উইমেন চ্যাপ্টারের নারীবাদ ও প্রসংগকথা

বাংলাদেশ সহ সারা পৃথিবীতে যেই নারীবাদ দেখি, অর্থাৎ আমাদের সময়কালে নারীবাদীরা নারীর সেক্সুয়ালিটির প্রসঙ্গে যে যে দাবী তোলে তা মুলত হচ্ছে; নারীর যৌন আনন্দ পাবার অধিকার বা রাইটস ফর সেক্সুয়াল প্লেজার, রিপ্রোডাক্টিভ রাইট বা প্রজননগত অধিকার ইত্যাদি। এই দাবীগুলোর বিষয়ে তর্ক অনেক আগেই বামপন্থীরা করে গেছেন। ইন ফ্যাক্ট নারীর মুক্তি প্রসঙ্গে সেক্সুয়ালিটির দাবীটা কতটুকু প্রাসঙ্গিক হতে পারে একজন বামপন্থীর কাছে সেটার ফয়সলা লেনিন নিজেই করে দিয়ে গেছেন। যেহেতু বাংলাদেশের আজকের বামপন্থীরা মোর ক্যাথিলিক দ্যান পোপ তাই তারা লেনিনকে গুরু মারা বিদ্যায় লেনিনকেই নাকচ করে দিচ্ছে।

যাই হোক, নারীমুক্তি প্রসঙ্গে বামপন্থীদের ঐতিহাসিক অবস্থান হচ্ছে, নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে শরীর বা প্রবৃত্তির সম্পর্কের দিক থেকে বিচার না করে এই সম্পর্কের মানবিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে বিচার করা। কারণ তারা মনে করে নারী পুরুষের সম্পর্ক বিবেচনার ক্ষেত্রে যৌন আনন্দের বিষয়টা সামনে এলে তা প্রবৃত্তির প্রাধান্যকেই প্রতিষ্ঠা করে এই সম্পর্কের মানবিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিবেচনা পিছনে পড়ে যায়। ফলে আরো উন্নত সভ্যতা ও সমাজ গড়ার শর্তগুলো লোপ পায়।


নারীর মুক্তি প্রসঙ্গে লেনিনের সাথে ক্লারা জেটকিনের আলাপটা বামপন্থী লিটারেচারে নারীমুক্তি প্রসঙ্গে সবেচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ আকর। তবে আজকের নারীবাদিরা যা চান সেই বিষয়ে লেনিনের প্রাসঙ্গিক আলোচনা আছে আরেক জায়গায়। সেটা হচ্ছে ইনেসা আরমণ্ডের সাথে পত্রালাপে। ইনেসা আরমণ্ড ছিলেন সেই সময়ের রাশান এলিট সুন্দরী মহিলা। অনেকে ধারণা করে লেনিনের সাথে ইনেসার ইটিশ পিটিশ প্রেম ছিলো। এই প্রেম রুশ বিপ্লবের আগের ছয় বছরে ধরে চলেছিলো। তবে অবাক বিষয় এনিয়ে লেনিনের বৌ ক্রুপস্কায়ার কোন অভিযোগ ছিলোনা। লেনিনের সাথে ইনেসার এই ইটিশ পিটিশ প্রেম মহীয়সী ক্রুপস্কায়া মেনে নিয়েছিলেন। (আহা কী ত্যাগ ) এই লেখার সাথে ছবিটা ইনেসার। টাক্কু হলে কী হবে, গুরু রমণীমোহন ছিলেন, হু।

যাই হোক, এই শ্রীমতী ইনেসা দেবী (একটু এক্সট্রা খাতির করলাম, গুরুর প্রেমিকা বলে কথা) নারী মুক্তির প্রসঙ্গ নিয়ে একটা ইশতেহার লিখবেন সেইটার একটা খসড়া লিখেছেন। সেই খসড়া পাঠিয়েছেন লেনিনের কাছে দেখে মতামত দেয়ার জন্য। সেই ইশতেহারে “ফ্রি লাভ” বা অবাধ ভালোবাসার অধিকারের কথা বলেছিলেন ইনেসা। এই “ফ্রি লাভ” বলতে ইনেসা যা বুঝিয়েছিলেন তা আজকের আরবান এলিট নারীবাদীরা যা যা দাবী করে ঠিক তাই। তো পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে। লেনিন ঠিক এই জায়গাটায় চেপে ধরলেন ইনেসাকে। লেনিনের কথায় যেন কোন ফাক না থাকে তাই ইনেসার “ফ্রি লাভ” বলতে কী কী বুঝাতে পারেন সেইটার একটা তালিকা করলেন এক দুই করে দশটা পয়েন্টে। পয়েন্টগুলো ভাল করে পড়ুন।

১/ টাকাপয়সার হিসাব থেকে মুক্তি, এথেকে আর যেসব মানে করা যায় তা হচ্ছে, ২/ বৈষয়িক বিবেচনা থেকে মুক্তি। ৩/ ধর্মীয় অনুশাসন থেকে মুক্তি ৪/ বাবা-মার নিষেধের বেড়াজাল থেকে মুক্তি ৫/ সামাজিক অনুশাসন ও কুসংস্কার থেকে মুক্তি ৬/ গোষ্ঠী সংকীর্নতা থেকে মুক্তি ৭/ আইন কোর্ট কাচারি এইসব থেকে মুক্তি ৮/ ভালোবাসায় গভীরভাবে লিপ্ত হওয়ার বন্ধন থেকে মুক্তি ৯/ সন্তান ধারণের দায়িত্ব থেকে মুক্তি ১০/ ব্যাভিচারের দুশ্চিন্তা বা পাপবোধ থেকে মুক্তি

লেনিন খুব স্পষ্ট করে বলছেন “ এখনকার সমাজের সবচেয়ে গলাবাজ আর বুলিসর্বস্ব মুখরা শ্রেণী “ফ্রি লাভ” বলতে ৮-১০ নম্বয় পয়েন্টগুলোই বুঝে। …সর্বহারার কাছে গুরুত্বপুর্ণ হচ্ছে ১-৭ পয়েন্ট আর এগুলোকে “ফ্রি লাভ” দিয়ে বুঝানো যায়না।” ইন ফ্যাক্ট ইনেসা আরমন্ড ফ্রি লাভ বলতে ৮-১০ নম্বরই বুঝিয়েছিলেন সেটা লেনিন ধরে ফেলেছিলেন আর এটা ইনেসার সাথে লেনিনের পত্রালাপে স্পষ্ট। ইনেসার এই ৮-১০ নম্বর পয়েন্টগুলোই আজকের আরবান ফেমিনিস্টদের দাবী কিনা দেখুন। উইমেন চ্যাপ্টারে যে লেখাগুলো আসে তা কি এই দাবীরই প্রতিধ্বনি নয়? আর খেয়াল করলে দেখবেন ফ্রি লাভ নিয়ে লেনিনের সমালোচনা রিলিজিয়নগুলো ফ্রি লাভের যে সমালোচনা হাজির করে তার কাছাকাছি কিনা?

আমার যারা বিরোধিতা করেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাকে মুর্খ বলেন। আমি মুর্খই, এতে কোন সন্দেহ নেই। আমি নিজে একজন মুর্খ সেই ঘোষণা দিতেও আমার কোন গ্লানি নেই। ভারতের প্রথম মার্ক্সিস্ট চিন্তক বিনয় সরকার নিজেকে “গরু” বলেতেন; আর নিজের চিন্তাকে বলতেন “গরুমি”। আমাকে আপনারা গরু বললে আরো প্রীত হই।

আমি একাডেমিশিয়ান নই। কিন্তু তার মানে আমি চিন্তায় অক্ষম তা নই। চিন্তা সবসময়ই সহজ ও সরল। নারীমুক্তি নিয়ে যে কোনো মানুষই ভাবতে সক্ষম। ভাবেও, কারণ মানুষমাত্রই ভাবুক। কিন্তু তথাকথিত ‘বিশেষজ্ঞ’ বা যাকে ইংরেজিতে স্টাইলাইজড চিন্তা বলা হয়, বিশেষ কায়দায় রপ্ত করা ভাষায় কথা বলা বা প্রশ্ন করা, তা সবসময় সজীব চিন্তার জন্য ক্ষতিকর। সাধারণ মানুষকে এই বিশেষজ্ঞ বা একাডেমিক চিন্তা আতংকিত করে তোলে। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষজ্ঞরা এ ধারণা জাগিয়ে তোলেন যে, ‘শিক্ষিত’ বা বিশেষজ্ঞ বা একাডেমিশিয়ানদের মতো কথা না বললে সেটা চিন্তা নয়।

আমি যা বলি তা কোনো স্টাইলাইজড বা বিশেষজ্ঞ বা একাডেমিক চিন্তা নয়। আমি কথা বলি স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে। অতি সাধারণ মানুষ নারী নিয়ে যেসব প্রশ্ন করে সেসব প্রশ্নের কথাই আমি সেদিনের একাত্তর টিভির টক শোতে বলেছি। কারণ এই সাধারণ মানুষের ভাবনাকে ঘিরেই সমাজের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করে। সেই সব প্রশ্ন নিয়ে আমি কথা বলি যা সাধারণ মানুষের চিন্তা জন্য বিশেষজ্ঞরা পাত্তা দেয়না; না ফলে সমাজে সহজ, সাবলীল স্বতঃস্ফূর্ত চিন্তার আর কোনো ভূমিকা থাকে না।

আপনার কথা মানুষ বুঝেনা। আপনি আপনার একাডেমিক জ্ঞান নিয়ে গজদন্ত মিনার বানিয়ে থাকুন, আমার জন্য সাধারণ কান্ডজ্ঞানই যথেষ্ট। সেকারণেই আমি মানুষের মধ্যে থাকি, মানুষের সাথে জীবন্ত সংযোগে থাকি, আমি তাঁদের কাছেই শিখি। জনগণের চাইতে বড় শিক্ষক আর নেই। কিন্তু হায়, আপনি সেই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। সেকারণেই আমি আপনাকে ঈর্ষা নয় করুণা করি।

0 comments
Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen