কঙ্কাল


জন্মের ২/৩ বছরের সময়ই নাকি আমার দাদা দাদী বুঝতে পারেন তাদের প্রথম সন্তানটি জন্মগত পাগল । তার চলা ফেরা, হাটা চলা, কথাবার্তা নাকি অন্য সুস্থ ছেলেদের সাথে মিলতোনা।সব সময় এক অস্থিরতা তার মধ্যে দেখা যেতো। পুকুরে নামলে সারাদিন তাকে পুকুর থেকে তোলা যেতোনা , খাওয়ার সময় গাছের মগডালে পা ঝুলিয়ে একা একা বিড় বিড় করতো । বাড়িতে মেহমান এলে লাঠি নিয়ে তার পিছু পিছু দৌড়ে বাড়ির ত্রিসিমানা পার করে দিতো ।

একবার সারাদিন পুকুর থেকে কেউ উঠাতে পারেনা , পুকুর পাড়ে দাড়িয়ে সবাই তামাশা দেখে । দাদী কেঁদে হয়রান হয়ে নিজেই ঝাপ দিলেন পাগল ছেলেকে তুলতে , প্রায় পাড়ে তুলে এনেছেন এমন সময় বাবা নাকি দাদীকে ছুড়ে মাঝ পুকুরে ফেলে ছুটে পালায় । তিন দিন পর বাবাকে খুঁজে পাওয়া যায় বাজারের বট গাছের মগডালে । ডালে পা দুলিয়ে গাছের শুকনো ডাল ভেঙে হালিম চাচার মাথায় ছুড়ে বলেন - ভুক লাগছে, খাওন দে । কারো একজনের উপর থেকে ডাক শুনে বাজারের দোকানদার হালিম চাচা বাবাকে টেনে হিচরে নামিয়ে আনেন । হালিম চাচার উপর ক্ষেপে বাবা নাকি কামড়ে চাচার ঘাড়ের মাংশ তুলে নিয়েছিলেন ।

বাবার পিঠেপিঠি ছোট দুই ফুপু , রুপে গুনে অতুলনীয়া । আমার ফুপুদের মতো সুন্দরী নাকি আমাদের গ্রামে কম ছিলো , অথচ ওই ফুপুদের বিয়ে দিতেও দাদার বেশ বেগ পেতে হয়েছে । কন্যার ভাই পাগল , পাগলের বোন বিয়ে করতে কেউ সাহস পেতোনা । বাবার ভয়ে কেউ বাড়ির ত্রিসিমানায় আসার সাহস পেতোনা ।

বোন দুজনের বিয়ের সুবিধার জন্য মায়ের খালারা তাদের বাড়ি নিয়ে বিয়ে দিয়ে পাত্রস্থ করেছেন । তাদের জামাইরাও বাবার দৌড়ানোর হাত থেকে নিস্তার না পেয়ে শ্বশুর বাড়ি আসা ছেড়ে দিয়েছেন ।

দাদা দাদী তাদের সাধ্যমতো কবিরাজ দিয়ে ঝাড়ফুক করিয়ে ডজন ডজন তাবিজের মাদুলী গলায় ঝুলিয়ে দিতেন । তাদের ছেলে সেই মাদুলি ছিড়ে তাবিজ বের করে মাঝ পুকুরে ছুড়ে ফেলে বলতেন - ওই যাহ্ ।

এমনি করে ছেলে বড় হলো , এখন বছরের গরমের ৬ মাস পাগল আর শীতের ৬ মাস ভালো থাকেন । শীতের ৬ মাস দাদা দাদীর শান্তির মাস , গরমের সময় তাদের দুশ্চিন্তা আর অশান্তি ! বছর গেলে বয়স বাড়ে , বয়স বেড়ে বেড়ে বাবা গায়ে গতরে যুবক । গতরের সাথে মনের বড় অমিল , গতর বাড়লেও বুদ্ধি বাড়েনা অথবা পাগলের আবার বুদ্ধি কি ? বড় ছেলের সাথে সাথে ছোট ছেলেরাও তাগড়া জোয়ান মরদ , ওদেরও সংসারী হওয়ার বয়স হয়েছে, দাদা দাদীর বয়স হয়েছে, ছেলেদের বিয়ে দিয়ে সংসারি করে শান্তিতে মরতে চান । অন্যদের নিয়ে সমস্যা নেই , যতো সমস্যা বড় ছেলেকে নিয়ে ।

এক মাঘের হাড় কাপানো কনকনে শীতে ১০ গ্রাম পেরিয়ে সব গোপন রেখে কন্যা দেখতে যান । গরীব ঘরের সুন্দরী কন্যার বাবা এতো বড় ঘরে মেয়ে বিয়ে দেয়ার আনন্দে কোন খোঁজ খবর নেয়ার দরকার মনে করেননা । তাছাড়া মা মরা মেয়ে সহজে কেউ বিয়ে করতে চায়না । দাদার গ্রামে নিজের একটা সন্মান আছে , সেই সন্মানকে সন্মান করে খোঁজ না নিয়ে আমার নানা তার মা মরা মেয়েকে বিয়ে দেন । সেই সুন্দরী কন্যাটি আর কেউ নন , পরবর্তীতে তিনি আমার মা হন। আমার দুখিনি মা !

বাবার বিয়ের ৪ বছর পরের এক গরমে আমার জন্ম , বাবা তখন অপ্রকিতস্থ পাগল । বাড়ির পেছনের আম গাছে তাকে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয় । মা আমাকে বুকের দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে বাবাকে গোসল করান , ভাত মেখে লোকমা তুলে খাওয়ান । রাতে শিকল খুলে গা মুছে ঘরে এনে মশারী টানিয়ে ঘুম পাড়ান । মা একই সাথে যেনো দুটি শিশুর যত্ন করেন ।

আমার জন্মের পর কেউ কেউ নাকি বাবাকে টিপ্পনী কাটতো - রইস্যা পাগলা জাতে মাতাল, তালে ঠিক । পাগল হইলেও ঠিকই বউ চিনে আবার পোলাও জন্ম দেয়, হি হি হি ।

এসব মা গায়ে মাখতেননা , মা আমাকে আর বাবাকে শিশুর মতো যত্ন করতেন । দাদার বিশাল সম্পত্তির মালিক বাবাও । কেউ কেউ চাইতেন পাগলের সংসার না করে মা আমাকে নিয়ে বাপের বাড়ি ফেরত যাক । মা আমার বাবাকে অন্ধের মতো ভালোবাসতেন , পাগল স্বামীকে একদন্ড চোখের আড়াল করতেননা ।

একটু যখন বড় হলাম বাবার পাগলামীও পাল্লা দিয়ে বেড়ে গেলো , এখন শীতেও পাগল হন, গরমেও হন । যখন তখন যেখানে সেখানে পেশাব পায়খানা করে কচলে হাত নোংরা করেন , কাঁদা মাটিতে গড়াগড়ি করে শরীর মেখে রাখেন, মা এতোটুকু বিরক্ত না হয়ে বাবাকে সাফ করেন । আমি নাক কুচকে মায়ের কাজ দেখি , মাঝে মাঝে বালতি ভরে মাকে পানি তুলে দেই । ভেবে পইনা- মায়ের ঘেন্না করেনা এসব সাফ করতে ? এসব সাফ করে খেতে বসলে মায়ের হাতে গন্ধ লাগেনা ? অবাক হতাম এর কোনটাই মায়ের নেই !

একবার বাবার সারা শরীরে ঘা হয়ে পুজ জমে পোকা ধরে গেছিলো , মা কতো যত্ন করে গরম পানিতে লবন মিশিয়ে বাবাকে নরম কাপড়ে ডলে ডলে গোসল করাতো । পুজের ভেতরের পোকা বের করে মলম লাগাতো , আমি দূরে দাড়িয়ে ঘোন্না নিয়ে দেখতাম আর ভাবতাম - আমার মায়ের কোন ঘেন্না নাই কেনো ? সাদা সাদা পোকা বের করতে মায়ের সত্যিই ঘেন্না লাগেনা ? এই পুজ আর পোকা ঘেটে মা খাওয়ার রুচি পায় কই ? একটা বদ্ধ উন্মাদ মানুষের উপর মায়ের এতো ভালোবাসা জন্মে কেমন করে ?

মাঝে মাঝে শিকল খুলে বাবা কোথায় যেনো গায়েব হয়ে যেতো । আমি আর মা মিলে হন্যে হয়ে এপাড়া ওপাড়ার ঝোপ ঝাড়ে বাবাকে খুজে পেতাম , ঝোপে বসে বাবা একা একা কার সাথে যেনো কথা বলেন, নখে মাটি খুটে বিড়বিড় করেন । হঠাত আমাদের দেখে অচেনা মানুষের মতো কপালে হাত ঠুকে সালাম দিতেন । জোড় করে আমরা বাবাকে বাড়ি এনে বিছানায় শুইয়ে পায়ে শিকল বেধে দিতাম । এতো বছরে মা এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন ।

একবার মায়ের খুব জ্বর হলো , উথাল পাথাল জ্বর । জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকেন - বাজানরে তোর বাপের শিকল খুইল্যা দে, হের পায়ে ঘা হইয়া গেছে, ও বাজান হেরে আর কষ্ট দেস ক্যান ? পাগল মানুষটারে হুদাহুদি কষ্ট দেস ক্যান ? হেরে ছাইড়া দে বাজান , আহারে মানুষটা কি কষ্ট পাইতাছে ! মা সুর করে বিলাপ করেন । আমি কিছু না বুঝে মায়ের আদেশ পালন করি । শিকল মুক্ত হয়ে বাবা কোথায় যেনো হারিয়ে যান।

প্রবল জ্বরের ঘোরে মা বাবার গোঙানোর শব্দ না পেয়ে আমার কাছে জানতে চান - তোর বাবার শব্দ পাইনা ক্যান , হেয় এমুন চুপ মাইরা গেলো ক্যান ? বাজানরে হের গলার জবান গেলো কই ? হেয়তো এমন চুপ মাইরা থাহেনা ! অহন রাও শব্দ পাইনা ক্যান ?

দুরু দুরু বুকে মায়ের ছেড়া কাঁথার বিছানার পাশে দাড়িয়ে বলি - মা তুমি না কইছিলা বাজানের শিকল খুইল্যা দিতে ? - হ কইছিলাম , তয় হের রাও শব্দ নাই ক্যা ? - শিকল খুইল্যা আমি ইস্কুলে গেছি, আইয়া দেহি বাজানে নাই ! - ও বাবারে ! এইডা তুই কি কইলিরে এ এ ।

মা গায়ের কাঁথা ছুড়ে বাড়ির বাইরে দৌড় দিলেন , মায়ের পেছন পেছন আমিও দৌড়াই । নিঃস্বাস বন্ধ করে দৌড়েও আমি মায়ের অনেক পেছনে পরে থাকি । মা দিক বিদিক ছুটে বাবাকে খুঁজেন । কয়েক গ্রাম , আত্মীয় বাড়ি খুঁজেও বাবার খোঁজ পাইনা । বাবার খোঁজ না পেয়ে মা রোগে শোকে পাথর হন ।

৩/৪ বছর পর তাহের চাচা খবর দেন বাবাকে জিনার্দী রেল ষ্টেশনে বসে আপন মনে বিড় বিড় করতে দেখেছেন । তাহের চাচা অনেক চেষ্টা করেও বাবাকে তাকে চেনাতে পারেননি । বাড়ি ফেরানোর চেষ্টা করেও পাগল মানুষটাকে আনতে পারেননি ।

খবর শুনে মা আর আমি জীনার্দী ষ্টেশনে ছুটে যাই , অনেক খুঁজেও বাবার খোঁজ পাইনি । দু একজনের কাছে শুনেছি একটা পাগল মাঝে মাঝে ষ্টেশনে বসে একা একা বিড় বিড় করে, দোকানে চেয়ে চিন্তে শুকনো পাউরুটি, সিগারেট নিয়ে উধাও হয়ে যায় । কারো প্রয়োজন পরেনা তাই তার অবস্থান কারো জানা নেই । ২/৩ দিন অপেক্ষা করে আমরা ফিরে আসি ।

মা আজকাল কারো সাথে তেমন কথা বলেননা, নিরবে নিভৃতে সংসারের কাজ করেন । সামনে আমার এইচ, এস, সি, ফরম ফিলাপের টাকা জোগানোর চিন্তা মায়ের মাথায় ঘুরপাক করে । গ্রামের বাড়ির জমিতে ফসল ফলাতে একজন পুরুষ মানুষ লাগে , আমার মায়ের সেই মানুষটা নেই । দাদার কাছ থেকে পাওয়া জমি সারা বছর খালি পরে থাকে। চাচারা যখন গোলা ভরে ফসল তোলে আমাদের গোলা তখন শুন্য । একই জমির ভাগীদার চাচারা সারা বছর ধান বিক্রির টাকায় স্বচ্ছল , আমরা মা ছেলের পেটের দানার অভাব ! চাচাতো ভাই বোনেরা ফসল বেচার টাকায় মেলায় গিয়ে রঙিন খেলনা কিনে আনে , আমি টলোমলো চোখে ওদের হৈ হৈ করে মেলায় যাওয়া দেখি । আমার চোখে মুখে মেলায় যাওয়ার আকুতি দেখে মা আড়ালে চোখ মুছেন ।

চাচারা আমাদের অন্নের ভার নিতে চাইবেন কেনো ? অবশ্য বাবার ভাগের জমির বিনিময়ে ছোট চাচা আমাদের ভাতের ভাগ দিতে চেয়েছেন , মা চাচার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন । আমার মা ধৈর্য হারা হননি , বাবার সম্পত্তি হাতছাড়া করেননি । কতোটা সাহস বুকে থাকলে সন্তানসহ অভূক্ত থাকার ভয় আমার মাকে কাবু করেনি ভেবে অবাক হই ! আমার মায়ের বুক ভরা এতো সাহস কোথা থেকে পান ভেবে আজো অবাক হই !

ভাগ্য ভালো যে মা ভালো কাঁথা সেলাই জানেন , আমাদের দায়িত্ব মা কাঁথা সেলাইয়ের সুতোর সাথে গেথে নিলেন । গ্রামের বউ ঝিরা জানতো মা নিপুন হাতে কাঁথা সেলাইয়ে দক্ষ , সেই সুবাদে অনেকেই কাঁথা সেলাই করতে দেয়, মা আনমনে কাঁথা সেলাই করেন । মা নকশি কাটা ফুলতোলা কাথা বানায়, সুই সূতায় কাজ করেন আর গুনগুন করে গান করেন - সোনা বন্ধুরে আমারে পাগল বানাইলা।

আমি ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছি , পড়ার টাকা জোগাড় মায়ের একার পক্ষে সম্ভব না । কজন বন্ধুুর সাহায্যে ২/৩ টা টিউশানি জোগাড় করেছি । ওদের পড়িয়ে আমার পড়ার টাকা হয়ে বেশ কিছু টাকা বেচে যায় । মা গ্রামে একা থাকেন , সব সময় ভয়ে থাকি - কখন কি হয়ে যায় ।

চাচাদের সাথে পরামর্শ করে জমি জমা এক বছরের জন্য ভাড়া ( পত্তন) দিয়ে মাকে নিয়ে ঢাকা থাকার মোটামুটি টাকা হয়ে যায় হিসাব করে পরের মাসে মাকে নিয়ে এলাম।

এক ধনীর চিলেকোঠায় আমরা মা ছেলের নতুন সংসার শুরু হয় । একটা চৌকিতে আমাদরে মা ছেলের চলে যায় । পুরানো দুটো চেয়ার ১ টা টেবিল কিনে নিলাম পড়ার সুবিধার জন্য । হাড়ি পাতিল, বালতি কড়াই সহ সংসারের মোটামুটি জিনিস নিয়ে মা তার স্বামীর ঘরে তালা দিয়ে আমার কাছে এসেছেন।

মা নিরবে সংসারের কাজ করেন , বটিতে আনাজ কাটার সময় হাত কেটে রক্ত ঝরে, সেই রক্ত আমার অগোচরে আচলে মুছে নেন । মায়ের কেনো এমন ভুল হয় আমি বুঝতে পারি , বাবার জন্য বাবার সংসারের জন্য মায়ের হাহাকার আমি বুঝি । মায়ের চোখে সব সময় দেখি তার নিজের সংসারের হাহাকার , বাবাকে খুঁজে না পাওয়ার হাহাকার ।মা মুখ ফুটে বলেননা, মায়ের চোখের ভাষা আমার বুঝতে অসুবিধা হয়না, মায়ের চোখের ভাষা আমি পড়তে পারি ।

আমরা মা ছেলে পান্তা ভাতে পেয়াজ মরিচ ডলে প্রতিদিনের মতো আজও সকালের নাস্তা সেরে ক্লাশে যেতে তৈরী হচ্ছি , মা আমার কপালে চুমু খেয়ে বলেন - বাজানরে ক দেহি তুই কিয়ের ডাক্তার হবি ? - আগে ডাক্তরী পাশ কইরা লই মা , দোয়া কইরো বেশি বেশি পাশ দিয়া য্যান বড় ডাক্তার হই । - হ বাজান তোর লাইগা আল্লার কাছে কতো দোয়া করি ! - মাগো তুমি ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার লাইগা দোয়া আর কে করে মা ! - কইলিনা বাজান কিয়ের ডাক্তার হইবি ? - আল্লায় যেইডা কপালে রাখছে মা ! - আইচ্ছা বাজান পাগলের ডাক্তার হওন যায়না ? পাগল মানুষটিরে বালা করন যায়না ? হেগো বউ বাচ্চার লাইগা মায়া বাড়ানের ওষুদ দেওন যায়না ?

আমার বুঝতে অসুবিধা হয়না বাবার জন্য মায়ের প্রাণ কতোটা কাঁদে । নিরবে সংসারের, আমার কাজ করে গেলেও মায়ের মন বাবার জন্য আকুলি বিকুলি করে । বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় মা সময় গুনে , এখনও আশা করেন বাবা ফিরে এসে মাকে চমকে দিবেন । পাগল স্বামীটাকে ভালোবেসে মা সংসার করবেন ।

মেডিক্যালের ১ম বর্ষের এনাটমি ক্লাশে এক সময় একটা কঙ্কাল কেনা জরুরী হয়ে যায় । বড় ভাইয়াদের কাছে শুনি আমাদের পরেশ ডোম কঙ্কাল জোগাড় করে দেয় । পরেশ ডোমের শরনাপন্ন হলে তিনি জানালেন ২/৩ মাস অপেক্ষা করতে হবে ।

তিনমাস পর পরেশ ডোম বড় পলিথিনে মুড়িয়ে পাওনা টাকা বুঝে একটা কঙ্কাল আমাকে দিলো । বাসায় ফিরে কঙ্কালটা চৌকির তলায় রেখে রোজকার কাজ করি । ৩/৪ দিন পর ঘরে ফিরে দেখি মা নাকে আচল গুঁজে ওয়াক ওয়াক বমি করছেন । আমাকে দেখে যেনো মায়ের প্রাণ এলো । বলেন - দেখতো বাবা কিয়ের জানি গন্ধ ! পেট মোচড়াইয়া বমি আইতাছে !

কঙ্কালটা রোদে দিতে হবে ভুলেই গেছিলাম , মায়ের কথায় মনে হলো - আরে মা , তোমারে কইতে মনে নাই ! চৌকির তলে একটা কঙ্কাল রাখছি । - ওমাগো ! এইডা কি কস্ ? চৌকির তলে কঙ্কাল ক্যারে ? - ডাক্তারী পড়তে কঙ্কাল লাগে মা , ও মা কাইলকা তুমি এইডারে ছাদে শুকাইতে দিও কেমন? - আইচ্ছা । - ভুইল্যা যাইবানা তো ? - নারে বাজান ! ভুলমু ক্যারে ?

পরদিন ক্লাশ থেকে ফিরে দেখি মা কঙ্কালটা রোদে দিয়ে গালে হাত রেখে ভাবনার জগতে । পেছন থেকে জাপটে ধরলে মা হকচকিয়ে যান, বলেন - তোর বাপের শইলডা এমুন লম্বা আছিলো , হের কঙ্কালডাও এতো লম্বা হইবো । আইচ্ছা বাজান তোর বাপের আর খবর লইবিনা ? মায়ের কথায় আৎকে উঠি ! এইটা আসলেই আমার বাবার বেওয়ারিশ লাশের কঙ্কাল নয় তো ?

ছুটে যাই রমেশ ডোমের কাছে , জানতে চাই - কাকা সত্যি করে বলেন এই কঙ্কাল কোথা থেকে জোগাড় করেছেন ? - এইডা তো কওন যাইবোনা বাবা । - কাকা আপনার পায়ে ধরি , কেউ জানবেনা, কাউকে বলবোনা । আমাকে একটু দয়া করেন কাকা !

মাতাল রমেশ ডোমের মধ্যে মায়ার চিহ্ন দেখি , একটু এগিয়ে এবার সত্যিই তার পায়ে ধরি । রমেশ ডোম একটু একটু করে বলতে থাকে - বাবারে মানুষ যহন মইরা যায় তহন আমাগো কাছে হের পরিচয় অয় লাশ নামে । আমরা আশায় থাহি হেগো আত্মীয় স্বজন কহন আইয়া তাগো লাশ নিবো । কোন কোন লাশের কপাল খারাফ অইলে হেগো স্বজন আহেনা , হেরা অয় বেওয়ারিশ । রশিদ পাগলা আছিলো তেমন একজন বেওয়ারিস । হেয় বহু বছর হাসপাতের বারিন্দায় বইয়া বিড়বিড় কইরা নিজে নিজে কতা কইতো । কেউ খাওন দিলে খাইতো , না দিলে না খাইয়া বারিন্দায় গুমাইতো । - কাকা উনার নাম যে রশিদ তা জানতেন কেমনে ? - হেয় বিড়বিড় কইরা কইতো - হে হে রশিদ পাগলা , বিড়ি খাইবিনা ? তহন বুজতাম হের নাম রশিদ । - তারপরে কি হইলো কাকা ? - রশিদ পাগলার একদিন বেদম জ্বর অইলো , ডাক্তার ছাড়েগো কইয়া হেরে মেডিকেলো বর্তী করাই । ৩/৪ দিনের জ্বরে রশিদ পাগলায় মইরা যায় । হের লাশ ১ মাস লাশগরে থাইকা পোকে দরে । হেই লাশের কঙ্কালডা তোমার কাছে বেচছি বাবা ।

আমি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আমাদের চিলেকোঠার সংসারে ছুটে আসি , মা তখনও কপালে বাম হাত রেখে ডানহাতে কঙ্কালে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করছেন । মাকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরি , ফিসফিস করে বলি - মা, মাগো বাবার খোঁজ পাইছি। মা নিষ্প্রান ঘোর লাগা চোখে আমাকে দেখেন , আরো জোড়ে মাকে বুকে চেপে ধরি - মা তুমি কিছু হোননা ? ও মা কি কইতাছি হোননা ? - আমিও পাইছি , এই হাড্ডির মইদ্দে তর বাপের গেরান পাইছি !

বাবার কঙ্কালটা মা প্রাণ ভরে আদর করুক , বুকে জড়িয়ে কেঁদে হালকা হোক । চিৎকার করে কেঁদে বুকের জমানো কষ্ট হালকা করুক। আমিও নিরিবিলি কোন জায়গা খুজে বুক উজার করে ক্ষানিক কেঁদে নেই !

এই ইট শুরকীর শহরে এমন কোন নিরিবিলি জায়গার খোঁজে আমি পথে নেমেছি , জানিনা খুঁজে পাবো কিনা............................ !!!!!!!!!

( আমার ছেলে ডাক্তারী ভর্তি হওয়ার পর তার এনাটমি ক্লাশের জন্য একটা কঙ্কাল কিনতে হয় ।লম্বা এই কঙ্কালটা দেখার পর আমার মনে হতো এই মানুষটার নিশ্চয়ই সংসার ছিলো , সন্তান ছিলো এবং এটা একটা বেওয়ারিশ লাশের কঙ্কাল । সেই থেকে এই গল্পটা আমার মাথায় ঘুরপাক করে । অনেক বছর পর আজ এই কঙ্কালটা নিয়ে লিখলাম।। )

14 comments
Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen