কিছু বাঙালি গণিতবিদঃ যাদের অবদানে গণিত আজ সম্মৃদ্ধ



গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের মা। আজ আমরা জানবো কিছু বাঙালি গণিতবিদ সম্পর্কে যাদের অবদানে সম্মৃদ্ধ আজকের গণিত।





অনিল কুমার ভট্টাচার্য একজন ভারতীয় বাঙালি পরিসংখ্যানবিদ যিনি ১৯৩০ থেকে ৪০-এর দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে কাজ করেন।

অনিল কুমার ভট্টাচার্য ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল মাসে পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার ভাতপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ও মাতার নাম ভবনাথ ভট্টাচার্য ও লীলাবতী দেবী।

অনিল কুমার ভট্টাচার্য ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং হুগলী মহসিন কলেজ থেকে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে আইসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে সেই কলেজ থেকেই তিনি বিএ / বিএসসি-তে প্রথম বিভাগের প্রথম স্থান লাভ করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতশাস্ত্রে এমএ পড়তে যান। সেখানে তিনি তার শিক্ষক হিসাবে এফ ডব্লিউ লেভি এবং রাজচন্দ্র বসুকে পান এবং গোল্ড মেডেলিস্ট হিসেবে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে এমএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে লেভির পরামর্শে ভট্টাচার্য পি. সি. মহলানবিশের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং মাননীয় সহকারী হিসাবে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে যোগ দেন।১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত পরিসংখ্যান বিভাগে মহলানবিশের নেতৃত্বে তাকে সাময়িক সময়ের লেকচারার করা হয়।

এখানে তার ছাত্র হিসেবে সি. আর. রাও, এইচ. কে. নন্দী এবং টি. পি. চৌধুরী ছিলেন। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তিনি বিহার সরকারের স্ট্যাটিস্টিকাল অফিসার নিযুক্ত হয়ে পাটনায় গিয়েছিলেন এবং ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে সুপারিনটেনডিং স্ট্যাটিস্টিশিয়ান (প্রশিক্ষণের দায়িত্বে) যোগদান করতে কলকাতা ফিরে এসেছিলেন।

মহলানবিশ তাকে প্রেসিডেন্সি কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগে সময়োপযোগী ক্লাস নিতে বলেছিলেন। পদটি তৈরি হওয়ার পর ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ভট্টাচার্য সম্পূর্ণ সময়ের জন্য সিনিয়র প্রফেসর ও বিভাগের প্রধান হন।

১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে অবসর গ্রহণ না হওয়া পর্যন্ত তার সিনিয়র প্রফেসর পদে অধিষ্ঠিত থাকার কথা থাকলেও ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। অবসর নেওয়ার পর প্রায়শই তিনি একজন অতিথি শিক্ষক হিসেবে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন আবাসিক কলেজের সাথে যুক্ত ছিলেন, যেখানে তার নামে একটি মেমোরিয়াল স্কলারশিপ প্রদান করা হয়।

গবেষণা

অনিল কুমার ভট্টাচার্য বহুবিধ পরিসংখ্যানগুলিতে (multivariate statistics) মৌলিক অবদান রেখেছিলেন। বিশেষ করে দুইটি বহুমুখী বণ্টন পরিমাপের জন্য ভট্টাচার্য গুণক উদ্ভাবন বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ভট্টাচার্য গুণকের উপর ভিত্তি করে তিনি মেট্রিক সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, যা ভট্টাচার্য দূরত্ব নামে পরিচিত। এই পরিমাপটি জীববিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, কম্পিউটার বিজ্ঞান ইত্যাদি পরিসংখ্যানগত নমুনা তুলনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

পরিসংখ্যানগত বিতরণগুলির মধ্যে দূরত্ব সম্পর্কিত তত্ত্ব ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ প্রবর্তন করেন।

তার প্রস্তাবিত D2 মেট্রিক বর্তমানে মহলানবিশ দূরত্ব নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে, ভট্টাচার্য ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা গাণিতিক সমিতি

Dr Anil Kumar Bhattachrya

র একটি কাগজপত্রে বণ্টনের মধ্যে দুরত্ব সম্পর্কিত একটি কোসাইন মেট্রিক সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, যা তিনি ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের একটি সংখায় ফলাফলসহ বিস্তারিত ভাবে প্রকাশ করেন।

ভট্টাচার্যের দুটি প্রধান গবেষণামূলক কাজ হল দুই সম্ভাব্যতা বিতরণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার পরিমাপ এবং নিরপেক্ষ মূলনির্ধারকের বৈসাদৃশ্যে নিম্ন সীমানার পরিমাপ।

অবনীভূষণ চট্টোপাধ্যায় একজন বাঙালি গণিতজ্ঞ ও প্রকাশক। বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার পুত্র।

অবনীভূষণ চট্টোপাধ্যায় ব্রিটিশ ভারতের যশোর জেলার পাইকড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা যাদবচন্দ্র জমিদারের সেরেস্তায় অল্প আয়ে চাকরি করতেন।

অতি দরিদ্র পরিবারে তার পড়াশোনার খরচ চালাবার উপায় ছিলনা। পড়ার একান্ত আগ্রহে অবনী বাড়ি ছাড়েন ও লক্ষীপাশা গ্রামে তার শিক্ষক পন্ডিত শশধর ভট্টাচার্যের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেন।

দীর্ঘ সময় গৃহ শিক্ষকতার কাজ করেছেন এবং কলকাতা এসে ‘পি এম বাগচী’ প্রকাশনা সংস্থার কাজে যুক্ত হন। এসময় তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অঙ্ক নিয়ে স্নাতক পাশ করেন।

অবদান

অবনীভূষণ গণিতের পাঠ্যবই রচনা ও প্রকাশনার কাজ শুরু করেন কলকাতায় থেকে। তার রচিত বইগুলি হল বুনিয়াদী গণিত, প্রাথমিক গণিত, মধ্যশিক্ষা গণিত, উচ্চশিক্ষা গণিত, বীজগণিত প্রবেশ (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ)।

অঙ্ক ছাড়াও তিনি সংস্কৃত ভাষায় সুপন্ডিত ছিলেন। সংস্কৃত টীকা সহ বাংলা বিশ্লেষন ও ব্যাখ্যাকারে শ্রীমদভাগবত গীতার অনুবাদ করেন। তার প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা সংস্থার নাম বিদ্যোদয় লাইব্রেরী। পরে পুত্র সাহিত্যিক দীনেশচন্দ্র এই সংস্থাকে আরো বড় করেন।

কালিপদ বসু, যিনি কে. পি. বসু নামেও পরিচিত, একজন প্রখ্যাত বাঙালি গণিতশাস্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানশিক্ষক। তিনি কে. পি. বসু পাবলিশিং কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা।


কে. পি. বসু বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার হারিশংকরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তার পিতার নাম মহিমাচরণ বসু, যিনি স্থানীয় হরিশংকরপুর রেজিষ্ট্রি অফিসের (তৎকালে ঝিনাইদহ রেজিষ্ট্রি অফিস হরিশংকরপুর গ্রামে অবস্থিত ছিল) একজন ভেন্ডার ছিলেন।

গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা সমাপনান্তে তিনি লর্ড রিপন কলেজে ভর্তি হন এবং এখানে থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে গণিত শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেন।

পড়াশোনা শেষ করে তিনি ১৮৯২ সালে ঢাকা কলেজে গণিত শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন এবং এখানেই আমৃত্যু কর্মরত ছিলেন।

কেশব চন্দ্র নাগ যিনি কে. সি. নাগ নামে বেশি পরিচিত। বাংলাভাযায় তর্কসাপেক্ষে গণিতের সর্বাধিক প্রচলিত বিদ্যালয়স্তরের পাঠ্যপুস্তকের রচয়িতা।

রথযাত্রার দিন হুগলির গুড়াপের নাগপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন কেশব চন্দ্র নাগ। পিতা রঘুনাথ নাগ ও মাতা ক্ষীরোদাসুন্দরী। শৈশবেই পিতৃহারা হন। মা ক্ষীরোদাসুন্দরীই সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্ব পালন করেন।

পড়াশোনা শুরু হয় গুড়াপের একমাত্র বাংলা বিদ্যালয়ে। সপ্তম শ্রেণী থেকে বাড়ি থেকে তিন মাইল দূরের ভাস্তাড়া যজ্ঞেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা। নবম শ্রেণীতে আবার বিদ্যালয় পরিবর্তন, কিষেণগঞ্জ হাইস্কুল।

এখান থেকেই ১৯১২ সালের প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। প্রবেশিকা উত্তীর্ণ হয়ে তিনি কলকাতায় এসে ১৯১৪ সালে রিপন কলেজ ( অধুনা সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে আইএসসি প্রথম বিভাগে পাশ করেন।

তিনি মহাবিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে গৃহশিক্ষকতার শুরু করেন। ভাস্তাড়া যজ্ঞেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে থার্ড মাস্টার হিসাবে কর্মজীবনের শুরু।

কিছুদিনের মধ্যেই সংসারের দায়িত্ব সামলেও চাকরি ছেড়ে অঙ্ক ও সংস্কৃত নিয়ে বিএ পাশ করেন। এরপর অঙ্কের শিক্ষক হিসাবে কিষেণগঞ্জ হাইস্কুল যোগ দিলেন। পরবর্তীতে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলে যোগ দেন।

অঙ্কের শিক্ষক হিসাবে তার সুখ্যাতি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কানে আসলে তিনিই কেশবচন্দ্রকে ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে অঙ্কের শিক্ষক হিসাবে নিয়ে আসেন।সুদীর্ঘ কর্মজীবন শেষে এখান থেকেই তিনি প্রধানশিক্ষক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন।

কলকাতায় প্রথমদিকে রসা রোডে মেসে ভাড়া থাকতেন। পরে ১৯৬৪ সাল থেকে থাকতে শুরু করেন দক্ষিণ কলকাতার গোবিন্দ ঘোষাল লেনে নিজস্ব বাড়িতে।


অঙ্কের বই

মিত্র ইনস্টিটিউশনে কেশবচন্দ্রের সহকর্মী কবিশেখর কালিদাস রায়ের বাড়িতে বসত সাহিত্যিকদের আড্ডা রসচক্র সাহিত্য সংসদ।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, জলধর সেনের মতো দিকপাল সাহিত্যিকরা সেখানে নিয়মিত আসতেন। কেশবচন্দ্রও সেখানে অন্যতম সদস্য হয়ে ওঠেন।

সম্ভবতঃ কবিশেখর কালিদাস রায়ের প্রধান অনুপ্রেরণায় তিরিশের দশকের মাঝামাঝি প্রকাশক ইউ এন ধর অ্যান্ড সন্সের মাধ্যমে ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হল নব পাটীগণিত। কিছুদিনের মধ্যেই পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে পড়ে বইটি। পাঠ্যপুস্তক হিসাবেও স্বীকৃত হয়।

১৯৪২ সাল নাগাদ ক্যালকাটা বুক হাউসের পরেশচন্দ্র ভাওয়ালের আগ্রহাতিশয্যে কেশবচন্দ্রের বাঁধানো অঙ্কের খাতা প্রকাশিত হয় অঙ্কের সহায়িকা ম্যাট্রিক ম্যাথমেটিক্স নামে। বইটি বিশাল জনপ্রিয় হয়।

একে একে আরও অঙ্কের বই প্রকাশিত হয়। ধীরে ধীরে ইংরেজি, হিন্দি, নেপালি, উর্দু ইত্যাদি ভাষায় অনুদিত হয় তার বই।

গণিতের বইয়ের অসম্ভব জনপ্রিয়তা দেখে ১৯৫৫ সালে তিনি নাগ পাবলিশিং হাউস নামে নিজের প্রকাশনা সংস্থা খোলেন।তার বই বিক্রি থেকে পাওয়া রয়্যালটির টাকার একটা বড় অংশ দেয়া হয় দুটি চ্যারিটি ফান্ডে; একটি তার নিজের নামে, অন্যটি তার স্ত্রী লক্ষ্মীমণির নামে।

কেশবচন্দ্র ছিলেন শ্রী শ্রী সারদা মায়ের প্রত্যক্ষ শিষ্য। ১৯২৫ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত নিয়মিত ডায়েরি লিখেছেন। নাম দিয়েছিলেন রত্ন-বেদী। এতে রয়েছে বহু কবিতা, ভক্তিমূলক গান। আবার একই সঙ্গে রয়েছে নানা ধরনের রসিকতার কথাও।

ধর্ম, ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য যেখানে যে মন্তব্যটি মনে ধরেছে, টুকে রেখেছেন এই খাতায়। আর খাতার উপরে লিখে রেখেছেন বিনা অনুমতিতে পাঠ নিষেধ।

এছাড়া অনুবাদকের ভূমিকায় তিনি স্বামী অভেদানন্দের বহু ইংরাজি বক্তৃতা ও ভগিনী নিবেদিতার লেখা অনুবাদ করেছেন।

স্বাধীনতা আন্দোলনেও সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন কেশবচন্দ্র। মহাত্মা গান্ধীর ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণও করেন। গান্ধীজীর ‘অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ’ আন্দোলনেও যোগ দিয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী এই শিক্ষাবিদ।

ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য পাওয়া সনির্বন্ধ অনুরোধ ফিরিয়ে দেন। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাকে বলতেন ‘গণিত শিল্পী’।

খেলাধুলাতে তার প্রবল উৎসাহ ছিলো। তিনি আজীবন মোহনবাগান ক্লাবের সদস্য ছিলেন।

১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫ কানপুরে অনুষ্ঠিত ভারত-ইংল্যান্ড টেস্টের ধারাবিবরণী শুনতে শুনতে উত্তেজনায় সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়। আর দু’বছর পর ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭ কেশবচন্দ্র মারা যান।

রাজ চন্দ্র বোস ছিলেন একজন ভারতীয়-আমেরিকান গনিতবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ।

তিনি বোস-মেসনার অ্যালজেব্রা, সমিতির পরিকল্পনা তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত। তিনি এস.এস. শ্রীকান্দি ও ই.টি. পার্কারের সাথে মিলে ল্যাটিন বর্গের ১৭৮২ সালের লিওনার্ট অয়লার অনুমানকে ভুল প্রমাণ করেন।

রাজ চন্দ্র বোস ভারতের হোশঙ্গাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ৫ ভাইবোনের মধ্যে প্রথম। তার বাবা ছিলেন একজন পদার্থবিদ।

১৯১৮ সালে ইনফ্লুয়েন্জা রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মা মারা যান। পরের বছর তার বাবাও হৃৎপিন্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

এই দুঃসময়েও তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিশুদ্ধ গণিত বিষয়ে তার লেখাপড়া চালিয়ে যান।

তিনি কলকাতার প্রফেসর শ্যামাদাশ মুখার্জীর তত্তাবধানে গনিত বিষয়ে গবেষনা করেন। এরপর তিনি কলকাতার অশোতোষ কলেজে লেকচারার হিসেবে তার শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন।

১৯৩২ সালে রাজ চন্দ্র বোস ভারতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটে খন্ডকালীণ চাকুরে হিসেবে যোগদান করেন। এরপর তিনি ক্রমেইে এই ইনস্টিটিউটের প্রধান গণিতজ্ঞ হয়ে উঠেন। ১৯৩৫ সালে তিনি এই ইনস্টিটিউটের পূর্নকালীন অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পান।

১৯৪০ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং ১৯৪৫ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান।

১৯৪৯ সালে রাজচন্দ্র বোস ক্যাপেল হিলের নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগের প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। তিনি ৭০ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন।


গবেষণা

প্রশান্তচন্দ্র মহালনবিশ এবং সমোরেন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গে মিলে রাজ চন্দ্র বোস “multivariate বিশ্লেষণে” কাজ করেছেন। ১৯৩৮-৩৯ সালে রোনাল্ড ফিশার ভারত সফর করেন এবং “পরীক্ষা নকশা” সম্পর্কে রাজ চন্দ্র বোস সঙ্গে আলোচনা করেন ও কাজ করেন।

রাধানাথ শিকদার একজন বাঙালি গণিতবিদ ছিলেন যিনি হিমালয় পর্বতমালার ১৫ নং শৃঙ্গের (চূড়া-১৫) উচ্চতা নিরূপন করেন, এবং প্রথম আবিষ্কার করেন যে, এটিই বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। এই পর্বত শৃঙ্গটিকেই পরে মাউন্ট এভারেস্ট নামকরণ করা হয়।

রাধানাথ শিকদার ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম তিতুরাম শিকদার | ভ্রাতার নাাম শ্রীনাথ |

ঊনবিংশ শতাব্দীর ১ম ভাগে জরিপ কাজে ব্যবহৃত গণিত বিষয়ে চর্চা প্রয়োগ উদ্ভাবনে তিনি স্বকীয়তার সাক্ষ্য রেখেছেন।

এইজন্য তিনি ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। তিনি জার্মানির সুবিখ্যাত ফিলজফিক্যাল সোসাইটির ব্যাভেরিয়ান শাখার সম্মানীয় সদস্যপদ লাভ করেন ১৮৬২ সালে। গণিতে অসাধারণ পারদর্শিতার জন্য তার এই সম্মান প্রাপ্তি।

রাধানাথ শিকদার ভারতে তদানিন্তন ব্রিটিশ প্রশাসনের জরীপ বিভাগ সার্ভেয়র জেনারেল অফ ইন্ডিয়ার দপ্তরে কাজ করতেন। তিনি ১৮৪০ সালের মহা ত্রিকোণমিতিক জরীপ কাজে অংশ নেন।

১৮৫১ সালে ম্যানুয়াল অফ সারভেইং নামক সমীক্ষণ পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। পুস্তিকার,বৈজ্ঞানিক অংশ রাধানাথ শিকদারের লেখা।

ব্যারোমিটারে সংযুক্ত ধাতব স্কেলের তাপজনিত প্রসারণ এবং পারদের নিজের প্রসারণ জনিত, পরিমাপের ত্রূটি যা আবহমানসংক্রান্ত পাঠ প্রভাবিত করে,সেই ত্রুটি বাতিল করার জন্য ইউরোপে ব্যবহৃত সূত্র, রাধানাথের অজানা ছিল।

সুতরাং রাধানাথ তার বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহার করে, ৩২°ফারেনহাইট (০°সেলসিয়াস) এ ব্যারোমিটার পাঠ/রিডিং কমানোর জন্য, নিজের সূত্র উদ্ভাবন করেন। সূত্রটি তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পত্রে উপস্থাপন করেন।

১৮৫৭ থেকে ১৮৬২ অবধি তিনি আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের ‘আবহবিদ্যা এবং পদার্থবিজ্ঞান কমিটিতে’ সদস্য ছিলেন।

রাধানাথ ১৮৬২ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন, এবং পরে জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজে) গণিত শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।

১৮৫৪ সালে তিনি ও তার ডিরোজিয়ান বন্ধু প্যারীচাঁদ মিত্র “মাসিক পত্রিকা” নামক মহিলাদের শিক্ষাবিষয়ক পত্রিকাটি চালু করেন। তিনি প্রথাগত শৈলী ছেড়ে, একটি সহজ এবং বিশৃঙ্খলমুক্ত শৈলীতে লিখতেন।

গ্রেট ট্রিকনোমেট্রিক সারভে টাওয়ার – সুকচর – উত্তর চব্বিশ-পরগণা

GTS(গ্রেট ট্রিকনোমেট্রিক সারভে) সংক্রান্ত কার্যক্রমের ব্যাপারে ব্রিটিশ সংসদের বক্তব্য ছিল:

“শুধুমাত্র উপ-সহকারী নয়, কর্তব্যনিষ্ঠ, উদ্যোগী এবং অনলস পরিশ্রমী মানুষেরা, যারা জরিপ বিভাগের অন্তর্ভুক্ত, নাগরিক প্রতিষ্ঠানের এমন গঠন করেছেন, যা আর কোথাও দেখা যায় না।

তাদের সাফল্যের অংশীদার, ভারতের শিক্ষাব্যাবস্থা। এঁদের মধ্যে দক্ষতার জন্য সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হিসাবে, উল্লেখ করা যেতে পারে, বাবু রাধানাথ শিকদারের নাম, যিনি একজন ভারতীয়, যার গাণিতিক নিষ্কাশন, সর্বোচ্চ সাফল্য লাভ করেছে।”


২০০৪ সালের ২৭ জুন তারিখে ভারতের ডাক বিভাগ চেন্নাইয়ে ভারতের ত্রিকোণমিতিক জরীপের প্রতিষ্ঠার স্মরণে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে, যাতে রাধানাথ শিকদার ও নইন সিং এর ছবি প্রদর্শিত হয়েছে।

শ্যামাদাস মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি গণিতবিদ। তিনি ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির মুখোপাধ্যায়ের উপপাদ্য এবং চতুর্শীর্ষ উপপাদ্য (Four-vertex theorem) উপস্থাপনের জন্য পরিচিত। তিনি ভারতের প্রথম গণিতবিদ হিসেবে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন।

শ্যামাদাস মুখোপাধ্যায় ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ২২ জুন পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার হরিপাল ব্লকে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বাবু গঙ্গা কান্ত মুখোপাধ্যায় রাজ্য বিচার বিভাগে নিযুক্ত ছিলেন।

চাকরি সূত্রে তাকে বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরিত করা হওয়ায় শ্যামাদাস মুখোপাধ্যায়কে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। তিনি হুগলি কলেজ থেকে স্নাতক হন।

তিনি ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিত বিষয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে তার গাণিতিক তত্ত্বালোচনা On the infinitesimal analysis of an arc-এর জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রিফিত পুরস্কার পান।

তিনি ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে তার নিজস্ব ডিফারেনশিয়াল জ্যামিতির উপরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার থিসিসের নাম ছিল Parametric Coefficients in the Differential Geometry of Curves in an N-space।

শ্যামাদাস মুখোপাধ্যায় কলকাতায় বঙ্গবাসী কলেজে কিছু বছর কাজ করার পর বেথুন কলেজে যোগদান করেন, যেখানে তিনি গণিত ছাড়াও ইংরেজি সাহিত্য ও দর্শনশাস্ত্রে শিক্ষা দিতেন।

১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে তাকে প্রেসিডেন্সি কলেজে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তিনি ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আট সেখানে শিক্ষকতা করেন। ১৯১২খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জী, শ্যামাদাস মুখোপাধ্যায়কে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিশুদ্ধ গণিত বিভাগে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানান।

শ্যামাদাস মুখোপাধ্যায় সেই আমন্ত্রণে সেখানে যোগ দেন। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতা গাণিতিক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি আমৃত্যু এই পদে ছিলেন। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ৮ মে হৃদরোগের আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান।


গবেষণা

শ্যামাদাস মুখোপাধ্যায় সম্ভবত স্নাতককালে তার হুগলি কলেজের শিক্ষক উইলিয়াম বুথের জ্যামিতি বিষয়ক গবেষণা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের গবেষণা মূলত অ-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি, ডিফারেনশিয়াল জ্যামিতি এবং চতুর্মাত্রিক স্থানের স্টেরিওস্কোপিক উপস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপপাদ্য উপস্থাপন করেন।

প্রথম উপপাদ্যটি হল- “the minimum number of cyclic points on a convex oval is 4’’ এবং দ্বিতীয়টি হল- “the minimum number of sextactic points on a convex oval is 6”।

এই দুটি উপপাদ্য প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা গাণিতিক সমিতির বুলেটিনে। কিন্তু সেই সময় এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র বিশিষ্ট ফরাসি গণিতবিদ জাক আদামার ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের গবেষণার গুরুত্ব উপলব্ধি করে কোলেজ দ্য ফ্রঁসে তত্ত্ব দুটির কথা উল্লেখ করেন।

অনেক বছর পরে, এই তত্ত্ব দুটি ইউরোপে পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। জার্মান জ্যামিতিবেত্তা Wilhelm Blaschke শ্যামাদাস মুখোপাধ্যায়কে প্রথম উপপাদ্যটির প্রথম প্রমাণের জন্য উপযুক্ত সম্মান দিয়েছেন। জ্যামিতির আধুনিক সাহিত্যে এই তত্ত্বটি এখন অপ্রত্যাশিতভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে “মুখোপাধ্যায়ের চতুর্শীর্ষ উপপাদ্য” নামে।

পরবর্তীতে শ্যামাদাস মুখোপাধ্যায় এই দুটি উপপাদ্যের সাধারণীকরণ করেন। প্রথম উপপাদ্যের সাধারণ বক্তব্যটি হল “If a circle C intersects an oval V in 2n points (n 2) then there exists at least 2n cyclic points in order on V, of alternately contrary signs, provided the oval has continuity of order 3”।

দ্বিতীয় উপপাদ্যের সাধারণ বক্তব্যটি হল “If a conic C intersects an oval V in 2n points (n> or = 2), then there exist at least 2n sextactic points in order on V, which are alternatively positive and negative, provided V has continuity of order 5”। এইভাবে তিনি আগের তত্ত্ব দুটিকে আরো শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেন।

সমরেন্দ্র কুমার মিত্র একজন ভারতীয় বাঙালি বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদ ছিলেন। তিনি ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের (আইএসআই) ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তির কম্পিউটার (ইলেকট্রনিক এনালগ কম্পিউটার) তৈরি করেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের পলিত গবেষণাগারের গবেষক পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতার আইএসআই-এ যোগদান করেন, যেখানে তিনি অধ্যাপক, গবেষণা অধ্যাপক ও পরিচালক হিসাবে নিযুক্ত হন।

তিনি কলকাতা ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে কম্পিউটিং মেশিন এবং ইলেকট্রনিক্স বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম প্রধান ছিলেন। কলকাতা গাণিতিক সমিতি সমরেন্দ্র কুমার মিত্রকে ভারতের কম্পিউটারের জনক বলা সম্মানিত করে।

সমরেন্দ্র কুমার মিত্র ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ মার্চ কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতা স্যার রূপেন্দ্র কুমার মিত্র এবং মা লেডি সুধাহাসীন মিত্রের এক পুত্র ও কন্যা সন্তানের মধ্যে বয়ঃজ্যেষ্ঠ ছিলেন।

তার পিতা, স্যার রূপেন্দ্র কুমার মিত্র গণিতে এমএসসি স্বর্ণপদক প্রাপক ছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন নিয়েও এমএসসি স্বর্ণপদক প্রাপক ছিলেন এবং ১৯১৩ থেকে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্টে অনুশীলনকারী পেশাজীবী ছিলেন।


১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে রূপেন্দ্র মিত্র কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতা লাভের সময় প্রধান বিচারপতি  ছিলেন এবং ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিচারক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এরপর ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি লেবার আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

সমরেন্দ্র কুমার মিত্র কলকাতার বৌবাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন।

এরপর ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে তার ইন্টারমিডিয়েট ইন সায়েন্স (আই.এসসি) করেন। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে দ্বিতীয় পদে রসায়ন বিজ্ঞানে স্নাতক (বি.এসসি অনার্স) হন এবং রসায়নে কানিংহাম মেমোরিয়াল পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রসায়নে স্নাতকোত্তর স্নাতক (এমএসসি) সম্পন্ন করেন এবং ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান কলেজ থেকে ফলিত গণিতে মাস্টার্স ইন সায়েন্স (এমএসসি) করেন।

পরবর্তী বছরগুলিতে তিনি অধ্যাপক মেঘনাদ সাহার অধীন পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি শুরু করেন, কিন্তু ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তার পরামর্শকের মৃত্যুর পর তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেননি। তিনি অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে তার সম্মানিত শিক্ষক হিসেবে গণনা করেন।

সমরেন্দ্র মিত্র ছিলেন একজন প্রবীণ শিক্ষার্থী। তিনি গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, পোলট্রি বিজ্ঞান, সংস্কৃত ভাষা, দর্শনশাস্ত্র, ধর্ম ও সাহিত্য প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক আগ্রহের সঙ্গে এই স্ব-শিক্ষিত পণ্ডিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি স্বাধীন ভারতের অনেক গবেষণাকেন্দ্রে  উন্নতি সাধনের জন্য সহায়তা করেন।

সমরেন্দ্র মিত্র ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের পলিট ল্যাবরেটরিতে একটি বায়ুচালিত অতিবেগুনী সংশ্লেষের নকশা ও উন্নয়নের উপর বৈজ্ঞানিক ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (সিএসআইআর, ভারত)-এর অধীনে গবেষক পদার্থবিদ হিসাবে কাজ করেছিলেন।

১৯৪৯-৫০ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যের হাই স্পিড কম্পিউটিং মেশিনের গবেষণায় জন্য তাকে ইউনেস্কো বিশেষ ফেলোশিপ প্রদান করে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত গবেষণার জন্য কাজ করেন।

প্রিন্সটনে ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজে তার বিখ্যাত পদার্থবিদ ও গণিতবিদদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়, যেমন আলবার্ট আইনস্টাইন, ভোল্‌ফগাং পাউলি, জন ভন নিউম্যান এবং তিনি নিলস বোর ও রবার্ট ওপেনহাইমারের বক্তৃতাগুলিতে উপস্থিত ছিলেন। অর্থাৎ, প্রিন্সটনে থাকাকালীন তিনি আলবার্ট আইনস্টাইন ও অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে অনেক আলোচনা করেছিলেন।

তিনি কলকাতার  ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে (আইএসআই) ১৯৫০ থেকে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিভিন্ন কারিগরি কাজে কাজ করেন, যেমন কারিগরি সহকারী, অধ্যাপক, গবেষণা অধ্যাপক ও পরিচালক। কলকাতার আইএসআই-তে কম্পিউটিং মেশিন এবং ইলেকট্রনিক্স বিভাগ সমরেন্দ্র মিত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে ব্যালিস্টিক ট্রাজেক্টরির গণনা করার জন্য ভারত সরকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন এবং তার পরামর্শ অনুসারে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের প্রথম বন্দুকের জন্য ফায়ারিং টেবিল সম্পন্ন করা হয়েছিল।

তিনি ১৯৬২-৬৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কমিটি ফর স্পেস রিসার্চের সদস্য ছিলেন। ১৯৬২-৭৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ভারত সরকারের ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের একজন প্রযুক্তিগত উপদেষ্টা ছিলেন।

কম্পিউটারের বিকাশ

১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে দশটি চলরাশি এবং সম্পর্কিত সমস্যাগুলির রৈখিক সমীকরণগুলি সমাধানের জন্য প্রথম ভারতের দেশীয় প্রযুক্তিতে ইলেকট্রনিক এনালগ কম্পিউটার তৈরি করেন সমরেন্দ্র কুমার মিত্র।

কম্পিউটিং মেশিন এবং ইলেকট্রনিক্স ল্যাবরেটরিতে আশিষ কুমার মিত্রের তত্ত্বাবধানে এবং পরিচালনায় কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে এটি নির্মিত হয়েছিল। এই কম্পিউটারের দ্বারা গাউস-সাইডেলের সংশোধিত সংস্করণ ব্যবহার করে একযোগে পুনরাবৃত্তি রৈখিক সমীকরণের সমাধান গণনা করা হয়।

পরবর্তীকালে, ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে, কলকাতার আইএসআই এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ সহযোগিতায় ভারতবর্ষের প্রথম দ্বিতীয় প্রজন্মের দেশীয় প্রযুক্তির ডিজিটাল কম্পিউটারের নকশা ও উন্নয়ন শুরু হয়।

যৌথ সহযোগিতায় সৃষ্ট হাইড স্পিড ইলেকট্রনিক ডিজিটাল কম্পিউটারের সাধারণ উদ্দেশ্য, নকশা ও নির্মাণ আইএসআই-এর কম্পিউটিং মেশিন এবং ইলেকট্রনিক্স ল্যাবরেটরির প্রধান, সমরেন্দ্র কুমার মিত্রের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল। এই ডিজিটাল কম্পিউটারের নাম দেওয়া হয় ISIJU (ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট – যাদবপুর ইউনিভার্সিটি কম্পিউটার)। ISIJU-১ কম্পিউটারটি ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে সফল ভাবে কর্মক্ষম হয়।

সোমেশচন্দ্র বসু একজন বাঙালি গণিতশাস্ত্রবিদ। তিনি ১৮৮৮ ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম ছিল উমেশচন্দ্র বসু। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন এবং ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা জগন্নাথ কলেজে এফ.এ পর্যন্ত পড়েন। এর পরে একাউন্টেন্টসশীপ পাশ করে মানসিক গণনার চর্চা শুরু করেন নিজে নিজে।

মানসিক গননাশক্তির অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার। মুখে মুখে অত্যন্ত দ্রুত জটিল অঙ্ক কষে ফেলতে পারতেন তিনি। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে (বিশ্ববিদ্যালয়) তার এই বিস্ময়কর গননাশক্তির পরিচয় দেন।



৩০ মে ১৯২২ এ ইংল্যান্ড, ২১ সেপ্টেম্বর আমেরিকা ও ২৮ সেপ্টেম্বর কানাডার কুইবেক সিটিতে যান। এই সময় তাকে বাঙালি বিপ্লবী সন্দেহে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ও বন্দী রাখে। ৪৫ দিন পরে মুক্তি পেয়ে আমেরিকা ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানসিক গণনার প্রদর্শন করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিলাভ করেছিলেন।১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় ফিরে আসেন।

গণিতশাস্ত্র বিষয়ে তার রচিত কতগুলি পাঠ্যপুস্তক আছে

1 comment
Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen