top of page

গীতা মাধুর্য ৪র্থ পর্ব ( ধৃতরাষ্ট্র থেকে শিক্ষা )


অনেকে প্রশ্ন করে গীতার মতো পবিত্র গ্রন্থে যার শুরু কিনা হয়েছে এক ভিলেন (ধৃতরাষ্ট্র) দিয়ে!! যার ষড়যন্ত্রের কারণে এত বড় একটা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এটা কেমন জানি হলো না।

আসলে কেন গীতার শুরুটা ধৃতরাষ্ট্রকে দিয়ে শুরু করেছে তার ব্যাখ্যা আমাদের আচার্য্যেরা বর্ণনা করেছেন। এই গীতার ৭০০ শ্লোকের মধ্যে প্রথমে যে অক্ষর দিয়ে শুরু হয় তাহল 'ধ' আর একদম শেষে ৭০০ নং শ্লোকের শেষ অক্ষর হলো 'ম'। তার মানে গীতা শুরু হয় 'ধ' দিয়ে আর শেষ হয় 'ম' দিয়ে। তার মানে দুটি অক্ষর একসাথে করলে হয় ধর্ম। তাই পুরা গীতাকে ধর্ম শাস্ত্র বলা হয়।

ধৃতরাষ্ট্র কথাটির অর্থ হলো ধৃত + রাষ্ট্র মানে যিনি রাষ্ট্রকে ধরে রাখেন। যার রাষ্ট্রের প্রতি আসক্ত আছে। ধৃতরাষ্ট্রের ছোটবেলা থেকে রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন আর সেই রাজার চেয়ারের প্রতি তার আসক্ত ছিল। আর সেই আসক্তের কথা ছোট ভাই পান্ডব জানত। তাই কোন বিশেষ কারনে ধৃতরাষ্ট্রকে রাজা না বানিয়ে পাণ্ডুকে রাজা করা হয়। যেহেতু পাণ্ডু জানত তার দাদার আসক্ত ছিল রাজা হওয়ার। তাই তিনি বাইরে বাইরে থাকত আর ধৃতরাষ্ট্রকে রাজসিংহাসনে বসিয়ে যেতেন। আর সেই রাজসিংহাসনে বসে বসে সেই সিংহাসনের প্রতি তার আসক্ত জন্মায়। যদিও পাণ্ডু রাজা ছিল তবুও ধৃতরাষ্ট্র মনে মনে নিজেকে রাজা মনে করতেন।

পরবর্তীতে কোন কারন বশত পাণ্ডু অভিশাপ পান তিনি কোন সন্তান উৎপাদন করতে পারবেন না। তখন ধৃতরাষ্ট্র মনে মনে খুশি হয় কারন আমি রাজা না হতে পারলে কি হবে আমার ছেলেতো রাজা হতে পারবে। যাহোক কুন্তীদেবীর বরে পাণ্ডুর ৫ পুত্র হয়। যেটা ধৃতরাষ্ট্র মেনে নিতে পারে নাই।

ধৃতরাষ্ট্র শুধু রাষ্ট্রের প্রতি আসক্ত ছিল না তিনি তার পুত্রের প্রতি আসক্ত ছিল। তার পুত্র দূর্যোধন যখন হয় তখন অনেক অশুভ সংকেত দেখা দেয়, তাকে বলা হয় আপনারতো ৯৯ সন্তান থাকবে জগত কল্যানের জন্য এই সন্তানকে বিসর্জন দেন কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র সেটা মেনে নিতে পারেননি। দূর্যোধনের প্রতিটি অন্যায় আবদার ধৃতরাষ্ট্র মেনে নিতেন।

ধৃতরাষ্ট্র বিশেষ করে শকুনির দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়েছিল। যদিও ধৃতরাষ্ট্র শকুনিকে সুহৃদ মানত কিন্তু শকুনি ছিল তাদের শত্রু। শকুনির বোন গান্ধারীকে ধৃতরাষ্ট্রের সাথে বিবাহ দিয়েছে সেটা মেনে নিতে পারেননি। তাই সে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই হস্তিনাপুরের সর্বনাশ দেখতে চেয়েছিলেন। তাই ধৃতরাষ্ট্র বুঝতে পারেনি শকুনি কি তার ভাল চাচ্ছে নাকি খারাপ চাচ্ছে।

ধৃতরাষ্ট্র থেকে শিক্ষা নিতে পারি

১) মায়াদেবী আমাদের প্রলোভন দেখায় যেমন সে প্রথমে একটা লাড্ডু দেখিয়ে লোভ লাগাবে এরপর সেই লাড্ডু লুকিয়ে ফেলবে। আর সেই লাড্ডুর আশায় খোজ করতে করতে আমাদের বিনষ্ট করতে থাকে। তাই ধৃতরাষ্ট্র ক্ষেত্রে এরকম হয়েছে। আমাদের জীবনেও সেই লাড্ডুর আশায় আমরা খুজতে থাকি কিন্তু পরিনামে কিছুই পাই না। আশাহি পরম দূখম, ন আশম পরম সুখম ---- ধৃতরাষ্ট্র থেকে আমাদের শিখানো হয় আমরা যাতে এই জগতের সবকিছু প্রতি আশা না করি। নাহয় আমাদের ধৃতরাষ্ট্রর মতো অবস্থা হবে। তাই মায়াদেবী প্রলোভন দেখাবে সেই প্রলোভনে যাতে আমরা না পরি।

২) ধৃতরাষ্ট্র সে তার রাষ্ট্রের প্রতি আসক্ত ছিল যেটাকে সে ছাড়তে চায়নি। আমাদের সবার এক একটা রাষ্ট্র আছে যেটার প্রতি আমরা খুব আসক্ত যাকে ছাড়তে চাই না। একেকজনের আসক্ত একেক জায়গায় সেটা হোক কোন বস্তু বা প্রাণী বা জায়গা যেকোন কিছু। যার ফলে আমরা ভগবানের কাছে যেতে পারি না বা স্মরন করতে পারি না, সেই আসক্ত আমাদের তিলে তিলে গ্রাস করে মেরে ফেরে ফেলে। তাই আমাদের এই আসক্ত থেকে বের হয়ে ভগবানের আরাধনায় ব্যস্ত থাকতে হবে।

৩) দূর্যোধনের জন্ম হওয়ার সময় মায়াদেবী সংকেত দিয়েছিল কিন্তু অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র সেটা বুঝতে পারেনি। তাই আমরাও যাতে ধৃতরাষ্ট্রর মতো অন্ধ না হই। আমরা যাতে সেই সংকেতগুলো বুঝতে পারি।

৪) সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস অসৎসঙ্গে সর্বনাশ। শকুনির খারাপ সঙ্গের প্রভাবে ধৃতরাষ্ট্রের সর্বনাশ হয়েছে তাই ভাল আর খারাপ কে সেটা বুঝতে হলে গীতার জ্ঞান আমাদের শ্রবন আর কীর্তন করতে হবে।

৫) আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে ধৃতরাষ্ট্র নামক এক অসুর আছে। ভগবদগীতা শুরুতে আমাদের আসক্ত ত্যাগ করতে হবে এরপর আমরা গীতার বাণী হৃদয়াঙ্গম করতে পারব। যতক্ষন পর্যন্ত ধৃতরাষ্ট্র নামক অসুর আমরা না বধ করছি ততক্ষন আমরা গীতার বাণী হৃদয়াঙ্গম করতে পারব না। তাই সরল মনে আমাদের আচার্য্যের নিকট থেকে এই গীতার জ্ঞান শুনতে হবে, যেভাবে অর্জুন ভগবান থেকে শুনেছিল।

0 comments