকা হল।সময় করে দিলেই হবে।”

সে যাবার সময় বলে গেল,”২৭ নাম্বার বিল্ডিংটার দোতলায় উঠেছি আমরা।টাকা হারানোর ভয় নেই।”

বৃষ্টির গন্ধমাখা হাসনেহানা ফুলের ঘ্রাণটা তখনও ছিল,তবু আমার মাথাটা গরম হয়ে উঠেছিল রহিম চাচার দিকে তাকিয়ে।বুড়ো হাবড়াটা এতোক্ষণ মেয়েটার নারীত্ব প্রকট শরীর লেহন করছিল যেন,এখনো ব্যাটা ওর গমন পথের দিকে চেয়ে আছে,জুলজুল চোখে।আমাদের দোকানে সাধারনত মেয়ে কাস্টমার আসে না;এলে রহিম চাচার চোখের চাপায় পড়তে হয়।আদর্শ চরিত্রহীন!

দু’দিন মেয়েটার আর দেখা নেই।তারপর দিন সকালে যখন আমি ছিলাম না,কলেজে ছিলাম,সে আমাকে খুঁজছিল।ক্যাসে ছিল ছোটভাই শাহীন।ওকেই নাকি টাকা দিয়ে বলেছিল,”বলবেন শঙ্খমালা দিয়ে গেছে।”

রাতে দোকানের ঝাপ ফেলে ভিতর ঘরে যখন শুতে গেলাম,দেখি শাহীন বিছানায় শুয়ে আছে।সজাগ।বাতি নেভাতেই বলে উঠল,”মেয়েটা কে রে?তোর পরিচিত?”

আমার নীরবস্বর,”চিনি না।”

শাহীন সন্দিহান হয়ে বলল,”না,মানে একটা হিন্দু মেয়েকে জানা নেই,শোনা নেই বাকী দিয়েছিস।তাই-“

আমি ঝাঁঝিয়ে উঠলাম,”মেয়েটা যে হিন্দু তুই জানলি কেমনে?”

শাহীন হাসে,”কেন রে শ্লা ভাই,এতো পরিচয় তোর সাথে,নাম বলে নাই!শঙ্খ-মা-লা।”

আমার কানের কাছে মুখ এনে বলে,”যা-ই বলিস,মাইয়াটা কিন্তু জোস।”

আপনারা নিশ্চয় অবাক হচ্ছেন,বড়ভাইয়ের সঙ্গে ছোটভাইয়ের এ কেমন ব্যবহার!আসলে,আমি একটা গুড ফর নাথিং।কিংবা খোদার হতভাগ্য সৃষ্টি।লম্বা-সম্বা বোকাটে চেহারা আমার।পড়ালেখায় অষ্টরম্ভা।একটা অখ্যাত কলেজে বাংলায় বি.এ. শেষ করার ধান্দা করতে হয় বাপের হোটেল সামলে।বাপ আমার মুনসি খালেক উদ্দিন রাজনীতির জোয়ারে ভেসে চার’মাসের জেলে আরামে আছেন সব দায়িত্ব আমাকে ছেড়ে দিয়ে।ছোটভাইটা বাপের খুব আদরের,মেধায় ভরপুর কিন্তু আই.এ শেষ না করেই রাজনীতিতে হাত পাকাচ্ছে।সেই সঙ্গে বোকা-সোকা বড়ভাইয়ের উপর দাপট ঝাড়া তো আছেই।

.

শঙ্খমালা বোধহয় আমার এতোটা কাছে আসতো না,যদি ওর বাবা শ্রী শশীকান্ত দাস হুট করে,বলা যায় হৃদয় রোগে বিনা চিকিৎসায় মারা না যেতেন।বাড়িওয়ালা মা-মেয়ে আর সাত বছরের ভাইটাকে নির্দ্বিধায় বের করে দেবার আগেই শঙ্খমালার ছোটকাকা বউকে নিয়ে উঠল ২৭ নাম্বারের দোতালায়,পূর্বোক্ত ভাড়া পরিশোধ করে।যাক্,আমার প্রেম কিছুদিনের জন্য বেঁচে ছিল।

শঙ্খমালাকে তখনও স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেয়নি,আমিও ভালোবাসি কথাটা স্পষ্ট করে বলি নি,হৃদয়ের কথা যা প্রকাশ পাচ্ছিল সব হাবে ভাবে।দু’একটা ক্যাজুয়াল কথায়।

মলিন হয়ে যাওয়া স্কুল ড্রেসটা পরে শঙ্খমালাকে গলির মুখে ঢুকতে দেখলেই বাবুর্চি রহিম মিয়াকে বলতাম,”পাকঘরে গিয়ে দেখো তো মতিনের বাচ্চাটা কী করতেসে।মোগলাইয়ের লেই আজ তুমি মেখে রাখো।”

রহিম চাচা মুখ অন্ধকার করে বলতো,”মতিন্যার তো ময়দা গুলতেই রাখা হইছে।হাবিজাবি পাকানো,মসলা দেওনের কাজ তো আমি করি।আমি পেছন সামলাইলে সামনে আপনের চাপ পড়বো।”

আমিও রাগি গলায় বলতাম,”চাপ পড়বো না।যা বলছি করো,মতিন রে পাঠায় দ্যাও।”

শঙ্খমালা আসতো আমার দোকানে,বুকের কাছে বইপত্র জড়ো করা।পুরোনো ব্যাগটা এতোটাই ছিড়ে গিয়েছিল যে তা আর ব্যবহারের যোগ্য ছিল না।দ্রুত দু’তিনটা সিঙ্গারা,খানিক ছোলা,ডালপুরি ঠোঙায় ভরে দিতাম।মেয়েটা বেশ ক’দিন ধরে দুপুরে কিছু খেতো না,জিগ্যেস করলে বলতো,বাবা মরে যাওয়াতে কী যেন ব্রত পালন করছে।

মতিন তিন চারজন খদ্দের সামলায়,আমি কাউন্টার থেকে বেরিয়ে আমার ক্ষুদ্র নিবেদন ওর হাতে তুলে দিই।ও নরম করে বলে,”রোজ রোজ দিচ্ছেন।আমি তো হিসাব করে রাখি।ম্যালা টাকা জমে যাচ্ছে।”

আমি ওর চোখে চেয়ে বলি,”আমার তো পুরো জীবনটা খরচের খাতায়,যা জমছে তার মূল্য কি কাগজের নোট দিয়ে হয় ম্যাডাম?”(কাব্যি করে কথা বলছি একজন দোকানদার হয়ে,আমাকে হয়তো মানায় না,কিন্তু কি করবো বলেন?সুন্দর সুন্দর কথাকাব্য তো আর জাত পাত দেখে আসে না।)

তারপর মুখে হাসি ফুটাতাম,”রুকন কেমন আছে?কালরাত্রে কী রকম দুষ্টামি করলো তোমার সাথে?”

“কাল রাতে মোটেও জ্বালায়নি আমাকে।মা খুব মেরেছিল,আমার বুকে মুখ গুঁজে ছেলেটার কি কান্না।”

“কেন মারল শুধু শুধু!”

“কাকিমার পানের বাক্স থেকে পান চুরি করে এনে মায়ের বাক্সে রাখে।মা তখন আনমনা হয়ে রান্না করছিল,খেয়াল করে নি।পরে তো কাকিমা মাকে দু’কথা শুনিয়ে দিল এই নিয়ে।”

কথা বলতে বলতে প্রায় নির্জন গলির শেষ পর্যন্ত চলে আসি ওর সঙ্গে।

দু’টা বাড়ি আগেই আমার হাত ছুঁয়ে ট্রেডমার্ক করা কিশোরী সুলভ সেই হাসিটি দিয়ে সে বলে,”আপনার এতো ঋণ আমি কীভাবে শোধ করবো বলেন তো?”

প্রেমে পড়লে বোকা মানুষরা চালাক হয়,যার প্রমান দিতে আমি বলেছিলাম,”তুমি করে বললেই ঋণ শোধ হয়ে যাবে খুকি—“

শঙ্খমালা অবাক হয়।কিন্তু আমি জানি,সে আসলে এটাই চাইছিল।রাস্তায় পড়ন্ত রোদ্দুরে উড়ে যাওয়া কাকের কা-কা ধ্বনির সঙ্গে সুর মিলিয়ে শঙ্খ আমার হাতে মৃদু একটা চাপ দিয়ে বলেছিল,”তুমি,তুমি,তুমি!তুমি এতো ভালো কেন?”

এর মধ্যে দোকানে খিলি পান বিক্রিও শুরু করে দিলাম।উদ্দেশ্য,শঙ্খমালাকে দু’তিন খিলি প্রতিদিন ধরিয়ে দেবো।ওর মায়ের পানের নেশা প্রচন্ড,কিন্তু এখন...

রোজ রোজ পানের দেখা পেয়ে আমার ওপর শঙ্খমালার মা বেশ প্রফুল্ল হয়ে উঠেছিল,শঙ্খমালা নাকি মায়ের কাছে আমার কথা বলেছিল।বলেছিল,

“জানো না,মানুষটা ভীষন ভালো।আমাকে ছোটবোনের চোখে দেখে,বাবার কাছে নাকি এক সময় পড়তো।আমার তো দাদা নাই।আমি ওকেই সাগরদা বলি।”

আসলে মিথ্যে কফিয়ত না দিলেও চলতো।বাপ মরা,অন্যের কৃপায় থাকা অবস্হায় যদি কারো কাছে একটু দয়া পায়,তবে খারাপ কী!

এই মেয়েকে তো চাইলে আসমানে বিয়ে দেয়া যাবে না।

তখন মোবাইল ফোন এতোটা সহজলভ্য ছিল না।ওর সঙ্গে আমার যোগাযোগের মাধ্যম—হয় মুখোমুখি কথা বলা,নয়তো আমার চেয়েও বোকাটে মতিনের ধারস্থ হওয়া।মতিনকে বলেছিলাম দিনে দু’বার ২৭ নাম্বারের পলেস্তারা খসা বাড়িটার সামনে গিয়ে দাড়াবি ফাঁক পেলে।শঙ্খমালা বারান্দায় মোড়া পেতে পড়তো।এক্সারসাইজ খাতার পেজ ছিড়ে ছোট্ট চিরকুট পাঠাতো আমাকে।সবই ভাববাচ্যে,সেখানে প্রেম ভালোবাসার কথা লেখা থাকতো না।যেমন-

“দুপুরে খাওয়া হয়েছে জনাবের?” “বান্ধবীদের প্রাকটিক্যাল খাতা এঁকে দিচ্ছি,টাকা পাচ্ছি কিছু।” “রোদের দিকে মুখ করে কাউন্টারে দাড়িয়ে থাকা কেন?একটু ভেতরে চেয়ারে বসলেই তো হয়।দোকানে কোনো হীরা জহরত নেই যে ঋত্বিক রোশন চুরি করতে আসবে।” “আজকে পান চিবিয়ে ঠোঁট লাল করবো,২৫ নাম্বারের সামনে যেন থাকা হয়।ভয় দেখানো হবে।”