এক ডাক্তার জ্বীনের বাস্তব ঘটনাঃ ৫ম পর্ব

মাহদীর মা জামার হাতা উচিঁয়ে ধরলে সেটা দেখে সাধারণ যে কেউ হতভম্ভ হয়ে যাবে। তার হাত পুরোটাই স্বচ্ছ। সেই হাতের মধ্যে দিয়ে তার শিরা-উপশিরা, রক্ত, হাঁড় সবকিছু দেখা যাচ্ছে। রক্ত চলাচল। রক্ত পুরোপুরি লাল না। উপশিরার গঠন একটু ভিন্ন। সেখানে রক্ত নাকি পানি বোঝা গেলনা। নাহ, আমি রূপকথার গল্প ফাদঁছি না। যা দেখেছি যেভাবে দেখেছি সেভাবেই বলছি। মূহুর্তটা ছিল খুব বেশি অনাকাঙ্খিত। বাসায় আসার সময় আমার বাসার সকলের জন্য ওরা মিষ্টি দিয়ে দেয়। ওর মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি। আমি আর মাহদী। মাহদীকে জিজ্ঞেস করি, তাহলে আমাদের সম্পর্কের কোনোই ভবিষ্যত নেই তাইতো?

মাহদী চুপ করে থাকে। এই মৌনতা সম্মতির লক্ষণ নয়। এই মৌনতা হল আমাদের সম্পর্কের অনিশ্চয়তা! আমি মনে মনে আবারো ভেঙে পড়তে থাকি! আর ভাবি, সৃষ্টিকর্তা যা করেন, তা হয়তো ভালোর জন্যই করেন। সব ভালোবাসায় মিলন থাকতেই হবে এমন কোনো কথা নেই – এইটা ভেবে নিজেকে শান্ত করছিলাম। বাসার কাছে চলে আসি। ও চলে যায়। আমি বাসায় ঢুকে বাসার সবাইকে ডাকি। বলি তোমাদের জন্য একটা স্পেশাল মিষ্টি এনেছি। মা আর ভাইয়া জিজ্ঞেস করে, কোথা থেকে? আমি দুষ্টুমির স্বরে বলি, উহু, সে তো বলা যাবেনা! তোমরা খেয়ে দেখ কেমন লাগে। এত বড় বড় মিষ্টি দেখে আমার মা আর ভাইয়ার চোখ কপালে ওঠে। বাবা আর ছোট ভাই তখনো বাইরে। আমার মা খেয়ে একরকম চিৎকার করেই বলে ওঠে যে মিথিলা তুই এটা কোথায় পেলি? এত স্বাদ জীবনে আর কিছুতে পাইনি। আর ওদিকে ভাই আমার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে থাকে! যেন আমি মহাপাপ কিছু করে ফেলেছি। কলেজ তখনো বন্ধ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ! পড়াশুনাও খুব একটা হচ্ছেনা। আবার এদিকে আমার মানসিক অস্থিরতা! সব মিলিয়ে যখন একটা এলোমেলো অবস্থা, তখন একদিন মাহদী বলে, সে আমার জন্য প্রয়োজনে তার সমাজ ছাড়বে। প্রয়োজনে মানুষ হয়েই থাকবে! ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবে। ওর ভাই ওকে নাকি বলেছে আমার সাথে থেকে যাবার জন্য। আমি ওকে জিজ্ঞেস করি, তোমার আমার সাথে মানুষরূপে থাকতে তো কোনো সমস্যা নেই? ও বলে, আমার বা আমাদের জাতিগত সমস্যার ব্যাপারটা মা আর ভাই মিলে সামাল দেবে। কিন্তু তুমিই বল, তোমার মাতৃত্বের স্বাদ থেকে কি তুমি বঞ্চিত হতে চাও? আমার আসলে কোনোকিছুই চিন্তার ছিল না। আমি শুধু মাহদীকে জীবনে চাই, সে জ্বীন নাকি মানুষ সেটাও আমার দেখার ব্যাপার না। তাই ওকে আমি স্পষ্ট করে বলে দিই যে, যেকোন মূল্যে আমি তোমাকেই চাই। শুধু তোমাকে। মাহদী শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জানিনা, সেটার মানে কি! এর ঠিক কিছুদিন পরেই মাহদী যখন জানে যে আমার বাসাতে বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে এবং আমার মা-বাবা চান যে মাহদীর সাথেই বিয়ে হোক, ও বলে শুধুমাত্র আমার জন্যেই নিজের জাতি সমাজ ছেড়ে চলে আসতে চায়। মাহদীকে জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা, সেদিন না তোমার মা বললেন যে মানুষ আর জ্বীনের বিয়ে সম্ভব না? ও বলে, বিয়ে সম্ভব না এটা মা বলেনি। বিয়ে সম্ভব কিন্তু সেক্ষেত্রে আমাকে মানুষ রূপেই থাকতে হবে! আমার কাছে ব্যাপারটা তখনো ঠিক পরিষ্কার হয়না। ওকে আবার বলি, তোমার মা তো এটাও বলেছেন যে, আমাদের মধ্যে নাকি সৃষ্টিকর্তা দেয়াল তুলে রেখেছেন? তাহলে, কি তোমার আর তোমার মায়ের কথার মধ্যে অমিল থেকে যাচ্ছেনা? নাকি তুমি আমাকে শান্তনা-বানী শোনাতে এসেছো? শোনো মাহদী, আমি হয়তো যেকোন মূল্যে তোমাকে চাই, কিন্তু আমাকে কোনো মিথ্যে আশা না দিলেই আমি খুশি হবো। যা সম্ভব নয়, তা অসম্ভব করতে এসোনা - কিভাবে যেন এক নাগাড়ে এসব কথা ওকে বলে ফেলি। নিজেকে অনেক হালকা মনে হতে থাকে! আমি ওকে আরো বলি, আমার বিয়ে, আমার জীবন নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, আমরা বন্ধু হয়েই থাকবো নাহয়! তুমি এখানে যে উদ্দেশ্যে এসেছো সেই উদ্দেশ্য পুরণ করে চলে যাও। মিথিলার ঘটনা বলার ঠিক এই পর্যায়ে এসে ওকে থামাই আমি। রাত তখন বেশ হয়েছে। আমরা আর সেই কফি শপে বসে নেই। ঘটনা শুনতে শুনতে বেশ খানিকটা হেটেঁছি এদিকে সেদিকে। এরপরে মিথিলাকে বলি, চলুন বাসাতে যেতে যেতে গাড়িতে আরো কথা হবে! কথার পিঠে কথা আসার কারণে আমাদের ডিনারটাও করা হয়ে ওঠেনি। বাসায় ফোন দিই। বোনকে জিজ্ঞেস করি কিছু রান্না করেছে কিনা! ও বলে অনেক কিছুই রান্না করেছে। তাই দেরী না করেই গাড়িতে উঠে পরি। জিজ্ঞেস করি, ড্রাইভিং পারেন কিনা আর লাইসেন্স আছে কিনা! মিথিলা বলে যে ড্রাইভিং পারে কিন্তু লাইসেন্স নেই। মিথিলা তার কথার সাথে এটাও যোগ করে যে, মিথিলা নাকি মাহদীকে ড্রাইভিং শিখিয়েছে। আমি শুনে হাসতে থাকি! যাইহোক, আমি ওকে থামাই আমার মনে বেশ কয়েকটা প্রশ্ন জাগে এই কারণে! এই এতক্ষণ পর এসে আমি ওকে আমার একটা আইডি কার্ড দেখাই। যেটা একটা ইউরোপিয়ান সিক্রেট সংস্থার। যার মূল অফিস ইতালিতে। আমরা ইউরোপের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি আমাদের নিজেদের মত করে। ভেতরে ভেতরে সবাই সবার সাথে যোগাযোগ রাখি। ইউরোপিয়ান প্যারানরমাল এক্টিভিটি সোসাইটির সদস্য আমি। তো এটা দেখিয়ে উনাকে বলি, আসলে বহুদিন ধরেই আমি এসবের সাথে জড়িত। জ্বীনদের ব্যাপারে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছি, মানুষের জীবনে ঘটা অভিজ্ঞতা থেকে, কোরান-হাদীস ও অন্যান্য বই থেকে। আমার মনের প্রথম প্রশ্নটা হচ্ছে, জ্বীন আর মানুষের বিয়ে নিয়ে! মিথিলা বলে, দেখুন, আমরা সবাই কিন্তু দিন-শেষে শুনে বিশ্বাসী। এই এর কাছ থেকে ওর কাছ থেকে। এই যে আপনি যেমন আমার কাছ থেকে শুনছেন। আপনি কিন্তু জানেন না যে আমি আসলেই সত্যি বলছি নাকি মিথ্যা বানিয়ে বলছি। তবে আমি অবশ্যই ঘন্টার পর ঘন্টা নষ্ট করে আপনার সাথে ফাউ আলাপ করবো না, তাইনা? মিথ্যে বলে দিনশেষে আমার লাভ নেই। আপনি বলেছেন যে, আপনি কোরান-হাদীস থেকেও জ্ঞান নিয়েছেন, কিন্তু সেখানে কিন্তু স্পষ্ট করে বলে দেয়া নেই যে মানুষ আর জ্বীনের বিয়ে সম্ভব। আবার এমন অনেক কিছুই বলা নেই যা জ্বীন জাতিতে বিদ্যমান। কারণ, এত ব্যাখ্যার আসলে প্রয়োজন পরে না। যখন আপনি আপনার দৈনন্দিন জীবনে কেবল এগুলোর মুখোমুখি হবেন, তখনই বুঝবেন এবং জানবেন। মানুষ আসলে বলে বেড়ায় যে সে এটা শুনেছে জ্বীনের ব্যাপারে, জ্বীনের সাথে তার অমুকের বিয়ে হয়েছে, হ্যান হয়েছে, ত্যান হয়েছে, বাচ্চা হয়েছে! জ্বী নাহ! এসব মানুষের মিথ্যাচারিতা ছাড়া কিছুই না। আমি নিজে জ্বীনের সাথে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে বেড়াচ্ছি, অবশ্যই তারা আমার সাথে মিথ্যে কথা বলবেনা! জ্বীন-মানুষের বিয়ে হয়না! বাচ্চা হয়না! হলে আজ আমাকে আপনার সাথে হয়তো ঘুরে বেড়াতে হতো না! আমি মাহদীর সাথে থাকতে পারতাম! একই গাড়িতে, একই রাস্তায়! এক ছাদের নিচে। মিথিলার অনেক জোরালো কন্ঠে আবেগ নেমে আসে। আমি সাথে সাথে কথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করি, আপনার এই জীবনের ঘটনা কি আমি মানুষের কাছে শেয়ার করতে পারি? উনি বলেন যে, হ্যাঁ পারেন! বলি, নামধাম এসব কি পালটে দিতে হবে? বলেন, নাহ, ওসবের দরকার নেই। আমি এমন আহামরি কেউ না যে, আমার নাম জানলে সবাই আমাকে চিনে ফেলবে, ইন-ফ্যাক্ট কেউই আমাকে চিনে না! তো আর কোনো প্রশ্ন ফেরদৌস? আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করি, জ্বীনদের সাপের রূপধারণ করা নিয়ে মাহদী কখনো কিছু বলেছেন কিনা? মিথিলা বলে, নাহ! তেমন কিছুই বলেনি। ওরা যে জাতির সে জাতিতে নাকি ওরা এমনভাবে নিজেদের প্রকাশ করে না বা প্রয়োজন পরে না। আবার জিজ্ঞেস করি, আর ঐ যে বললেন উনি নাকি আপনার কাছ থেকে ড্রাইভিং শিখেছেন? ব্যাপারটা কেমন? মিথিলা হাসতে হাসতে বলে, এটা কি কোনো প্রশ্ন হলো? আমি বলি, আসলে আমি যতদূর জানি যে জ্বীনেরা অনেক বেশি ট্যালেন্টেড! তারা যে কোনো কিছুকে খুব সহজে আয়ত্বে নিয়ে আসে, তো ড্রাইভিংটাও কি আসলে শেখার দরকার হয়? পাঠক ও মিথিলার প্রতি আমার খোলা চিঠিঃ আমি আসলে সব জেনে বুঝেই এসব প্রশ্ন করছিলাম শুধুমাত্র মিথিলাকে বাজিয়ে দেখার জন্য। মিথিলা আপনি যদি আমার এই গল্প পড়ে থাকেন, তবে আমাকে ভুল বুঝবেন না। সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে চেয়েছিলাম আসলে। যদিও আমি জানিনা এই মূহুর্তে আপনি ঠিক কোথায় আছেন, কেমন আছেন! আপনি সব সময় ভালো থাকবেন! মিথিলা আমার প্রশ্নের জবাব দেন, দেখেন ফেরদৌস আমি জানিনা আপনি এতদিন কি রিসার্চ করেছেন। সত্যিটা হলো, জ্বীনেরা ট্যালেন্টেড ঠিক আছে। কিন্তু তারাও দিনশেষে ঠিক আমাদের মতই। তারাও খায়, তারাও পড়ে। আসলে প্রযুক্তিগত দিক থেকে তারা আমাদের চাইতে অনেক পিছিয়ে, আমাদের প্রযুক্তিটাকে তারা ব্যবহার করছে। তারা ঠিকই মুখ দিয়ে ফ্রিকোয়েন্সি তৈরী করে কিন্তু এটা জানেনা কিভাবে তার প্রয়োগে মোবাইল নেটওয়ার্কিং সিস্টেম তৈরী করা যায়। তারা এখনো ধর্মীয় গোড়ামির কারণে পিছিয়ে, তারা এখনো এতটাই মারামারিতে লিপ্ত যে তাদের মধ্যে ডাক্তার হবার ধুম পড়েছে। জ্বীনদের এসব নাশকতার কারণেই সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে সৃষ্টির কথা চিন্তা করেন। সেটা সবার জানা। কিছু মানুষের যেমন কোনো কিছু একবার পড়লেই মুখস্থ হয়ে যায়, এমন অনেক জ্বীন আছে যারা একবার দেখলেই মুখস্থ করে ফেলে। তারা আলোর গতিতে চলে তার মানে তো এই না যে তারা আরেকটা পৃথিবীর সন্ধান দিয়ে ফেলেছে। তার মানে এই না যে তারা ইচ্ছা করলেই সব করতে পারছে। তারা ইচ্ছা করলেই যে মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে, তাও তো না। তাহলে তো, জ্বীনে আলোর গতিতে মহাবিশ্বের এদিকে সেদিকে গিয়ে নানা তথ্য নিয়ে এসে নাসাকে দিতে পারতো, নাসার এত বিজ্ঞানীর দরকার হতো না। মাহদীর যেমন ড্রাইভিং শিখতে এক সপ্তাহ লেগেছিল। আমি তখন উনাকে আরেকটু খোঁচা দিয়ে প্রশ্ন করি, তো মাহদী কেন জ্বীন হয়েও আপনার কাছে নিজেকে ধরা দিলেন? তার কি প্রয়োজন ছিল? সে তো জানতো যে মানুষ আর জ্বীনের বিয়ে সম্ভব না, তাহলে কি প্রয়োজন ছিল আপনাকে জেনে শুনে বিষ পান করানোর? কেনই বা সে আর তা মা নিজেদেরকে আপনার কাছে প্রকাশ করলেন? এই ব্যাপার গুলো আমার কাছে ঠিক পরিষ্কার না! মিথিলা বলেন, দেখেন এই প্রশ্নগুলো আমার মাথাতেও ঘুরপাক খেত। তবে সেটা নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত। আমি এখনো ঘটনার সেদিকে আসিনি। তবে প্রথম দিকে আমি যখন মাহদীকে এসব প্রশ্ন করতাম, ও চুপ করে থাকতো, কিছুই বলতো না! আমি উনাকে জিজ্ঞেস করি, আপনি কি মনে করেন যে জ্বীনেরা মিথ্যে বলতে পারে? মিথিলা বলেন, হ্যাঁ, জ্বীনেরা মানুষের চাইতে বেশী মিথ্যে কথা বলে। আমি একটু উনার দিকে তাকাই। এই জবাব টা দেবার সময় উনার কন্ঠে অনেক জোর ছিল। আমি বুঝলাম, ঘটনার গভীরতা আসলে অনেক অনেক বেশি। আমার কথা কেড়ে নিয়ে মিথিলা আবার শুরু করেন, আমাকে উনি পালটা প্রশ্ন করেন, কখনো জ্বীন দেখেছেন নিজের চোখে? বলি, হয়তোবা। ভিন্ন ভাবে। একটু মজা করে বলি, আমি যে জ্বীন না, তার কি নিশ্চয়তা? মিথিলা বলেন, আপনি জ্বীন না। আমি জিজ্ঞেস করি মিথিলাকে, কিভাবে নিশ্চিত হলেন যে আমি জ্বীন না? সে বলে, প্রথম যখন আপনার বাসায় উঠি, হ্যাঁ, আমার একটা অনুভূতি হয়েছিল যে আপনি মানুষ না। সেদিন রাতে অনেকবার মনে হয়েছিল যে আপনি মাহদী। মাহদী আপনার রূপ নিয়ে মানে এমন রূপ ধরে এসেছে আমাকে সাহায্য করার জন্য। নিশ্চিত হয়ে গিয়েছি এতক্ষণে! আপনি মানুষ। আমি হাসতে হাসতে বলি, তাই নাকি? কিন্তু কিভাবে? আমাকে কি বলা যাবেনা? ডাক্তার জ্বীনের বাস্তব ঘটনা #পর্ব_৫ ঘটনার লেখক:Ferdous Sagar Zfs

মাহদীর মা জামার হাতা উচিঁয়ে ধরলে সেটা দেখে সাধারণ যে কেউ হতভম্ভ হয়ে যাবে। তার হাত পুরোটাই স্বচ্ছ। সেই হাতের মধ্যে দিয়ে তার শিরা-উপশিরা, রক্ত, হাঁড় সবকিছু দেখা যাচ্ছে। রক্ত চলাচল। রক্ত পুরোপুরি লাল না। উপশিরার গঠন একটু ভিন্ন। সেখানে রক্ত নাকি পানি বোঝা গেলনা। নাহ, আমি রূপকথার গল্প ফাদঁছি না। যা দেখেছি যেভাবে দেখেছি সেভাবেই বলছি। মূহুর্তটা ছিল খুব বেশি অনাকাঙ্খিত। বাসায় আসার সময় আমার বাসার সকলের জন্য ওরা মিষ্টি দিয়ে দেয়। ওর মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি। আমি আর মাহদী। মাহদীকে জিজ্ঞেস করি, তাহলে আমাদের সম্পর্কের কোনোই ভবিষ্যত নেই তাইতো? মাহদী চুপ করে থাকে। এই মৌনতা সম্মতির লক্ষণ নয়। এই মৌনতা হল আমাদের সম্পর্কের অনিশ্চয়তা! আমি মনে মনে আবারো ভেঙে পড়তে থাকি! আর ভাবি, সৃষ্টিকর্তা যা করেন, তা হয়তো ভালোর জন্যই করেন। সব ভালোবাসায় মিলন থাকতেই হবে এমন কোনো কথা নেই – এইটা ভেবে নিজেকে শান্ত করছিলাম। বাসার কাছে চলে আসি। ও চলে যায়। আমি বাসায় ঢুকে বাসার সবাইকে ডাকি। বলি তোমাদের জন্য একটা স্পেশাল মিষ্টি এনেছি। মা আর ভাইয়া জিজ্ঞেস করে, কোথা থেকে? আমি দুষ্টুমির স্বরে বলি, উহু, সে তো বলা যাবেনা! তোমরা খেয়ে দেখ কেমন লাগে। এত বড় বড় মিষ্টি দেখে আমার মা আর ভাইয়ার চোখ কপালে ওঠে। বাবা আর ছোট ভাই তখনো বাইরে। আমার মা খেয়ে একরকম চিৎকার করেই বলে ওঠে যে মিথিলা তুই এটা কোথায় পেলি? এত স্বাদ জীবনে আর কিছুতে পাইনি। আর ওদিকে ভাই আমার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে থাকে! যেন আমি মহাপাপ কিছু করে ফেলেছি। কলেজ তখনো বন্ধ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ! পড়াশুনাও খুব একটা হচ্ছেনা। আবার এদিকে আমার মানসিক অস্থিরতা! সব মিলিয়ে যখন একটা এলোমেলো অবস্থা, তখন একদিন মাহদী বলে, সে আমার জন্য প্রয়োজনে তার সমাজ ছাড়বে। প্রয়োজনে মানুষ হয়েই থাকবে! ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবে। ওর ভাই ওকে নাকি বলেছে আমার সাথে থেকে যাবার জন্য। আমি ওকে জিজ্ঞেস করি, তোমার আমার সাথে মানুষরূপে থাকতে তো কোনো সমস্যা নেই? ও বলে, আমার বা আমাদের জাতিগত সমস্যার ব্যাপারটা মা আর ভাই মিলে সামাল দেবে। কিন্তু তুমিই বল, তোমার মাতৃত্বের স্বাদ থেকে কি তুমি বঞ্চিত হতে চাও? আমার আসলে কোনোকিছুই চিন্তার ছিল না। আমি শুধু মাহদীকে জীবনে চাই, সে জ্বীন নাকি মানুষ সেটাও আমার দেখার ব্যাপার না। তাই ওকে আমি স্পষ্ট করে বলে দিই যে, যেকোন মূল্যে আমি তোমাকেই চাই। শুধু তোমাকে। মাহদী শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জানিনা, সেটার মানে কি! এর ঠিক কিছুদিন পরেই মাহদী যখন জানে যে আমার বাসাতে বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে এবং আমার মা-বাবা চান যে মাহদীর সাথেই বিয়ে হোক, ও বলে শুধুমাত্র আমার জন্যেই নিজের জাতি সমাজ ছেড়ে চলে আসতে চায়। মাহদীকে জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা, সেদিন না তোমার মা বললেন যে মানুষ আর জ্বীনের বিয়ে সম্ভব না? ও বলে, বিয়ে সম্ভব না এটা মা বলেনি। বিয়ে সম্ভব কিন্তু সেক্ষেত্রে আমাকে মানুষ রূপেই থাকতে হবে! আমার কাছে ব্যাপারটা তখনো ঠিক পরিষ্কার হয়না। ওকে আবার বলি, তোমার মা তো এটাও বলেছেন যে, আমাদের মধ্যে নাকি সৃষ্টিকর্তা দেয়াল তুলে রেখেছেন? তাহলে, কি তোমার আর তোমার মায়ের কথার মধ্যে অমিল থেকে যাচ্ছেনা? নাকি তুমি আমাকে শান্তনা-বানী শোনাতে এসেছো? শোনো মাহদী, আমি হয়তো যেকোন মূল্যে তোমাকে চাই, কিন্তু আমাকে কোনো মিথ্যে আশা না দিলেই আমি খুশি হবো। যা সম্ভব নয়, তা অসম্ভব করতে এসোনা - কিভাবে যেন এক নাগাড়ে এসব কথা ওকে বলে ফেলি। নিজেকে অনেক হালকা মনে হতে থাকে! আমি ওকে আরো বলি, আমার বিয়ে, আমার জীবন নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, আমরা বন্ধু হয়েই থাকবো নাহয়! তুমি এখানে যে উদ্দেশ্যে এসেছো সেই উদ্দেশ্য পুরণ করে চলে যাও। মিথিলার ঘটনা বলার ঠিক এই পর্যায়ে এসে ওকে থামাই আমি। রাত তখন বেশ হয়েছে। আমরা আর সেই কফি শপে বসে নেই। ঘটনা শুনতে শুনতে বেশ খানিকটা হেটেঁছি এদিকে সেদিকে। এরপরে মিথিলাকে বলি, চলুন বাসাতে যেতে যেতে গাড়িতে আরো কথা হবে! কথার পিঠে কথা আসার কারণে আমাদের ডিনারটাও করা হয়ে ওঠেনি। বাসায় ফোন দিই। বোনকে জিজ্ঞেস করি কিছু রান্না করেছে কিনা! ও বলে অনেক কিছুই রান্না করেছে। তাই দেরী না করেই গাড়িতে উঠে পরি। জিজ্ঞেস করি, ড্রাইভিং পারেন কিনা আর লাইসেন্স আছে কিনা! মিথিলা বলে যে ড্রাইভিং পারে কিন্তু লাইসেন্স নেই। মিথিলা তার কথার সাথে এটাও যোগ করে যে, মিথিলা নাকি মাহদীকে ড্রাইভিং শিখিয়েছে। আমি শুনে হাসতে থাকি! যাইহোক, আমি ওকে থামাই আমার মনে বেশ কয়েকটা প্রশ্ন জাগে এই কারণে! এই এতক্ষণ পর এসে আমি ওকে আমার একটা আইডি কার্ড দেখাই। যেটা একটা ইউরোপিয়ান সিক্রেট সংস্থার। যার মূল অফিস ইতালিতে। আমরা ইউরোপের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি আমাদের নিজেদের মত করে। ভেতরে ভেতরে সবাই সবার সাথে যোগাযোগ রাখি। ইউরোপিয়ান প্যারানরমাল এক্টিভিটি সোসাইটির সদস্য আমি। তো এটা দেখিয়ে উনাকে বলি, আসলে বহুদিন ধরেই আমি এসবের সাথে জড়িত। জ্বীনদের ব্যাপারে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছি, মানুষের জীবনে ঘটা অভিজ্ঞতা থেকে, কোরান-হাদীস ও অন্যান্য বই থেকে। আমার মনের প্রথম প্রশ্নটা হচ্ছে, জ্বীন আর মানুষের বিয়ে নিয়ে! মিথিলা বলে, দেখুন, আমরা সবাই কিন্তু দিন-শেষে শুনে বিশ্বাসী। এই এর কাছ থেকে ওর কাছ থেকে। এই যে আপনি যেমন আমার কাছ থেকে শুনছেন। আপনি কিন্তু জানেন না যে আমি আসলেই সত্যি বলছি নাকি মিথ্যা বানিয়ে বলছি। তবে আমি অবশ্যই ঘন্টার পর ঘন্টা নষ্ট করে আপনার সাথে ফাউ আলাপ করবো না, তাইনা? মিথ্যে বলে দিনশেষে আমার লাভ নেই। আপনি বলেছেন যে, আপনি কোরান-হাদীস থেকেও জ্ঞান নিয়েছেন, কিন্তু সেখানে কিন্তু স্পষ্ট করে বলে দেয়া নেই যে মানুষ আর জ্বীনের বিয়ে সম্ভব। আবার এমন অনেক কিছুই বলা নেই যা জ্বীন জাতিতে বিদ্যমান। কারণ, এত ব্যাখ্যার আসলে প্রয়োজন পরে না। যখন আপনি আপনার দৈনন্দিন জীবনে কেবল এগুলোর মুখোমুখি হবেন, তখনই বুঝবেন এবং জানবেন। মানুষ আসলে বলে বেড়ায় যে সে এটা শুনেছে জ্বীনের ব্যাপারে, জ্বীনের সাথে তার অমুকের বিয়ে হয়েছে, হ্যান হয়েছে, ত্যান হয়েছে, বাচ্চা হয়েছে! জ্বী নাহ! এসব মানুষের মিথ্যাচারিতা ছাড়া কিছুই না। আমি নিজে জ্বীনের সাথে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে বেড়াচ্ছি, অবশ্যই তারা আমার সাথে মিথ্যে কথা বলবেনা! জ্বীন-মানুষের বিয়ে হয়না! বাচ্চা হয়না! হলে আজ আমাকে আপনার সাথে হয়তো ঘুরে বেড়াতে হতো না! আমি মাহদীর সাথে থাকতে পারতাম! একই গাড়িতে, একই রাস্তায়! এক ছাদের নিচে। মিথিলার অনেক জোরালো কন্ঠে আবেগ নেমে আসে। আমি সাথে সাথে কথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করি, আপনার এই জীবনের ঘটনা কি আমি মানুষের কাছে শেয়ার করতে পারি? উনি বলেন যে, হ্যাঁ পারেন! বলি, নামধাম এসব কি পালটে দিতে হবে? বলেন, নাহ, ওসবের দরকার নেই। আমি এমন আহামরি কেউ না যে, আমার নাম জানলে সবাই আমাকে চিনে ফেলবে, ইন-ফ্যাক্ট কেউই আমাকে চিনে না! তো আর কোনো প্রশ্ন ফেরদৌস? আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করি, জ্বীনদের সাপের রূপধারণ করা নিয়ে মাহদী কখনো কিছু বলেছেন কিনা? মিথিলা বলে, নাহ! তেমন কিছুই বলেনি। ওরা যে জাতির সে জাতিতে নাকি ওরা এমনভাবে নিজেদের প্রকাশ করে না বা প্রয়োজন পরে না। আবার জিজ্ঞেস করি, আর ঐ যে বললেন উনি নাকি আপনার কাছ থেকে ড্রাইভিং শিখেছেন? ব্যাপারটা কেমন? মিথিলা হাসতে হাসতে বলে, এটা কি কোনো প্রশ্ন হলো? আমি বলি, আসলে আমি যতদূর জানি যে জ্বীনেরা অনেক বেশি ট্যালেন্টেড! তারা যে কোনো কিছুকে খুব সহজে আয়ত্বে নিয়ে আসে, তো ড্রাইভিংটাও কি আসলে শেখার দরকার হয়? পাঠক ও মিথিলার প্রতি আমার খোলা চিঠিঃ আমি আসলে সব জেনে বুঝেই এসব প্রশ্ন করছিলাম শুধুমাত্র মিথিলাকে বাজিয়ে দেখার জন্য। মিথিলা আপনি যদি আমার এই গল্প পড়ে থাকেন, তবে আমাকে ভুল বুঝবেন না। সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে চেয়েছিলাম আসলে। যদিও আমি জানিনা এই মূহুর্তে আপনি ঠিক কোথায় আছেন, কেমন আছেন! আপনি সব সময় ভালো থাকবেন! মিথিলা আমার প্রশ্নের জবাব দেন, দেখেন ফেরদৌস আমি জানিনা আপনি এতদিন কি রিসার্চ করেছেন। সত্যিটা হলো, জ্বীনেরা ট্যালেন্টেড ঠিক আছে। কিন্তু তারাও দিনশেষে ঠিক আমাদের মতই। তারাও খায়, তারাও পড়ে। আসলে প্রযুক্তিগত দিক থেকে তারা আমাদের চাইতে অনেক পিছিয়ে, আমাদের প্রযুক্তিটাকে তারা ব্যবহার করছে। তারা ঠিকই মুখ দিয়ে ফ্রিকোয়েন্সি তৈরী করে কিন্তু এটা জানেনা কিভাবে তার প্রয়োগে মোবাইল নেটওয়ার্কিং সিস্টেম তৈরী করা যায়। তারা এখনো ধর্মীয় গোড়ামির কারণে পিছিয়ে, তারা এখনো এতটাই মারামারিতে লিপ্ত যে তাদের মধ্যে ডাক্তার হবার ধুম পড়েছে। জ্বীনদের এসব নাশকতার কারণেই সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে সৃষ্টির কথা চিন্তা করেন। সেটা সবার জানা। কিছু মানুষের যেমন কোনো কিছু একবার পড়লেই মুখস্থ হয়ে যায়, এমন অনেক জ্বীন আছে যারা একবার দেখলেই মুখস্থ করে ফেলে। তারা আলোর গতিতে চলে তার মানে তো এই না যে তারা আরেকটা পৃথিবীর সন্ধান দিয়ে ফেলেছে। তার মানে এই না যে তারা ইচ্ছা করলেই সব করতে পারছে। তারা ইচ্ছা করলেই যে মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে, তাও তো না। তাহলে তো, জ্বীনে আলোর গতিতে মহাবিশ্বের এদিকে সেদিকে গিয়ে নানা তথ্য নিয়ে এসে নাসাকে দিতে পারতো, নাসার এত বিজ্ঞানীর দরকার হতো না। মাহদীর যেমন ড্রাইভিং শিখতে এক সপ্তাহ লেগেছিল। আমি তখন উনাকে আরেকটু খোঁচা দিয়ে প্রশ্ন করি, তো মাহদী কেন জ্বীন হয়েও আপনার কাছে নিজেকে ধরা দিলেন? তার কি প্রয়োজন ছিল? সে তো জানতো যে মানুষ আর জ্বীনের বিয়ে সম্ভব না, তাহলে কি প্রয়োজন ছিল আপনাকে জেনে শুনে বিষ পান করানোর? কেনই বা সে আর তা মা নিজেদেরকে আপনার কাছে প্রকাশ করলেন? এই ব্যাপার গুলো আমার কাছে ঠিক পরিষ্কার না! মিথিলা বলেন, দেখেন এই প্রশ্নগুলো আমার মাথাতেও ঘুরপাক খেত। তবে সেটা নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত। আমি এখনো ঘটনার সেদিকে আসিনি। তবে প্রথম দিকে আমি যখন মাহদীকে এসব প্রশ্ন করতাম, ও চুপ করে থাকতো, কিছুই বলতো না! আমি উনাকে জিজ্ঞেস করি, আপনি কি মনে করেন যে জ্বীনেরা মিথ্যে বলতে পারে? মিথিলা বলেন, হ্যাঁ, জ্বীনেরা মানুষের চাইতে বেশী মিথ্যে কথা বলে। আমি একটু উনার দিকে তাকাই। এই জবাব টা দেবার সময় উনার কন্ঠে অনেক জোর ছিল। আমি বুঝলাম, ঘটনার গভীরতা আসলে অনেক অনেক বেশি। আমার কথা কেড়ে নিয়ে মিথিলা আবার শুরু করেন, আমাকে উনি পালটা প্রশ্ন করেন, কখনো জ্বীন দেখেছেন নিজের চোখে? বলি, হয়তোবা। ভিন্ন ভাবে। একটু মজা করে বলি, আমি যে জ্বীন না, তার কি নিশ্চয়তা? মিথিলা বলেন, আপনি জ্বীন না। আমি জিজ্ঞেস করি মিথিলাকে, কিভাবে নিশ্চিত হলেন যে আমি জ্বীন না? সে বলে, প্রথম যখন আপনার বাসায় উঠি, হ্যাঁ, আমার একটা অনুভূতি হয়েছিল যে আপনি মানুষ না। সেদিন রাতে অনেকবার মনে হয়েছিল যে আপনি মাহদী। মাহদী আপনার রূপ নিয়ে মানে এমন রূপ ধরে এসেছে আমাকে সাহায্য করার জন্য। নিশ্চিত হয়ে গিয়েছি এতক্ষণে! আপনি মানুষ। আমি হাসতে হাসতে বলি, তাই নাকি? কিন্তু কিভাবে? আমাকে কি বলা যাবেনা?

Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen