এম্বুলেম্স এবং একটি রাত ।

2006 সালের ঘটনা । ড্রাইভিং শিখে বসে আছি । কোন গাড়ি পাচ্ছি না । এক বড় ভাই সরকারি হাসপাতালে এম্বুলেম্স চালান । তিনি বললেন, তুই বসে না থেকে আমার সাথে থাক । আমারো একজন সাথে লোক দরকার । তুই থাকলে আমার সুবিধেই হবে আর তোর হাতটাও চালু থাকবে । বড় ভাইয়ের কথায় আমি যেন লাল মঙ্গলগ্রহ হাতে পেলাম ।

কয়েকদিন ধরে বেশ চলছে । যারা এম্বুলেম্স চালান তাদের যে কতটা অভিজ্ঞ হতে হয় তা দেখলাম । বেশ দিন চলছে । সরকারি খরচের গাড়ি হলেও বেশ আলগা কামাই আছে । তেল মবিল নিয়মিত চুরি করা যায় । টুক টাক ভাড়াও মারা যায় । হাসপাতালে এমার্জেন্সি রুগি আসলে কল দেয় । রুগী না থাকলে রেস্ট । একদিন রাত নয়টার দিকে কল এলো হাসপাতাল থেকে । গাড়ি নিয়ে গেটের কাছে গেলাম ওস্তাদের সাথে । গিয়ে দেখি একজন আনুমানিক 33 বা 35 বছরের মহিলা গলায় গরুর দঁড়ি পেচিয়ে ঝুলে পড়েছিলেন । কেউ দেখে ফেলার কারণে এবং দুই পা ধরে তুলে ধরার কারণে সাথে সাথে মরে নাই । অর্ধেক মরেছে । দঁড়িতে ঝুল দেওয়ার কারণে গলার ভোকাল কড ছিঁড়ে গেছে । কণ্ঠনালী ভেঙে গলার ভেতর ঢুকে গেছে । ধরধর করে রুগিকে হাসপাতালে এনেছিল । এখানকার ডাক্তার রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিতে বলেছেন ।


রুগী হা করে আছেন । বুঝতে পারছি শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে । আমি রুগীর মুখে অক্সিজেন মাক্স লাগিয়ে শুইয়ে দিয়ে বসলাম ওস্তাদের পাশে । রুগির সাথে রুগির মা বোন এবং রুগীর স্বামী ।

হাসপাতাল পেড়িয়ে চারপাশে তুমুল বেগে সাইরেন বাজিয়ে ঝড়ের বেগে এম্বুলেম্স যাচ্ছে । আমি মাঝে মধ্যে মাথার কাছের নেটের জানালা সরিয়ে দেখছি কি অবস্থা রুগির ।

ওস্তাদ বললেন কি অবস্থা ?

আমি বললাম, ভাই গাড়ি একটু জোরে টানতে থাকেন । কমসে কম নাটোর পার হলেও কিছু টাকা পয়সা চেয়ে নেওয়া যাবে । বাড়ির কাছে মরলে চা বিড়ির টাকাও পাবো না । ওস্তাদ বললেন হারামজাদা রুগির অবস্থা কি তাই দেখ ।

আমি বললাম, রুগিকে দেখে মনে হচ্ছে না এই জিনিস রাজশাহী পর্যন্ত টিকবে । যদি টেকেও তবু মন বলছে বাঁচবে না ।

ওস্তাদ চোখ গরম করে তাকালেন । আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে বললাম, ঠাণ্ডা মাথায় টানতে থাকেন । বনপাড়া পার হন আগে ।

গাড়ি বনপাড়ার এঁবড়ো থেঁবড়ো রাস্তা দিয়ে ঝাঁকি খেয়ে খেয়ে চলছে । আমি জানালা দিয়ে আরেকবার রুগির দিকে তাকালাম । রুগির স্বামীর অবস্থা রুগির থেকেও খারাপ । সম্ভবত চরম ভয় পেয়েছেন । দেখে মনে হচ্ছে তারো নিঃশ্বাস আটকে আসছে । গাড়িতে এক্সট্রা অক্সিজেন মাক্স থাকলে তাকে একটা দিতাম । স্বামী বেচারা খুব ভীত। মনে হচ্ছে এই যাত্রায় বৌ বেঁচে গেলে বৌ তাকে গলায় দঁড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে মারবে ।

যা হোক গাড়ি নাটোরের জ্যাম পার করে দ্রুত যাচ্ছে । আমি জানালা দিয়ে নিজের অর্ধেক বের করে ঐ রিকশা সর, ঐ ট্যাম্পু সর, করছি । রাত দশটা পার হয়ে গেছে । আমার প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে । গাড়ি থামানোর সময় নাই । মাঝেমধ্যে সিগারেট ধরিয়ে ওস্তাদের হাতে দিচ্ছি । তিনি দ্রুত গতিতে গাড়ি টানছেন । আমরা যখন রাজশাহী স্টেশনের সামনে রাত তখন ঠিক বারোটা । বারোটার সময় রুগির ও বারোটা বেজে গেলো । জানালা খুলে দেখলাম রুগির মা বোন লাশের গলা ধরে কাঁদছেন । ওস্তাদ রাস্তার পাশে গাড়ি সাইড করে দ্রুত রুগির কাছে গেলেন । হাত ধরে পাল্স দেখে বললেন মইরা গেছে । তিনি রুগির মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন হাসপাতালে মৃত লাশ নিয়ে গেলে ঝামেলা আর খরচ বেশি হবে । তার থেকে বাড়ি নিয়ে যান । এমনিতেই পুলিশ কেস ।

ওস্তাদ গাড়ি ঘুড়িয়ে স্টিয়ারিং আমার হাতে দিয়ে বললেন তুই ধীরে ধীরে চালা । আমার শরীর টা ভালো লাগছে না । আমি ওস্তাদের গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম হালকা জ্বর আছে । আমি গাড়ি টানছি । প্রায় ফাঁকা রাস্তা । মাঝে মধ্যে ঢাকা গামি ট্রাক গুলো ধেয়ে যাচ্ছে । রাত যখন সাড়ে বারোটার মত তখন হঠাৎ গাড়ির বাম পাশের টায়ার পাঞ্ছার হয়ে গেলো । গাড়ি থামিয়ে গাড়িতে থাকা এক্সট্রা চাকা লাগালাম দুই জন । ওস্তাদ কে দেখে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মনে হলো ।

এম্বুলেম্সের ভেতর কান্না চলছেই । ওস্তাদ বললেন আমি নাটোর পর্যন্ত চালায় তুই রেস্ট নে । আমি ওস্তাদের পাশের সিটে বসে আছি । ঝিমুচ্ছি একটু একটু । নাটোরে ঢুকতেই হঠাৎ আবার গাড়ির পেছনের ডান চাকা পাঞ্ছার হয়ে গেলো । গাড়িতে আর চাকা নাই । গাড়ি থামিয়ে ওস্তাদ কে গাড়িতে বসিয়ে রিকশায় দুইটা চাকা নিয়ে গেলাম লিক ঠিক করতে । রাতে পাঞ্ছার ঠিক করার অভিজ্ঞতা খুব কম । সব দোকানপাট বন্ধ । সব পাই পাঞ্ছার ঠিক করার জায়গা পাই না । শেষে এক অটো-রিকশার গ্যারেজে এক ঘন্টা ধরে দুইটা চাকা ঠিক করিয়ে রিকশায় উঠলাম । চাকা লাগিয়ে দেখলাম রাত দুইটা পার । ওস্তাদ আল্লাহ আল্লাহ বলে গাড়িতে টান দিলেন ।

গাড়ি দশ মিনিট চলার পর হঠাৎ চরম শব্দ করে ঝাঁকি দিয়ে থেমে গেলো । নেমে দেখলাম আবার একটা চাকা পাঞ্ছার হয়েছে । ওস্তাদের চোখ মুখ শুকিয়ে গেলো । তিনি দোয়া ইউনূস পড়তে পড়তে বাঁকি আরেকটা চাকা লাগাতে লাগলেন । যে চাকাটা ফেঁটেছে সেইটা টায়ার সহ ফেঁটে গেছে । মানে পুরো চাকাই বাতিল । এখন একটা চাকাই ভরসা । আমরা আবার গাড়িতে উঠলামা । ওস্তাদ খুব সাবধানে এবং প্রায় একশো বিশ কিলোমিটার স্প্রিডে গাড়ি চালাচ্ছেন । এত জোরে গাড়ি যাচ্ছে তবু মনে হচ্ছে গাড়ি নড়ছে না । ওস্তাদ বললেন অবস্থা তো খুব খারাপ দেখছি রে আকাশ । দোয়া কালাম পড়তে থাক । আমি সূরা ফাতেহা আর সূরা এখলাস ছাড়া আর কোন দোয়া মনে করতে পারছি না । ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে ঐ দুইটা দোয়াই পড়ছি ।

আকাশে মেঘ । চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে । হঠাৎ মুলাডুলি পার হওয়ার পরে অটোমেটিক গাড়ি ডানে বায়ে দুলতে লাগলো । ওস্তাদ বললেন এমন হচ্ছে কেন ? আমি বললাম চাকা পাঞ্ছার হয় নাই তবে দুলছে কেন ?

ওস্তাদ গাড়ির স্প্রিড প্রায় চল্লিশে নিয়ে এলেন কিন্তু গাড়ি দোলানো কমলো না । ধীরে ধীরে দুলুনি বাড়ছেই । আমি আমার মাথার কাছের নেটের জানালা খুলে দেখলাম ভেতরে কি হচ্ছে । জানালা খুলে দেখলাম লাশের সাথের সবাই বড় বড় করে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে আছেন । কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করতেই লাশের বোন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আপার নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে । ওস্তাদ রাস্তার পাশে গাড়ি থামালেন । তারপর পেছনে গিয়ে সবাই কে নামতে বললেন । সবাই নামার পরেও দেখলাম গাড়ি একলাই দুলছে । দুলছে বললে ভুল হয় । বলতে হয় ঝাঁকাচ্ছে । উঁকি দিয়ে দেখলাম সত্য সত্যই লাশের নাক মুখ দিয়ে হু হু করে ধোঁয়া বের হচ্ছে ।

আমরা সবাই রাস্তার ওপর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি । ঐপাড়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি গাড়ি খুব চাকার উপর বাউন্স করছে । মনে হচ্ছে পুরো গাড়িকে দশ জন মানুষ ধরে ঝাকাচ্ছে। এই সব দেখে আমি সূরা ফাতেহা, সূরা এখলাস ভুলে গেছি। শুধু লা ইলাহা ইলাল্লা পড়ছি ।

আকাশে মেঘ ছিল কিন্তু বাতাস ছিল না । হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস শুরু হলো । আশপাশে যাওয়ার কোন জায়গা নেই তাই আমরা গাড়ি থেকে একটু দূরে রাস্তার পাশে একটা ছোট গাছের নিচে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বসে আছি । একটু পর পর ওস্তাদ হাতের টর্চ লাইট গাড়িতে মারছেন আর দোয়া কালাম পড়ছেন । আমি জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে ওস্তাদ ? তিনি বললেন গাড়ি পেছন সাইড রাস্তা থেকে দুই তিন হাত উপরে উঠে আছে ।

ছেঁড়া পাতা আর ধুলোয় চারদিক অন্ধকার । আমি পরণের গেঞ্জি উঁচু করে নাক মুখ ঢেকে আছি । এমন সময় দূরে মসজিদ থেকে আজানের আওয়াজ পেলাম । আযান শেষ হওয়ার আগেই বাতাস থেমে গেলো একদম । আযান যেন ম্যাজিকের মত কাজ করলো । আমরা ভয় ডর ভুলে আস্তে আস্তে সবাই আবার গাড়িতে উঠলাম । লাশের স্বামী পেছনে বসতে ভয় পাচ্ছেন । তাকে সামনে আমার পাশে বসালাম । ওস্তাদ দোয়া দরুদ পড়ে এক্সিলেটরে চাপ দিলেন । আমরা যখন দাশুড়িয়া মোড়ে পৌছালাম তখন চারপাশ ফর্সা হয়ে গেছে । লাশ সোজা লাশের মায়ের বাড়ি নিতে হবে । তার আগে আমাদের কিছু খেতে হবে । গতকাল থেকে সবাই না খাওয়া । দাশুড়িয়া মোড়ে গাড়ি থামিয়ে সবাই একটা হোটেল থেকে নাস্তা করলাম । লাশের মা মেয়ের জামাই কে বললেন বাবা তুমি কোন কোন কিছু নিয়ে ভয় পেও না । আমি জানতাম আমার মেয়ের আচার ব্যবহার কেমন । তুমি আগেও আমাদের জামাই ছিলে এখনও আছো । আমি মনে মনে বললাম, বড় জামাইয়ের সাথে কি ছোট শ্যালিকার রাস্তা তবে ক্লিয়ার হয়ে গেলো?

সকাল সাতটার সময় লাশ লাশের বাপের বাড়িতে নামিয়ে দিলাম । এলাকার মানুষ ছিঃ ছিঃ করতে করতে এগিয়ে এলো । মনে হলো বেঁচে থাকতে ঐ মহিলা এলাকার সবাইকেই জ্বালিয়ে খেয়েছেন । আমরা লাশ নামিয়ে দিয়ে সোজা গাড়ি টান দিয়ে এসে হাসপাতালের গ্যারেজে ঢুকিয়ে বাড়ি চলে এলাম । টানা চার দিন জ্বর কাটালাম তারপর ।

তারপর আমি আর কোনদিন এম্বোলেম্সে উঠি নাই । ড্রাইভিং পুরোই ছেড়ে দিলাম । অনেক দিন পর ওস্তাদের সঙ্গে দেখা হলো । তিনি বললেন ঐ দিনেই তিনি চাকরি ছেড়েছেন । জীবণে যত তেল মবিল চুরি করেছেন তার জন্য তওবা করে এখন একটা দোকান দিয়ে বসেছেন । দিন চলে গেছে কিন্তু বিশ্বাস করুন সেই রাতের ভয় এখনও আমাদের চোখে আছে । আমি এখনও ভুলতে পারি নাই । জানি উস্তাদ ও ভুলবে না । কখনও ভুলতেও পারবে না ।।


Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen