চেঙ্গিস খানের সমাধি; পৃথিবীর এক রত্নভাণ্ডারের রহস্য! ২য় পর্ব

পৃথিবীর ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে অনাবিষ্কৃত হাজারো রহস্য রয়েছে এখনো প্রতীয়মান। যার কোনো কূলকিনারা পাওয়া সম্ভব হয়নি আজও। রয়ে গেছে হাজারো প্রশ্ন। কোনো উত্তরও মিলেনি সেসবের। এরকম হাজারো রহস্যের মধ্যে অন্যতম একটি রহস্যপূর্ণ ব্যপার হলো, চেঙ্গিস খানের সমাধি। যার কোনো হদিসই মিলেনি আজও। এটা কি কেবলই একটি সমাধি? না! যেনতেন সমাধি নয়। যেনতেন সমাধি হলে তো আর এত রহস্যের কিছু হতো না, এত খোঁজাখুঁজি কিংবা গবেষণাও হতো না। কিন্তু কেন তাহলে এত কিছু এই সমাধি নিয়ে? কী আছে এই সমাধিতে? সবই জানানোর চেষ্টা করব, তবে তার আগে আমাদের জানা দরকার, কে ছিলেন এই চেঙ্গিস খান? কেন তার সমাধি ঘিরে এত রহস্য!

কে ছিলেন এই চেঙ্গিস খান?

ইতিহাসের এক স্মরণীয় পুরুষ এই চেঙ্গিস খান; মঙ্গোলিয় জাতির জনক। সমগ্র মঙ্গোলিয় জাতিকে একীভূত করেছিলেন যিনি। তিনি ইতিহাসের মহা আলোচিত নায়ক চেঙ্গিস খান ওরফে তেমুজিন। কারো কাছে তিনি লুটতরাজ, খুনি কিংবা প্রতিশোধ পরায়ণ এক পাগল রাজা, আবার কারো কারো কাছে তিনি রীতিমতো নায়ক! চেঙ্গিস খানের জন্ম আনুমানিক ১১৫০ থেকে ১১৬০ সনের মধ্যে কোন এক সময়ে (মতান্তরে ১১৬২ সালে) ওনান নদীর তীরবর্তী (মঙ্গোলিয়ার) বোরজিগিন বংশে।। জন্মসূত্রে তার নাম ছিল তেমুজিন। কিন্তু চেঙ্গিস খান (মহান) উপাধি পান তিনি ১২০৬ সালে। এই কথিত আছে যে, তেমুজিন জন্মেছিলেন হাতের মুঠিতে রক্ত নিয়ে। যেটা তাদের ঐতিহ্য ও প্রথা অনুসারে ভবিষ্যতে নেতা হওয়ার লক্ষণ।

ঘোড়া চালনা শিখেছিলেন বাল্যকালেই। এমনকি মাত্র ছ’ বছর বয়সেই তিনি তার নিজ গোত্রের সাথে শিকার অভিযানে বের হন। তার নয় বছর বয়সে বাবাকে হত্যা করা হয় বিষ প্রয়োগে এবং পুরো পরিবারকে করা ঘরছাড়া। বাবা মারা যাওয়ার পর যদিও তিনি চেয়েছিলেন বাবার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে গোত্রপতির পদধারণ করতে। কিন্তু অপরিণত বয়সের কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু নিজের পরিবারের হাল ধরতে হয় তার। এ সময় তিনি তার সৎ ভাইকে হত্যা করেন। এবং জেলেও যান। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে, সেই বয়সেই মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান, নিজের পরিবারের হাল ধরা এবং পরবর্তীতে সেই অভিজ্ঞতাই তার জন্য হয় পাথেয়। এবং ১২০৬ – ১৩৬৮ দিকে মঙ্গোল গোষ্ঠীগুলোকে একত্রিত করেন তিনি, অতঃপর মঙ্গোল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। নিকট ইতিহাসে এটিই ছিল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সম্রাজ্য। । এক সাধারণ গোত্রপতি থেকে নিজ নেতৃত্বগুণে বিশাল সেনাবাহিনী তৈরি করেন।যদিও বিশ্বের কিছু অঞ্চলে চেঙ্গিস খান অতি নির্মম ও রক্তপিপাসু বিজেতা হিসেবে চিহ্নিত। তবুও মঙ্গোলিয়ায় তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে সম্মানিত ও সকলের ভালোবাসার পাত্র। একজন খান হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে চেঙ্গিজ পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার অনেকগুলো যাযাবর জাতিগোষ্ঠীকে একটি সাধারণ সামাজিক পরিচয়ের অধীনে একত্রিত করেন। এবং সামাজিকভাবে এই জাতি মঙ্গোলীয় নামে পরিচিতি পায়। মঙ্গোল জাতির পত্তন ঘটানোর পর ৪০- ৫০ বছর বয়সের সময় তিনি বের হন বিশ্বজয়ে। প্রথমেই পরাজিত করেন জিন রাজবংশকে, এরপর চীন থেকেই তিনি যুদ্ধবিদ্যা কূটনীতির মৌলিক কিছু শিক্ষা লাভ করেন। পালাক্রমে দখল করেন পশ্চিম জিয়া, উত্তর চীনের জিন রাজবংশ, পারস্যের খোয়ারিজমীয় সম্রাজ্য এবং ইউরেশিয়ার কিছু অংশ। মঙ্গোল সাম্রাজ্য অধিকৃত স্থানগুলো হল আধুনিক: গণচীন, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, কাজাখস্তান, কিরগিজিস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, মলদোভা, দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং কুয়েত। এমনকি তিনি মারা যাওয়ার পরও তার পুত্র ও পৌত্রগণ মঙ্গোল সম্রাজ্যে রাজত্ব করেছিল প্রায় ১৫০ বছর ধরে। তিনি কী কী জয় করেছিলেন তার জন্য মঙ্গোলীয় এ বীরকে পশ্চিমারা আজও স্মরণ করে; আর স্বদেশীরা স্মরণ করে তিনি কী কী সৃষ্টি করেছেন তার জন্য। তার হাত ধরেই সর্বপ্রথম পশ্চিমাদের সাথে পূর্বের মেলবন্ধন ঘটে। উন্নত ডাক যোগাযোগ, কাগজের টাকার প্রচলন, ধর্মীয় স্বাধীনতা সবই ঘটেছে তার হাতেই।

তার জীবনে জয়ের শুরুটা ছিল অপহরণকারীদের হাত থেকে নিজের স্ত্রীকে উদ্ধার করা। এবং তারপর থেকেই তিনি যেমন জয় করেছেন রাজ্যের পর রাজ্য, মন কেড়েছেন স্বজাতীয়দের। তেমনি ত্রাসও সৃষ্টি হয়েছে তাকে ঘিরে তার নৃশংসতার জন্য। এখানে উল্লেখ্য যে, ১২২২ সালে আফগানিস্তানের হেরাতে চেঙ্গিস খান শুধু তীর, মুগুর আর খাটো তলোয়ার দিয়ে হত্যা করেছিলেন ১৬ লাখ মানুষ। সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাকালে তার বাহিনীর হাতে খুন হয় ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ। একইসঙ্গে আবার বলা হয়ে থাকে যে, তিনি ৪ কোটি নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর জন্যও দায়ী। কারণ মঙ্গোলীয় সাম্রাজ্যের এই প্রতিষ্ঠাতার ইতিহাস অপহরণ, রক্তপাত, ভালোবাসা ও প্রতিশোধে পরিপূর্ণ। চেঙ্গিস খান ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জায়গা দখল করে নিয়েছিলেন। তার রাজ্য জয় করার পদ্ধতি ছিল ভয়াবহ বীভৎস। কোনো শহর জয়ের আগে সেখানের বাসিন্দাদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আদেশ দেয়া হতো। সেটা না মানলে শুরু হতো অবরোধ। তারপর একসময় অনাহারক্লিষ্ট নগরবাসীর ওপর চালানো হতো অতর্কিত হামলা। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লুটেরা আবার বিজেতা হিসেবেও খ্যাত তিনি। বুঝতেই পারেছেন, একাধারে তিনি ছিলেন দক্ষ শাসক, সংগঠক, জনপ্রিয় নেতা, চৌকষ বীর যোদ্ধা আবার নৃশংস খুনিও। এবার সময় হয়েছে তার কবর সম্পর্কে বলার। কেন এখনো হদিস পাওয়া যায়নি তার সমাধির?

ইতিহাসের এত বড় একজন মানুষ! এত বিখ্যাত, এত সমালোচিত, তিনি মারা গেলেন, আর তার সমাধি কোথায়, সেটা কেউ জানে না। এটা কীভাবে সম্ভব? আদৌ কি বিশ্বাসযোগ্য? কিন্তু বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও বিশ্বাস করতে ই হবে। সত্যি তার সমাধির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এমনকি যারা তাকে সমাধিস্থ করেছিল, তাদের সম্পর্কেই জানা যায়নি তেমন কিছু। কী এমন ঘটনা। চলুন জেনে আসি যতদূর জানা যায়। চেঙ্গিস খানের মৃত্যু হয় ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে ১২২৭ সালে, চীনে। অদ্ভুত না? এমন মহাশক্তিধর বলে বিবেচিত একজন মানুষ, যে কিনা ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মারা গেল এত তুচ্ছভাবে! যাইহোক, মূল আলোচনায় ফিরে আসি।

মৃত্যুর পর তার দেহ চীন থেকে মঙ্গোলিয়াতে আনা হয়। এবং সমাহিত করা হয়। কিন্তু কোথায়? জীবনাবসান হলো চেঙ্গিস খানের, কিন্তু ইতিহাসের অবসান ঘটেনি। রহস্যের শুরু বরং এখান থেকেই। এখান থেকেই আরো বড় ইতিহাসের শুরু। সম্রাটের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ীই তাকে সমাহিত করা হয় মঙ্গোলিয়ার কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে। এবং জানা যায়, চেঙ্গিস খানের মরদেহ নিয়ে মঙ্গোলিয়ার রাস্তায় শোকাহত সেনারা যখন হাঁটছিল তখন তারা পথে যাদের দেখা পেয়েছে, তাদেরই হত্যা করেছে। এছাড়া তার শেষকৃত্যে উপস্থিত সবাইকে হত্যা করা হয়। কারণ তারা সমাধিস্থলের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী রাখতে চায়নি। এমনকি চেঙ্গিস খানের সমাধির সব চিহ্ন মুছে দেয় সেনারা। এ জন্য তারা সমাধির ওপর দিয়ে এক হাজার ঘোড়া চালিয়ে দেয়। যাতে তার কবরের উঁচুনীচু অংশ মিশে যায় ধুলোর সাথে। এবং সেখানে গাছপালা লাগিয়ে গভীর জঙ্গল তৈরী করে দেয়া হয়।


আরেক বর্ণনায় পাওয়া যায়, মৃত্যুর আগেই চেঙ্গিস খানের কবর খোঁড়ার কাজে নিয়োজিত ২৫০০ শ্রমিককে হত্যা করে তার বাহিনীর অন্য একদল সৈন্য। এবং সেই সৈন্যদেরকে পরবর্তীতে হত্যা করে তারই বাহিনীর আরো একদল সৈন্য, যারা সমাধিস্থলে উপস্থিত ছিল না। অতএব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল মহান এক ইতিহাস। কিন্তু কেন এই কবর নিয়ে এত রাখঢাক! রহস্যের শেষ হলো না এখনো। কবর কোথায়, সেটা তো খুঁজে পাওয়াই যায়নি। যদিও দুর্বল কিছু ধারণা পোষণ করা হয়ে থাকে যে, চেঙ্গিস খানের সমাধি মঙ্গোলিয়ার ভিতরেই কোনো দুর্গম পাহাড়ের কাছে রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন অন্যখানে। একজন মানুষ মরে গেলো, সেখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু কবর নিয়ে এত গবেষণা কেন? আর নিশ্চিহ্নই বা করা হলো কেন। যদিও মঙ্গোলিয়রা চায় না তাদের সম্রাটের শান্তির ঘুম বিনষ্ট হোক! তাই তারা এটা নিয়ে এত উচ্যবাচ্য না করলেও, এত খোঁজাখুঁজি না করলেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে এই কবর!

কিন্তু কী আছে এই সমাধিতে?

এক কবর নিশ্চিহ্ন করতে গিয়ে হাজার হাজার জীবনাবসান, ওদিকে আবার মঙ্গোলীয়রাও চায় না যে এই কবরের রহস্য উন্মোচিত হোক। তবু চলছে খোঁজাখুঁজি কিন্তু কেন? তাহলে কি সেই ধারণাই ঠিক? ইতিহাসবীদদের কেউ কেউ যে বলছেন, চেঙ্গিস খানের সমাধি নাকি সমগ্র পৃথিবীর অর্ধেক ধনসম্পদে ঠাঁসা এক রত্নভাণ্ডার! তবে যাইহোক, এতটুকু বোঝাই যাচ্ছে, চেঙ্গিস খান সারা জীবনে যে পরিমাণে ধন-সম্পদ লুট করেছেন তার সবই রেখে দেয়া হয়েছে এই সমাধিতে। বিজিত ৭৮ জন রাজার মুকুটই নাকি সেখানে রাখা আছে বলে ধারণা করা হয়। এবং সর্বশেষ যতদূর জানা যায়, ১৯৯০ সালে মঙ্গোলীয়ার রাজধানীতে অবস্থিত উলানবাটার স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. দিমাজাব আরডেনেবাটারি একটি উদ্যোগ নেন। জাপানের সাথে যৌথ এ উদ্যোগের নাম ছিল ‘তিন নদী প্রকল্প’। কিন্তু সেটিও ব্যার্থ হয়ে যায়। খুঁজে পাওয়া যায়নি রহস্যজনক এই কবর। অস্পৃশ্যই রয়ে গেছে বিশাল এই রত্নভাণ্ডার!

Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen