এক ডাক্তার জ্বীনের বাস্তব ঘটনাঃ ১ম পর্ব

হঠাৎ করে কি মনে হলো, আমষ্টারডামের একটা নাইট ক্লাবে জব নিলাম, বার টেন্ডার হিসেবে। কয়েকদিনের মধ্যেই কাজ শিখে নেবার দরুন কাজে খুব মজা পেতাম। ভিন্ন ভিন্ন দেশের মানুষকে একই মঞ্চে নাচতে গাইতে দেখে খুবই ভালো লাগতো!

আমার স্বৃতি যদি আমার সাথে প্রতারণা না করে থাকে তবে যতদুর মনে পড়ে সেদিন ছিল বুধবার। খেলা চলছিল ডাচ মহিলা ফুটবল দলের। রাত প্রায় নয়টা। বারে এসে এক বাংলাদেশী ভদ্রমহিলা বসলেন। বাংলায় ফোনে কথা বলছিলেন, পরিষ্কার শুদ্ধ বাংলা। তবে বাংলাদেশী উচ্চারণ। উনি ফোনে কথা বলা শেষ করে আমার দিকে তাকালে সরাসরি বাংলাতে জিজ্ঞেস করলাম, বাংলাদেশী তাইনা? উনি তো বাংলা শুনে খুব খুশি! বললেন, এই শহরে তো এই প্রথম বাঙ্গালি পেলাম, তাও দেশী মানুষ। খুব ভালো লাগলো। তো কি স্টুডেন্ট নাকি?

বললাম, হ্যাঁ স্টুডেন্ট কিন্তু আমি এখানকারই বাসিন্দা। এই দেশেরই নাগরিক। শুধু ওদের মত নেটিভ সিটিজেন না আরকি! আমার বয়স ৩ বছর থাকতে এই দেশে আসি বাবা-মায়ের সাথে। মাঝে কিছুদিন বাংলাদেশে ছিলাম, আবার চলে এসেছি। ও দেশে থাকতে খুব একটা ভালো লাগেনি। তো আপনি? বেড়াতে এসেছেন বুঝি?

এক গ্লাস সফট ড্রিংক্স চেয়ে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, আমি লন্ডন থেকে এসেছি। বাংলাদেশ থেকে ডাক্তারি শেষ করে এসে লন্ডনে বড় ডিগ্রি নিচ্ছি। আজকাল তো শুধু এমবিবিএস-এ ভাত জোটেনা। বলেই হেসে দিলেন। খুব মিশুক একটা মানুষ।

জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় উঠেছেন? উনি বললেন, আসলে এটা নিয়েই একটা বিপদে পড়েছি। অনলাইনে একটা হোটেল রিজার্ভ করিয়েছিলাম বন্ধুকে দিয়ে। কিন্তু হোটেলে এসে শুনি আমার নামে নাকি কোনো রুম রিজার্ভ করা হয়নি! সব হোটেলই ফুল। কি যে করবো জানিনা! পরিচিত কেউ নেই এখানে।

উনাকে বিভ্রান্ত ও হতাশ দেখে খারাপ লাগছিল। আমি বললাম, দেখেন আপনি এটা নিয়ে ভাববেন না। দশটার সময় আমার ডিউটি শেষ। আপনি চাইলে আমার বাড়িতে উঠতে পারেন। আমার বাসাতে আমি আর আমার কাজিন বড় আপু আছি আপাতত। ও নিজেও এখানে বেড়াতে এসেছে ডেনমার্ক থেকে!

আমার কথা শুনে উনার চোখেমুখে প্রশান্তির একটা ঢেউ ছুয়েঁ গেল যেন! কাজ শেষ হলে উনাকে নিয়ে আমার গাড়িতে উঠলাম, বললাম, যেতে কিন্তু সময় লাগবে! আমার বাসা এখানে না, এইন্ডোভেনে! প্রায় দেড় ঘন্টার রাস্তা। রাতে কিছু খেয়েছেন? নাবোধক জবাব পেয়ে উনাকে নিয়ে একটা বাঙ্গালী রেষ্টুরেন্টে বসলাম, ডিনার করার জন্য। বিরিয়ানি অর্ডার করলাম দুইজনই।

অর্ডার আসতে আসতে উনাকে উনার নাম জিজ্ঞেস করলাম, নাম মিথিলা! ঢাকার মেয়ে! ঢাকার সেরা একটা মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা করেছেন। বাবা-মা অষ্ট্রেলিয়াতে থাকে ভাই এর সাথে। দেশে ছোট ভাই আর ভাবী থাকেন।

জিজ্ঞেস করলাম, আপনি একা নাকি? মানে এখনো বুঝি বিয়ে করেননি?

উনি বললেন, না, বিয়ে করিনি। এই উত্তরটা দেয়ার সময় উনার মুখে একটা বিষন্নতার ছাঁয়া দেখলাম। আমি মানুষের ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনকে খুব ভালো করে পড়তে পারি। তো উনাকে বললাম, যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা বলি, আসলে আপনি বোধহয় কোনো কিছু নিয়ে ডিপ্রেসড!

উনি কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, আচ্ছা, কিছুদিন তো থাকবো, একদিন বলবো সব। আমাকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াবেন তো? বললাম, হ্যাঁ অবশ্যই। আপনি তো আমার অতিথি এখন থেকে তাইনা? আর বাসায় আমার কাজিন-আপু তো আছেনই।

খাবার এলো, খাওয়া শেষ করে গাড়ি নিয়ে সোজা বাসার দিকে টান দিলাম। সারাটা পথ তেমন কোন কথা হয়নি আমাদের। কেন জানি অনুভব করছিলাম যে বিয়ের কথা বা হাজব্যন্ড এর কথা বলে হয়তো উনার মন খারাপ করে দিয়েছি। উনার কোনো কষ্টের অতীত থাকতে পারে।

যাইহোক, বাসায় গেলাম, ভেতরে ঢুকলাম। গেষ্ট রুম গোছানোই ছিল। কাজিনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমি ঘুমোতে গেলাম।

পরদিন উনি একটু বেলা করে উঠলেন। আমার ডে-অফ ছিলো। দুপুরে একসাথে খেলাম। খেতে খেতে অনেক গল্প হলো। আমার কাজিন তো এমনিই অতিরিক্ত কথা বলে! বিকেলে আমি আর মিথিলা বের হই! ওর আমষ্টারডাম দেখার খুব শখ। প্রথমে একটু আমার শহরটাকে দেখালাম।

গাড়ি নিয়ে ছুটছি রাজধানীর দিকে। আমষ্টারডাম, নেদারল্যান্ডসের রাজধানী।

উনি আমার জীবনযাপন সম্পর্কে এই ফাঁকে জেনে নিলেন। আমার গার্লফ্রেন্ড আছে কিনা সেটাও। বললাম, সম্পর্ক ছিল এক সময়। একটা ব্রিটিশ মেয়ের সাথে। কিন্তু সেটা টেকেনি। আর আপনারটা তো বললেন না?

মিথিলা আমাকে আমার ধর্ম কি জানতে চাইলেন। জবাব দিলাম, উনি জানতে চাইলেন আমি জ্বীন-পরী কিংবা ভূত-প্রেত এসবে বিশ্বাস করি কিনা! বললাম, আসলে ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করিনা। তবে জ্বীন-পরীতে বিশ্বাস রাখি। আমি যে একজন প্যারানরমাল রিসার্চার সে কথা তখনো তাকে বলিনি।

জিজ্ঞেস করি, তো হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? উনি এবারও পাশ কাটিয়ে গেলেন।

আমরা আমষ্টারডামে পৌছে গেলাম। লেকের পাশ দিয়ে হাটঁছিলাম। মিথিলা হঠাৎ করে বলে উঠলেন, আসলে আমার একজনের সাথে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সম্পর্কটা টেকেনি। সে সম্পর্ক টেকানোর মত ছিল না। সৃষ্টিকর্তা যদি দেয়াল তুলে দেন সেখানে আমরা মানুষ আর কতইবা ক্ষমতা দেখাতে পারি?

উনার কথাগুলো আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল। কফি অফার করলাম। উনি রাজি হলে কফিতে বসলাম। ইউরোপের কফি শপ গুলো রাস্তার পাশ দিয়েও বসার জায়গা তৈরী করে, প্রকৃতির মধ্যে থাকতেই বেশী ভালো লাগে। বাইরে বসলাম। ঝিরিঝিরি বাতাস আর ফুরফুরে মেজাজ। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলাম, তো সম্পর্ক কেন ভেঙে গেল? আর ঐ যে কি দেয়ালের কথা বলছিলেন, সেটাই বা কেমন?

উনি বলা শুরু করলেনঃ

আমি তখন মেডিকেল কলেজে নতুন ভর্তি হয়েছি। জানেন তো, প্রথম দিকের সেই অনুভূতি কখনোই ভোলার নয়। সাদা এপ্রোন পরে আসা যাওয়া। মেডিকেলে পা রাখতে না রাখতেই মনে হতো এই বুঝি ডাক্তার হয়ে গিয়েছি। জীবনে কখনো কারো ওপরে প্রেমে পরিনি ততদিনেও কিন্ত প্রেমে পড়তেও সময় লাগলো না! আমাদের ক্লাসেরই একটা ছেলেকে প্রথম দেখায় ভালোবেসে ফেলি। নাম ধাম কিছুই জানিনা তখনো। প্রথম দেখাতে বা এক পলকেই প্রেমে পড়ার মত যন্ত্রণার কিছু এই দুনিয়াতে আর কিছু আছে কিনা জানিনা। আমার নাওয়া-খাওয়া সব এলোমেলো হয়ে গেল সেই থেকে। তবে মুখ লুকিয়ে বাচিঁনি। প্রেমে পরেছি আর সে কথা বলবো না, মেয়ে বলে পাশ কেটে ভেতরে ভেতরে মরবো, না সেরকম মেয়ে আমি নই। একদিন ক্লাস শেষ করে কলেজের বাইরে যেতে যেতে মুখোমুখি দেখা। বলতেই হবে অমন সুন্দর ছেলে আমার জীবনেও আরেকটা দেখিনি। তার ওপর কলেজের বড় আপুদেরও ক্রাশ। আর আমার ক্লাসমেট বান্ধবীদের কথা নাইবা বললাম, তবে যতদূর জেনেছি তার নাকি কোনো বন্ধু নেই। নিজের মত করে থাকে, আসে আর যায়।

তো সেদিন ওভাবে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেলে তার পথ আটকাই। আটকিয়ে বলি, এই যে ছেলে, আমায় চিনেছো? প্রতিউত্তরে তার না চেনার ভান। পাশ কাটিয়ে চলে যাবার চেষ্টা।

কিন্তু সেটা এভাবে বেশিদিন চলেনি। আর শত শত মেয়ের চোখে ধুলো দিয়ে আমি ওর সাথে প্রেম করা শুরু করি। ওহ ওর নামটা তো বলা হয়নি। ওর নাম মাহদী।

কয়েকদিন চলা ফেরার পর থেকেই কিছুটা ভিন্নতা দেখি তার মধ্যে। তার কথাবার্তা আচরণ ঠিক কেমন জানি মনে হতো। তবু ভালোবাসার মানুষ বলে সেদিকে নজর দিতাম না। তার পরিবারের কথা বললে বেশিরভাগ সময়ই এড়িয়ে যেত। তবে বলেছিল, বাবা নেই। মা আছে। দুই ভাই আর এক বোন। তারা কোথায় থাকে সেটা স্পষ্ট করে বলেনা। প্রথম কয়েক মাস পরে সব সয়ে গেল। সে আমাকে খুব ভালোবাসে এটা আমি বুঝতাম কিন্তু তার মধ্যে শুরুর দিকে রোমান্টিকতার বড়ই অভাব খেয়াল করতাম! একদিকে পড়াশুনা আর একদিকে মাহদী। এই আমার জীবন। কয়েক মাস যেতে না যেতেই লক্ষ্য করি সেও ধীরে ধীরে অনেক রোমান্টিক হয়ে উঠছে। আমার বেশ ভালোই লাগতো। বাংলাদেশে সে সময় মাত্র মোবাইল ফোনের প্রচলন শুরু হয়েছে। আমার বাবা হাই-প্রোফাইলের মানুষ। আমি তার একটাই মেয়ে বিধায় আমার হাতে ফোন আসতে দেরী হয়না! একদিন ওকে ফোনটা দেখাই। ও দেখে ওর নিজের নাম্বারটা আমায় দেয়। তো সেটা দেখে আমি খুব এক্সাইটেড হয়ে ওকে বলি, ওমা! তোমারও ফোন আছে? কই দেখালে না তো কখনো?

ও বলে, আছে, যখন প্রয়োজন হয় তখন ব্যবহার করি মাত্র। বাইরে নিয়ে বের হইনা। আমি আর কি বলবো। ওর ব্যক্তিগত ব্যাপার। রাতে ফোন দিলে ওর নাম্বার বন্ধ দেখায়। যাইহোক, পরদিন ওর সাথে ঢাকার বাংলামোটর এলাকায় দেখা করি। দেশের নাম করা তারকা বিশিষ্ট হোটেলে। আমি বরাবরই কফি প্রেমী। আর সেখানকার কফিটাই আমার প্রিয় ছিল সেই সময়। ও এলে কফি নিয়ে বসি। মূলত সেটা ছিল পরীক্ষার কারণে। ও পরীক্ষায় সবসময় ভালো নাম্বার পেত। ভালো নাম্বার বলতে টপ বোঝাচ্ছি। আমরা কেউই ওর সাথে পারতাম না। আর আমার সাথে ওর প্রেম বলে অনেক বান্ধবীই হিংসে করতো। যাইহোক, ওয়েটার কফি দিয়ে গেলে কফিতে কিছুক্ষণ পর চুমুক দিয়ে দেখি কফি ঠান্ডা। ঠান্ডা বলতে নরমাল বোঝাচ্ছি। তো আমি ওয়েটারকে যেইনা ডাকতে যাবো, অমনি মাহদী আমাকে ডেকে বলে কই, কফি তো গরমই আছে। ঠান্ডা না তো।

আমি মুখ ঘুরিয়ে কফির কাপে আবার দুই হাত দিয়ে ধরেছি। আচমকা গরমে হাত সরিয়ে দিই। আমার বড় বড় চোখ দেখে মাহদী যেন একটু ভয় পেয়ে যায়। আসলে ভেতরে ভেতরে আমি ভয় পাই। কয়েক সেকেন্ড আগে যে মগ ঠান্ডা ছিল, সেটা এখন গরম! কিভাবে কি?

আমি আসলে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। আমি মাহদীকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কিভাবে সম্ভব মাহদী?

আমি না এইমাত্র এটাকে ঠান্ডা পেলাম। মাহদী বলে, আমার মনে হয় কি, তোমার কোথাও ভুল হচ্ছিলো! এটা আসলে গরমই ছিলো, তুমি আমার সাথে সাথে কথা বলতে বলতে আমার মগে হাত দিয়েছিলে। আমারটা একটু ঠান্ডা। তোমারটা ঠিকই আছে।

আমি সেসময়ের মত ওর কথাতে ধাতস্ত হলাম, মাথা ঠিক হলো, নাহলে এমন আচমকা ঘটনা আমার মাথা থেকে সহজে বের করতে পারতাম না। সারাদিন সারারাত পড়াশুনা। প্রফ পরীক্ষা গুলোতে ভাইভা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সারাজীবন মুখস্থ করতেই করতেই শেষ হয়ে যাবো ভাবছি!

সেবার পরীক্ষার আগে মাহদীর সাহায্য নিয়ে পরীক্ষায় এত ভাল রেজাল্ট করি যে আমি নিজেও অবাক হয়ে যাই। আসলে মাহদীর বোঝানোর ক্ষমতাটা খুবই ভিন্ন রকমের আর সহজ! যা আমি প্রফেসরদের কাছ থেকে দেখিনা ততটা।

সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পরে পড়াশুনার চাপ আরো বেশি বেড়ে যায়। এরই মধ্যে হঠাৎ করে মাহদী উধাও। যে ছেলে কখনো ক্লাস ফাকিঁ দেয়নি সে উধাও? আমি ওকে সেদিন বিকেলের দিকে ফোন দিই। ওর ফোনে কলই ঢুকছিল না! টানা দুইদিন ওকে কলেজে, ফোনে না পেয়ে আমি অনেকটা অসুস্থ হয়ে পরি। আমি কি মনে করে ফোন কোম্পানির অফিসে গিয়ে নাম্বারটা চেক করাই। কোম্পানি যা বলে তাতে আমার মাথায় হাত ওঠে। উনারা জানান যে এই নাম্বার তাদের কোম্পানিতে এক্সিষ্ট করেনা! অথচ আমি তিন দিন আগেও এই নাম্বারে কয়েক মিনিট কথা বলেছি। উনারা ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে ব্যাপারটাকে পাঠান। সেখান থেকেও রিপোর্ট আসে যে এই নাম্বারের কোনো অস্তিত্ব নেই।

আমি মাহদীর কোনো খোজঁ না পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার প্রেশার লো হয়ে পরলে আমাকে সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার যখন জ্ঞান ফিরে আসে, তখন দেখি মাহদী আমার পাশে বসা। আমি ওকে দেখে কেদেঁ দিই আর ওর হাতটা হাতের মধ্যে চেপে ধরি। জানতাম না, পাশে আমার মা ছিল। আমার মা সেটা খেয়াল করে। আমিও আমার মাকে দেখে খুব লজ্জা পেয়ে যাই। আমার মা তখন মিটমিট করে হাসছিল। সেই থেকে আমার পরিবার জেনে যায় আমার আর মাহদীর সম্পর্কের কথা। আমি সুস্থ হলে এক শুক্রবারে আমার বাবা-মা মাহদীকে দাওয়াত করেন। আমার যেন ঈদ ছিল সেদিন। সেদিন ও সাদা একটা পাঞ্জাবী পরে এসেছিল। আমি ওকে দেখে আবারো ওর প্রেমে পরি।

একসাথে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে অনেক সময় ধরে গল্প করি, যদিও সে বরাবরের মত তার এলাকার কথা তুললে পাশ কাটিয়ে যায়। বিকেল হলে ও চলে যাবে। আমি নিচে ওকে নামিয়ে দিতে যাই। সিঁড়িঘরে ও আমাকে জড়িয়ে ধরে। প্রথমবারের মত কোনো পুরুষের ছোঁয়া আমার শরীরে। আমার সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে।

দুইটা কারণে।

এক, ভালোবাসা এবং প্রথম ভালোবাসার মানুষের ছোঁয়া পেয়ে

দুই, আমি যখন ওকে জড়িয়ে ধরি, আমার মাথাটা ছিল ওর বুকের ডান পাশ বরাবর! আমি সেখানে ওর হার্ট-বিট শুনতে পাই। নিশ্চিত হতে ওকে জড়িয়ে ধরেই আমার মাথা বা পাশে সরিয়ে নিই। আমি নিশ্চিত হয়ে যাই ওর হৃৎপিন্ড বুকের বা পাশে নয়, ঠিক ডান পাশে!

আমি কাপঁতে থাকি! ও আমাকে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে? আমি ওকে প্রথম কারণটা বলে দ্রুত বিদায় দিয়ে উপরে উঠে আসি।

বিকেল থেকে আমার মাথা আইলাঝাউলা টাইপ হয়ে যায়। আমি কোনো কিছুই বুঝে উঠতে পারিনা। নিজের মনকে বারবার বোঝাচ্ছিলাম যে, আমিই ভুল। এইটা ভেবেই রাতে মাথা ঠান্ডা করে ঘুমানোর চেষ্টা করি।

পরদিন কোন ক্লাস ছিলনা আমাদের। আমি তাই ওর নাম্বারে ফোন দিলাম, ওর নাম্বার এর অস্তিত্ব নেই এটা জেনেই। কল ঢুকলো। আমার হার্টবিট বেড়ে গেল! ওর কন্ঠস্বর শুনলাম। ওকে বললাম, মাহদী, তুমি এখনই আমাদের বসার জায়গাতে (তারকা বিশিষ্ট হোটেলের রেষ্টুরেন্টে) আসো, তোমার ফোনটাও নিয়ে এসো প্লিজ!

ও বললো, ক্লাস নেই বলে আমি তো এই মূহুর্তে একটু ঢাকার বাইরে এসেছি। কাল তো ক্লাসে দেখাই হবে। কোনো জরুরী কিছু কি?

জবাবে বলি, হ্যাঁ জরুরী কিছুই ছিল তবে কাল কলেজে আসো, সেখানেও বলা যাবে। সমস্যা নেই।

পরদিন ওর সাথে দেখা হলে ওর ফোনটা দেখতে চাই। ও আমাকে দেয়। জিজ্ঞেস করি, ফোনটা কবে কিনেছো? ও নির্দিষ্ট করে কিছু বলেনা, শুধু বলে মেডিকেলে ভর্তি হবার পরে।

আর একটা কথা, সেদিন যে কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে গিয়েছিলে, সেটা কোথায় ছিলে? আমাকে কি বলা যাবে মাহদী?

ও কোনো জবাব দেয়না। শুধু বলে, সেটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। ওর এমন উত্তর শুনে খুব কষ্ট পাই, কিন্তু আমি তো দমে থাকার বা মুখ বুজে থাকার পাত্রী নই, ওকে বলি, ভালোবাসার মানুষের কাছে আবার ব্যক্তিগত বিষয় কি মাহদী? এটা কেমন কথা?

ও জবাবে শুধু এটা বলে, এটা আমার পারিবারিক বিষয়, এইজন্য বলতে চাইনা।

আমি এইবার রেগে যাই, রেগে বলি, ওহ আচ্ছা, পারিবারিক বিষয় তাইনা? যে মানুষ কখনোই তার পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে মুখ খোলেনা সে যদি বলে পারিবারিক বিষয় তাহলে আমার আর তো কিছুই বলার থাকেনা তাইনা?

মাহদী আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বলে, আমি তোমার সাথে মিথ্যে বলছিনা। তুমি এটাও নিশ্চিত থাকো, তোমার ভালোবাসার সাথে আমি কখনো প্রতারণা করিনি আজো, করছি না আর করবোও না। তবে আমরা যেহেতু জানিনা কিছু মুহূর্ত পরে আমাদের জীবনে কি হবে, তাই এটার নিশ্চয়তাও দিতে পারছিনা যে আমাদের প্রেমের পরিণতি কি হবে!

ওর শেষের কথায় আমার খারাপ লাগলেও আমি নিজেকে বুঝ মানাই। কারণ, আমি বাস্তবধর্মী মানুষ। তাকে আমি ভালোবাসি এটাই আমার নিজের কাছে নিজের চাওয়া-পাওয়া! আর সে আমাকে ভালোবাসে এটা আমার কাছে বোনাস! আমার ভালোবাসার পরিণতি। আমার প্রেম!

আমি ওকে একটু জড়িয়ে ধরতে চাই, কলেজের বারান্দায়। সেই সময়ে লজ্জার মাথা খেয়েই আরো ছেলেমেয়ের সামনেই। অনেকেই আড়চোখে দেখে আবার অনেকেই হেসে দেয় লজ্জায়। আবার কারো কারো হিংসে হয়!


আমি আবারো টের পাই, ওর হৃৎপিন্ড ঠিক ডান পাশে!

পরদিন আমি আমাদের কলেজের কার্ডিওলজির অধ্যাপকের সাথে দেখা করি। অনেক ব্যস্ততার মাঝেও উনি আমাকে সময় দেন। হয়তোবা আমার হাই-প্রোফাইল বাবার জন্য! জানেন তো, বাংলাদেশে এসব খুব সাধারণ। যাইহোক, আমি উনাকে জিজ্ঞেস করি, এটা সম্ভব কিনা যে কোনো একজনের হৃৎপিন্ড ডান পাশে অবস্থিত?

স্যার আমাকে বলেন, হ্যাঁ সম্ভব। এটাকে মেডিক্যাল সায়েন্সের ভাষায় ডেক্সট্রোকার্ডিয়া বলা হয়। তবে এই অস্বাভাবিকতার হার ১% এর নিচে। এবং এটি সুচিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক করা যায়, যদিও আমাদের দেশে এটা এখনো সম্ভব নয়, কেবল পশ্চিমা বিশ্বেই এই চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু কেন রে বেটী? হঠাৎ এই প্রশ্ন? কোনো সমস্যা?

আমি পুরোই চোখেমুখে মিথ্যে বলে চলি আসি। বলি, না স্যার। অনেক বই ঘেঁটেও ব্যাপারটা বের করতে পারলাম না দেখে আপনার শরাপন্ন হলাম আরকি! স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় এলাম। গাড়ি ছিল সার্ভিসিং-এ। অগত্যা রিকশায় চড়া বহুদিন পরে। খোলা হাওয়ায় খুব ভালোই লাগছিল। ঢাকা শহরে তখন এখনকার মত জঞ্জাল ছিল না। তবে খুব সংশয়ে ছিলাম, মনে হচ্ছিলো যে মাহদী হয়তো এই অস্বাভাবিকতা নিয়েই জন্ম নিয়েছে!

কিন্তু ওর কাছে ব্যাপারটা ঠিক কিভাবে তুলি সেটা নিয়েই খুব চিন্তিত ছিলাম। এই সব চিন্তা চিন্তা করতেই দেখি ব্যাগের মধ্যে ফোন বাজছে। দেখি ফোনের কোম্পানি থেকে কল দিয়েছে! আমাকে একটু দ্রুত ওদের অফিসে যেতে বলে। আমি রিকশাওয়ালাকে বলে ওদের অফিসের দিকে রওনা দিই।

চলবে

Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen