top of page

কৃষ্ণ-সুন্দর

সেকি সুন্দর দা! তুমি এই বটতলায় বসে আছো,আর আমি তোমাকে সারা দুনিয়া ভর খুজে মরছি! বুজি না বাপু,এই বটতলায় তুমি কি এমন অমূল্য রতন খুজে পেয়েছো যে সুযোগ পেলেই এখানে এসে খুটি গারো(বসে থাকো)!


কার্তিক এত কিছু বলার পর‌েও সুন্দর এমন করে অন্যদিকে তাকিয়ে বসে আছে যে সে যেন কিছুই শুনতে পায়নি। গ্রীষ্মের তুফানী বাতাস যেন তাকে বধির বানিয়ে দিয়েছে। কার্তিক এবার সুন্দরের মুখোমুখি গিয়ে দাড়ালো। সুন্দরের চোখে জল দেখে কার্তিক চোখ দুটো বড় বড় করে "ফেললো। —ওমা, তোমার চোখে জল কেন গো সুন্দর দা? তুমি আবারো কাদতে শুরু করে দিয়েছো! দূর, তোমাকে নিয়ে আর পারছি না বাবা। আচ্ছা তুমি কি বাচ্চা নাকি বলো তো! রোজ রোজ এই বটতলায় বসে বাচ্চাদের মতো কান্না-কাটি করতে থাকো। আর আমাকে তোমার হাসাতে হয়! আজ আবার কি হলো, আরে বলবে তো কাদছো কেন? আজও কি কেউ খারাপ কিছু বলেছে?

সুন্দর মুখখানা একটু হাসি হাসি করে কার্তিকের দিকে তাকালো।তারপর মুখে একটা আনন্দভাব আনার চেষ্টা করে বললো, —কার্তিক! একমাত্র তুই ই আমাকে সুন্দর দা বলে ডাকিস কেন রে? আমি দেখতে কি সুন্দর নাকি,যে তুই আমায় সুন্দর দা ডাকিস? আমি তো কালো,কুচকুচে কালো! তুইও তো আমায় কালু দা, কাইল্যা দা বা কানাই দা বলে ডাকিস। বাকি সবাই ডাকে,তবে তুই ডাকবি না কেন? তুই একাই কেন সুন্দর দা ডাকবি? তুইও কালু দা ডাকিস, যদি দা বলতে ভালো না লাগে তবে শুধু কালু বলে ডাকিস!

কথাটা বলা শেষ করতেই সুন্দরের মুখটা আবারো ভারী হয়ে উঠলো। আনন্দের শেষ আভাটুকু তার মুখ থেকে গায়েব হয়ে গেলো। কার্তিক তার মুখের পানে চেয়ে তার কষ্টটা অনুভব করতে পারলো। অতঃপর সে তার ডানহাতের অনামিকা আঙুল দিয়ে সুন্দরের চোখ মুছে দিলো। —এইসব তুমি কি বলছো সুন্দর দা! আর কেনই বা বলছো! কে তোমাকে আবারো কালু বলে ডাকলো, আর ডাকলেই বা কি হলো বন্ধুদের সাথে থাকলে বন্ধুরা তো দুয়েকটু মজা করতেই পারে! তাতে এত কান্নাকাটি করার কি আছে? —ধুইত। ওরা আবার আমার কিসের বন্ধুরে ? "বন্ধু"রা যে এমন হয় সেটা তো কখোনো শুনিনি। ওরা তো আমায় নিয়ে শুধু মজাই করে না। ওরা তো এক কথায় আমাকে অপমান করে। শুধুই আমাকে হেনস্থা করে,ছোট করে। আর আমি কিছু বলতে গেলেই আমি ওদের শত্রু হয়ে যাই। —আচ্ছা সে যাই হোক। ওসব আর মন খারাপ করে রেখো নাতো। —না রে, ওদের নিয়ে আমি আর কি মন খারাপ করবো!মন খারাপের কারণ তো ভিন্ন! —কি কারণ গো! বলো না শুনি! —আজ আমার মা' আমার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে কাদছিলো জানিস? তার ইচ্ছে ছিলো আমার জন্য একটা সুন্দরী বউ আনবে। একটা মেয়েকেও দেখেছিলো আমার জন্যে। কিন্তু তারা যখন আমাকে দেখেছে, তারা নাকি আমায় নিয়ে অনেক বাজে মন্তব্য করেছে। এসব নিয়ে মা প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছে! দেখ, আমি কালো বলে সবাই আমাকে নিয়ে কত মশকরা করে! কত অপমান করে, বাজে কথা বলে। কিন্তু বল, আমি কি ইচ্ছে করে কালো হয়েছি! ঈশ্বর আমাকে যা বানিয়েছেন আমি তো তাই আছি! সবাইকে যদি ঈশ্বর সাদা বানাতেন তবে কি সাদার কদর থাকতো? কিন্তু তারপরেও মাঝে মাঝে অনেক খারাপ লাগে,যখন আমার জন্য মাকেও এত কথা শুনতে হয়! খুবই রাগ ধরে নিজের উপর। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে মরে যাই!

— ছিঃ! এইসব কথা একদম মুখে আনবে না। তুমি কালো কিন্তু সুন্দর নও,কে বলেছে এইসব কথা? তুমি কালো তারপরেও তো তুমি অপূর্ব সুন্দর। তুমি তো সাক্ষাৎ কৃষ্ণ, তুমি তো কৃষ্ণসুন্দর। তোমার গায়ের এই কালো রঙই তোমার সৌন্দর্য। বিয়ের জন্য মেয়ে পাওনি তো কি হয়েছে? আমি আছি না, আমাকে বিয়ে করে নিও। আমি তোমাকে কৃষ্ণ বানিয়ে আমার হৃদয়মন্দিরে সাজিয়ে রাখবো, নিত্যদিন পূজো করবো তোমার!

কার্তিকের কথা শুনে সুন্দর খিলখিল করে হেসে উঠলো। তারপর কার্তিকের চুলগুলো নেড়ে দিয়ে বললো, —তুই না, আসলেই একটা পাগল ! সুন্দর চলে গেলো। কার্তিক তার চলে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার মন ভরে এক বিস্তর অনুশোচনা। আহারে, এমন একটা জলজ্যান্ত কৃষ্ণ হাতের সামনে থাকতেও সে তার পূজো দিতে পারছে না। ______________ এক সন্ধ্যায় কার্তিকের কানে গেলো, সুন্দর বিষ খেয়েছে। সে প্রচন্ড হতাশ হয়ে ছুটে চললো সুন্দরের বাড়ি। সে গিয়ে দেখতে পেলো সুন্দরের কালো মুখখানি দিয়ে সাদা ফ্যানা চুইয়ে পড়ছে। তার কালো অঙ্গে কোনো সাড়া নেই। নিস্তব্ধ হয়ে বুজে আছে চোখ দুখান। কার্তিকও সুন্দরের চোখ দুখানের মতো কিছুটা নিস্তব্ধ হয়ে বসে পড়লো। এক অযাচিত তীব্র আকাঙ্খা তাকে গ্রাস করতে লাগলো। এক না পাওয়ার তীব্র বেদনা তার কানে বাজতে লাগলো। তার চোখ দুটো জুরে বইতে লাগলো তৃষ্ণার্ত নোনাজল। কিছুদিন আগেই চাকমাদের মতো নাকবোচা এক সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেছিলো সুন্দর। কিন্তু বিয়ের দুদিন পরেই মেয়েটা অশান্তি শুরু করে দিলো। অতঃপর বাক-স্বাধীনতার আশ্রয় নিয়ে নিজের বরকে এক রাশ সুন্দরের নিত্যদিনের কয়েকটা গালি শুনিয়ে দিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেলো। পরদিন একখানা ডিবোর্স পেপারও পাঠিয়ে দিলো সে। আর এই কারণেই প্রচন্ড হতাশা আর ডিপ্রেশনে ভুগে অবশেষে ফিনাইল খেয়ে আত্মবলিদান দিলো সে। কার্তিক নিজের কপালের উপর আফসোস করতে লাগলো। কেন সে মেয়ে হলো না। যদি হতো তবে এইভাবে কি এই নিষ্পাপ প্রাণটাকে এভাবে অকালেই ঝড়ে যেতে দিতো? সুন্দরের জন্যও তার প্রচন্ড আফসোস হতে লাগলো! —আহারে সুন্দর। এ কি করলি তুই? যে তোরে এত ভালোবাসলো তারে দূরে সরায় দিলি।আর যে তোরে ভালোবাসে না তারে আপন করতে চাইলি! একবার চান্স দিয়াই দেখতি যদি, আজ এই অসময়ে এমন তরতাজা প্রাণের কি বলিদান দিতে হতো? আহারে, কেউ ভাত না পেয়ে কচুর ঘেচু খায়,আর কেউ বিরিয়ানি পাবার পরেও তাকে পচিয়ে গলিয়ে বাসি করে ফেলে দেয়।

1 comment