ঈশ্বর হাইপোথিসিস


নিজের বিশ্বাসকেই সবচেয়ে লজিক্যাল মনে করেন না এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে নগণ্য হলেও, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই লজিক্যাল ফ্যালাসি কি তা জানেননা। সবাই নিজেকে বুদ্ধিমান এবং সঠিক মনে করলেও যে যার যার অবস্থান থেকে অনেক বেশিই ধর্মান্ধ যা তেতো শোনা গেলেও সত্য। নিজেদের প্রচলিত বিশ্বাসের পেছনে তারা লজিক খুঁজতে ভালোবাসেন না, তবে কেউ তাদের বিশ্বাসের পক্ষে লজিক প্রয়োগ করলে সেটা ঠিকই খুশি মনে অনায়াসে মেনে নেন গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা ছাড়াই। বলা যায়, অধিকাংশ মানুষই জানেন না বা জানতে আগ্রহী হয় না যে, কোন লজিকটা গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি নয়। মানুষের মধ্যে থাকা এমন অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়েই কিছু মানুষ চ্যানেল খুলে বা বই লিখে নিজেদের উদ্দেশ্যে সফল হয়। নিজেদের মতো সাধারণ মানুষকেও তারা ঈশ্বর বিশ্বাসী এবং ধর্মান্ধ করে রাখতে চায় আর সেজন্য প্রয়োগ করে এমন কিছু যুক্তি যা যুক্তিবিদ্যায় অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হলেও, সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে জোর দিয়ে বেশ ভালোভাবেই অন্ধ করে রাখতে পারে। লজিক্যাল ফ্যালাসি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে “বহুল প্রচলিত কিছু কুযুক্তি বা কুতর্ক বা হেত্বাভাস” শিরোনামের লেখাটি বিশেষ পাঠ্য।

মাঝেমধ্যে কিছু ভাই বোন আমাকে কোনো ইসলামিক স্কলারের ভিডিও পাঠিয়ে বা কোনো অনলাইন ইসলাম বিশারদের স্ট্যাটাসের লিংক দিয়ে বলেন সেখানে নাকি ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা হয়েছে। সেসব ভিডিও দেখে বা স্ট্যাটাস পড়ে যা বুঝি তা হলো, বিশ্বাসীর বিশ্বাস সর্বদাই লজিক্যাল ফ্যালাসির ওপর নির্ভরশীল এবং সেইসব ফ্যালাসির বাইরে তারা কিছু ভাবতে পারেনা বা ভাবতে চায় না। যাইহোক, আমি এ লেখায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে ঈশ্বরবাদীদের মধ্যে প্রচলিত নানা লজিক্যাল ফ্যালাসি তুলে ধরবো পাশাপাশি সেসব দাবি কেন গ্রহণযোগ্য নয় তা ব্যাখ্যা করবো।

একথা সবাই জানি, বিজ্ঞান এখনো মহাবিশ্বের সকল ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারেনি। এখনো প্রকৃতির অনেক প্রশ্নের উত্তরই তার অজানা। সেজন্য আমরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত বোধকরি। বিশ্বজগতের নানা ঘটনা যার ব্যাখ্যা আমরা জানি না তা ঈশ্বরের অলৌকিকতা মনে করি। সেসব অজানা ঘটনার ব্যাখ্যায় বলি, ইহা ঈশ্বরের লীলা। মনে করি, সেসব ঘটনার রহস্য একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। আজ প্রকৃতির যেসব ঘটনার রহস্য আমরা জানি সেসব ঘটনার জন্য আমাদের ঈশ্বর শব্দ টা ব্যবহার করতে হয় না। আকাশে মেঘ কেন জমে, মেঘ থেকে পানি কেন পড়ে, সূর্যকে দেখে কেন মনে হয় সেটা পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাচ্ছে ইত্যাদি ঘটনা ব্যাখ্যা করতে আমাদের বলতে হয় না, ‘এসব ঈশ্বরের লীলা’। কারণ এসব ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমরা জানি, আমরা জানি এসব ঘটনার পেছনে কি কারণ আছে, কিভাবে এবং কেন ঘটছে। আর জানি বলেই এসব ঘটনা আমাদের কাছে অলৌকিক নয়।

তবে পৃথিবীতে একটা সময় গেছে যখন মানুষ জানতো না, আকাশে কেন মেঘ জমে, কেন বজ্রপাত হয়, কেন টর্নেডো হয়, কেন ভূমিকম্প হয় বা কেন পাথরের সাথে পাথর ঘষলে অগ্নির দেখা পাওয়া যায়। প্রাচীন মানুষদের কাছে এসব ঘটনার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না থাকায় তারা এসব ঘটনাকে ঈশ্বরের লীলা বলে ব্যাখ্যা করতো। এসব প্রাকৃতিক ঘটনার পেছনের কারণ জানা না থাকায় তারা এসব ঘটনাকে ঈশ্বরের অলৌকিকতা মনে করতো। বাস্তবতা হলো, কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা আমরা না জানলে বা না বুঝলেই ঈশ্বর শব্দটাকে ব্যবহার করি সেই অজানা ঘটনা ব্যাখ্যা করতে। যুগের পর যুগ বদলেছে এবং বিজ্ঞান এক এক করে অসংখ্য অলৌকিক ধারনা দূর করে দিয়েছে। একসময় যা ঈশ্বরের লীলা বলে ব্যাখ্যা করা হতো, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মানুষ এখন দিতে পারে।

বিশ্বজগতের বিভিন্ন ঘটনার রহস্য বুঝতে না পেরে সমাধান হিসেবে কোনো কাল্পনিক সত্তাকে অনুমান করা থেকেই ঈশ্বর ধারনা মানব মস্তিষ্কে এসেছে। জগতের সকল বিষয় আমরা বুঝি না, হয়তো সবকিছুর রহস্য আমরা কখনওই বুঝতে পারবো না। তাই বলে যা আমাদের জ্ঞানের বাইরের তা সম্পর্কেও কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হবে, সেটা জরুরী নয়। প্রকৃতপক্ষে, ঈশ্বরবিশ্বাস কোনো সমাধান নয়, বরং ঈশ্বর শব্দটি অন্যভাবে “আমি জানি না” অর্থ প্রকাশ করে। বিশ্বাসীদের কাছে ঈশ্বর একটি অলৌকিক সত্ত্বা হলেও বাস্তবতায় তারা ঈশ্বরকে “আমি জানি না” অর্থে ব্যবহার করে। আপনি যখন বললেন, “ঈশ্বর না থাকলে মহাবিশ্ব কে তৈরি করলো”? ঠিক তখন পরোক্ষভাবে আপনি আসলে বললেন, “মহাবিশ্বের উদ্ভব কিভাবে হয়েছে তা আমি জানি না”। আর এই অজানা স্থানকে ব্যাখ্যা করতে আপনি একটি অলৌকিক সত্ত্বাকে অনুমান করে নিলেন। ঈশ্বর মানব মস্তিষ্কের এই অনুমান ব্যতীত কিছুই না। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ঈশ্বরকে অজানা ঘটনার কারণ অনুমান করা সমাধান নয় বরং আরও বড় সমস্যা তৈরি করা।

আইফোনের যেমন একজন কারিগর আছে, তেমনি সবকিছুর পেছনে অবশ্যই একজন কারিগর থাকবে

মাঝেমাঝে আমরা অনলাইন ইসলাম বিশারদদের দেখি তারা নাস্তিকদের ভুল প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে মোবাইল বা ঘড়ির লজিক তুলে ধরেন। তাদের বহুল প্রচলিত দাবি হলো, যেহেতু একটা আইফোন তৈরি করতে একজন কারিগর প্রয়োজন সেহেতু সবকিছু তৈরি করতে একজন ঈশ্বর প্রয়োজন, সুতরাং ঈশ্বর বলে একজন আছেন। তাদের দাবি, একজন কারিগর ছাড়া যেমন মোবাইল ঘড়ি ইত্যাদি চিন্তা করা যায়না ঠিক তেমনি, একজন ঈশ্বর ছাড়া আমাদের মহাবিশ্বও চিন্তা করা যায় না। সত্যি বলতে এধরনের লজিক হাজার বছর আগের সময়ের জন্য উপযোগী ছিলো যখন মানুষের জ্ঞানের মাত্রা ছিলো খুবই সামান্য। ২০১৮ সালে এসেও এধরনের লজিক প্রয়োগ করা বেশ হাস্যকর। তারচেয়ে বরং আরও গভীর ভাবে ভেবে দেখা উচিৎ। হাজার বছর আগেকার মানুষও একইভাবে ঈশ্বরকে অনুমান করতো। তারা মনে করতো ঘরবাড়ি বানানোর পেছনে যেমন কেউ থাকেন তেমনি সবকিছু বানানোর পেছনেও কেউ একজন আছেন।

প্রথমত, আইফোনের জন্য একজন কারিগর এজন্যই প্রয়োজন কেননা আইফোন প্রাকৃতিক ভাবে জন্ম নেয় না আবার, এক আইফোন আরেক আইফোনকে জন্ম দিতে পারে না। তাই এটা ধ্রুব সত্য যে, আইফোন কোনো না কোনো মানুষকেই তৈরি করতে হয়। অপরদিকে, মানুষ, প্রাণীজগৎ এর সকল প্রাণী, গাছপালা ইত্যাদি আমরা প্রাকৃতিকভাবেই প্রকৃতিতে জন্ম নিতে দেখি। তাই আইফোনের একজন কারিগর আছে বলে নিশ্চিতভাবে সবকিছুর একজন কারিগর আছে মনেকরা লজিক্যাল নয়।

কখনো ভেবেছেন, ঈশ্বর প্রশ্নে আমরা সবসময় মানবসৃষ্ট জিনিসের উদাহরণই কেন আনি? অথবা কেন বলতে পারি না, যেহেতু পাথরের একজন কারিগর আছেন সেহেতু সবকিছুর পেছনেও একজন কারিগর আছেন? কারণ আমরা জানি মানবসৃষ্ট জিনিস যা প্রাকৃতিকভাবে প্রকৃতিতে জন্মায় না তা কাউকে না কাউকে তৈরি করলেই পাওয়া যাবে। তাই ঈশ্বর প্রশ্নে আমরা সবসময় মানবসৃষ্ট জিনিসের উদাহরণ নিয়ে আসি। অপরদিকে, পাথর প্রাকৃতিকভাবেই প্রকৃতিতে জন্ম নেয় আর সেই ঘটনায় আমরা কোনো কারিগরের উপস্থিতি খুঁজে পাই না। সেই ঘটনার পেছনে একজন কারিগর আছেন বলে কেবল অনুমান করি।

সুতরাং, মানবসৃষ্ট সকল কিছুর একজন কারিগর থাকা ধ্রুব সত্য হলেও, বিশ্বজগতের সবকিছুর জন্য একজন কারিগর বা ঈশ্বর কেবল অনুমান। আপনি কেবল অনুমান করতে পারেন মহাবিশ্ব, পৃথিবী অথবা পাথরের পেছনে একজন ঈশ্বরের হাত আছে। তবে সেই ঈশ্বর অনুমানের অর্থ দাঁড়াবে মহাবিশ্ব, পৃথিবী অথবা পাথর কিভাবে এসেছে সেটা আপনি জানেননা। আপনি জানেননা বলেই একজন কারিগর বা ঈশ্বর অনুমান করে নেন।

দ্বিতীয়ত, আইফোনের কারিগর আইফোন তৈরি করতে যা যা ব্যবহার করেন তা কারিগরের অলৌকিক ভাবে উৎপন্ন করা নয়। আইফোনের গাঠনিক উপাদান প্রকৃতিরই অংশ। এবার নিজেকে প্রশ্ন করুণ, আইফোন তৈরি করতে যদি প্রকৃতির অংশই ব্যবহৃত হয় তাহলে প্রকৃতি তৈরি করতে ঈশ্বর কি ব্যবহার করেছেন? যখন মহাবিশ্ব প্রকৃতি অর্থাৎ কিছুই ছিলো না তখন ঈশ্বর মহাবিশ্ব প্রকৃতি কি দিয়ে তৈরি করলেন?

যেহেতু আইফোনের গাঠনিক উপাদান প্রাকৃতিক এবং কারিগরের উৎপন্ন করা নয়, সেহেতু আইফোনের (কু)যুক্তি অনুযায়ী পৃথিবীর একজন কারিগর আছেন তবে পৃথিবীর গাঠনিক উপাদান সেই কারিগরের উৎপন্ন করা হবে না। অর্থাৎ আইফোনের (কু)যুক্তি অনুসরণ করলে শেষে প্রশ্ন থেকে যাবে, নক্ষত্র গ্রহ উপগ্রহ ইত্যাদি ডিজাইন করতে ঈশ্বরের ব্যবহৃত উপাদান কোথায় থেকে আসলো? তাই কোনো মানবসৃষ্ট যন্ত্রের সাথে প্রাকৃতিক কোনো কিছুর তুলনা দিয়ে ঈশ্বর কল্পনা করাই অর্থহীন।

তৃতীয়ত, সবকিছুর পেছনে যদি একজন কারিগরের প্রয়োজন হয় বা, কারিগর ব্যতীত যদি কোনো কিছু অস্তিত্বশীল হতে না পারে তাহলে একইভাবে সেই কারিগরেরও একজন কারিগর থাকতে হবে। আইফোনের জটিলতায় একজন কারিগরের শ্রম আছে বলে যদি ধরে নেন, আমাদের এই মহাবিশ্বের জটিলতায়ও একজন কারিগরের শ্রম আছে তাহলে সেই কারিগরের জটিলতায়ও একজন কারিগরের শ্রম আছে ধরে নেওয়া আপনার দায়িত্বে এসে যায়। এভাবে জটিল থেকে জটিলতর কারিগর ধরে নেওয়া চলতেই থাকবে যার কোনো শেষ নেই। বিশ্বাসীরা বলেন, মহাবিশ্ব কতোই না জটিল, নিশ্চয় একে কোনো ঈশ্বর ডিজাইন করেছেন। আমি বলি, জটিল এ মহাবিশ্ব যে ডিজাইন করেছেন সেও নিশ্চয় কল্পনাতীত জটিল, নিশ্চয় তারও একজন ঈশ্বর আছেন। প্রকৃতির জটিলতার জন্য যদি একজন ঈশ্বর প্রয়োজন হয় তাহলে প্রকৃতির চেয়েও জটিল ঈশ্বরের জন্য আরও জটিল একজন ঈশ্বরের প্রয়োজন হবে এবং এভাবে ঈশ্বরের ধারা চলতেই থাকবে। অর্থাৎ ঈশ্বর ধারনা কোনো ঘটনার আদি কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে না বরং আরও বিশাল সমস্যার জন্ম দেয়। আরও ভয়ংকর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।

মহাবিশ্বের জটিলতা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা অন্বেষণ এবং বিশ্লেষণ করেই চলেছেন, হয়তো সকল প্রশ্নের উত্তর আমরা কখনওই জানতে পারবো না। তবে সেটা কোনো সমস্যা নয়। একটি প্রশ্নের উত্তর না জানার কারণে রূপকথা ব্যবহার করে সেটা ব্যাখ্যা করা লজিক্যাল নয়।

আমরা বলতে পারি, পুরো ঈশ্বর ধারনাটাই Argument from Ignorance Fallacy দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। ‘যেহেতু অমুক কিভাবে এসেছে আমরা জানি না সেহেতু তমুকের অস্তিত্ব আছে’ এভাবে কোনো অজানা বিষয়কে কেন্দ্র করে কোনো কিছু ধরে নেওয়ার কুযুক্তিই ঈশ্বর বিশ্বাসের মূল। মহাবিশ্ব, প্রাণী দেহ, দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, কোষ, DNA ইত্যাদি যতো জটিলই হোক না কেন তা কোনোভাবেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না। বরং জটিলতা কিভাবে এসেছে কেন এসেছে সেটা আপনি জানেননা প্রমাণ করে।

ঈশ্বরের কোনো শেষ বা শুরু নেই

একজন বিশ্বাসীকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, ঈশ্বরকে কে তৈরি করলো? বা, ঈশ্বরের ঈশ্বর কে? তখন উত্তরে সে বলেন ঈশ্বর চিরকাল ধরেই ছিলেন এবং চিরকাল ধরেই থাকবেন, ঈশ্বরের কোনো সৃষ্টি নেই। আবার অনেকে বলেন, “ঈশ্বর হলেন স্রস্টা এবং বাকি সবকিছু তার সৃষ্টি, সৃষ্টি/ধ্বংস/শেষ/শুরু ইত্যাদি শব্দ স্রস্টার জন্য প্রযোজ্য নয়, প্রযোজ্য তার সৃষ্টির জন্য।

আসলে এধরনের দাবি কোনোরকম আলোচনার যোগ্যতা রাখে না যেখানে একজন মানুষ নিজের বিশ্বাসকে লজিক্যাল প্রমাণ করতে কোনোরূপ প্রমাণ ছাড়াই কোনোকিছু আগে থেকে ধরে নিয়ে কথা বলে। ঈশ্বর বিশ্বাসীরা আগে থেকেই ধরে নেন ঈশ্বর চিরকাল ছিলেন এবং চিরকাল থাকবেন। তারা আগে থেকেই ধরে নেন ধ্বংস/সৃষ্টি/শেষ/শুরু ইত্যাদি শব্দ স্রস্টার জন্য প্রযোজ্য নয়। আর এসকল দাবি বিশ্বাসীদের অনুমান ব্যতীত আগে থেকেই প্রমাণিত কোনো সত্য নয়। তাই বিশ্বাসীদের এমন লজিক প্রকৃতপক্ষে লজিকে নয়, বরং Begging the question fallacy তে পড়ে। এই লজিক্যাল ফ্যালাসি অনুযায়ী কেউ যদি আগে থেকেই কোনোকিছু সত্য বলে ধরে নেয় যা আগে থেকেই প্রমাণিত নয় তাহলে সেটা কুযুক্তি বলে বিবেচিত হবে।

আপনি যদি একইভাবে বলেন, মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ, মানুষ কেবল বিশ্বজগতের ১০% সম্পর্কেই জ্ঞান রাখতে পারবে ও বাকি ৯০% সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাবে এবং যদি সেইসূত্রে দাবি করেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব হয়তো সেই অজানা ৯০% এর মধ্যেই আছে যা মানুষ কখনওই জানতে পারবেনা তাহলেও আপনার লজিক একই লজিক্যাল ফ্যালাসিতে পড়বে। কেননা আপনি আগে থেকেই মনে মনে ধরে রেখেছেন মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের বাইরে আছে যার কোনোটাই আগে থেকে প্রমাণিত সত্য নয়। ঠিক এখানে আমি Christopher Hitchens এর একটি প্রবাদ তুলে ধরতে চাই।

What can be asserted without proof Can be dismissed without proof ~ Christopher Hitchens

বিনা প্রমাণে আপনি যা দাবি করতে পারেন, বিনা প্রমাণেই আমি তা প্রত্যাখ্যান করতে পারি।

ঈশ্বর ছাড়া সবকিছু কোথা থেকে আসলো এবং সবকিছু কিভাবে চলছে?

ঈশ্বরবাদীরা বলেন, যেহেতু প্রত্যেক ঘটনার পেছনেই কোনো না কোনো কারণ এবং প্রভাব আছে সেহেতু কোনো না কোনো কারণই আমাদের এ মহাবিশ্বের জন্ম দিয়েছে। যাইহোক, যদিও মহাবিশ্বের পদার্থবিদ্যাগত সকল সূত্র ‘কারণ এবং প্রভাব’ অনুযায়ী কাজ করে তারমানে এ নয় যে ঈশ্বর নামক কোনো অলৌকিক শক্তিই সেই কারণ।

আমরা যদি সময়ের সাথে প্রত্যেক ঘটনার পূর্ব অবস্থা অনুসরণ করতে থাকি তাহলে প্রত্যেকবারই আমরা একটি পূর্ববর্তী ঘটনা খুঁজে পাবো যার ফলে সেটা ঘটেছে। ঈশ্বরবাদীদের দাবি, প্রাকৃতিক ঘটনার এই ধারা চিরতরে চলতে পারেনা। যেহেতু কোনো ঘটনা নিজে নিজে ঘটতে পারেনা সেহেতু্ কোনোকিছুর অস্তিত্ব সবকিছুর আদি কারণ।

বিশ্বাসীদের এ লজিক একই সমস্যা তৈরি করে যা উপরে আলোচনা করে এসেছি। যদি সবকিছুর পেছনে একজন ঈশ্বর থাকে তাহলে ঈশ্বরকে কে তৈরি করলো? ঈশ্বরের ঈশ্বরকে আবার কে তৈরি করলো? ঈশ্বর ধারনা অসীম কারণতা সমস্যার সমাধান করার বদলে ভিন্ন নামে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। ঈশ্বর কেবল একটি উত্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয় যা বাস্তবে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। একটি রহস্যকে তারচেয়েও বড় রহস্য দ্বারা সমাধান করা যায় না। এধরনের লজিক Special pleading fallacy তে পড়ে। একধরণের বিশেষ কপটতা উঠে আসে যখন কেউ বুঝতে পারে, সে যে সমাধান প্রয়োগ করছে তা তার ইতিমধ্যে স্থাপন করা নিয়মে টিকতে ব্যর্থ। সবকিছুর পেছনে যদি একজন ঈশ্বর প্রয়োজন হয় তাহলে ঈশ্বরের পেছনে কেন একজন ঈশ্বর প্রয়োজন হবে না? ঈশ্বরের অস্তিত্বশীল হতে যদি অন্যকোন ঈশ্বর প্রয়োজন নাহয় তাহলে সবকিছুর পেছনে কেন একজন ঈশ্বর থাকতে হবে?

আমরা যদি ধরেও নেই, কোনোকিছু নির্মিত হওয়া ব্যতীত অস্তিত্বশীল হতে পারে তাহলে একই লজিক কেন মহাবিশ্বের বেলায় প্রয়োগ করতে পারিনা?

অনেক ঈশ্বরবাদী আছেন যারা Thermodynamics এর প্রথম সূত্র তুলে ধরেন যা বলে, “পদার্থ এবং শক্তি নির্মিত বা ধ্বংস হতে পারেনা” [1]। সেইসূত্রে তারা দাবি করেন প্রাকৃতিক জগতে শূন্যতা থেকে কোনোকিছু আসতে পারেনা অর্থাৎ একটি অতিপ্রাকৃতিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আস্তিকদের দাবি অনুযায়ী Thermodynamics এর প্রথম সূত্র প্রমাণ করে মহাবিশ্বের সকল ম্যাটার এবং এনার্জির জন্য কোনো উৎসের অস্তিত্ব থাকা প্রয়োজন। যাইহোক, অন্যান্য ভাবেও সেটা সত্য হতে পারে। যেমন, মহাবিশ্ব একই পরিমাণ ম্যাটার এবং এনার্জি নিয়ে চিরকাল অস্তিত্বশীল থাকতে পারে। আমরা মহাবিশ্বের ত্রিয়াকলাপ এবং সূত্রসমূহ পুরোপুরিভাবে ভাবে জানি না। তারমানে এ নয় যে আমরা আমাদের জ্ঞানের ফাঁককে ঈশ্বর দ্বারা পূরণ করতে পারি। তারমানে এ নয় যে যা আমাদের বোধগম্য নয় তা ঈশ্বরের প্রমাণ বহন করে। তাছাড়া যদি ঈশ্বর ম্যাটার এবং এনার্জি তৈরি করতে পারে তাহলে কোনো এক ন্যাচারাল প্রসেস কেন নয় যা এখনো আমাদের বোধগম্য নয়?

আমরা যদি মেনেও নেই, সবকিছুর পূর্বে কোনো শক্তির অস্তিত্ব ছিলো তবুও সেই শক্তি যে ঈশ্বরের ওপর আরোপিত কোনো বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করতে বাধ্য তার কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়াও সেই শক্তির যে অতিপ্রাকৃত বা আধ্যাত্মিক হতে হবে তারও কোনো প্রমাণ নেই। সেটা পদার্থবিদ্যাগত সূত্রসমূহ দ্বারা ঘটিত কোনো ঘটনার মতোই একটি ঘটনা হতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাসীদের মহাজাগতিক যুক্তি কিছুই প্রমাণ করতে পারেনা যদিনা ঈশ্বরের সংজ্ঞা হয় এরকম “শক্তি যা মহাবিশ্ব তৈরি করেছে”। আর যদি সেরকমই হয় তাহলে আমরা ‘ইলেক্ট্রিসিটি’, ‘গ্র‍্যাভিটি’ অথবা ‘প্রবল নিউক্লীয় বলকে একরকম ঈশ্বর বলে দাবি করতে পারি।

‘ঈশ্বর যে নেই’ তার প্রমাণ কি?

বিশ্বাসীদের সাথে ঈশ্বরবাদ সম্পর্কে বিভিন্ন তর্ক বিতর্কের পর তারা যখন আর কোনো লজিক্যাল ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে না তখন তারা প্রশ্ন করেন এমন, ‘ঈশ্বর নেই’ তার প্রমাণ কি? তাদের দাবি এরকম, যেহেতু আপনি প্রমাণ দেখাতে পারবেন না যে, ঈশ্বর বলে কেউ নেই সেহেতু ঈশ্বর বলে কেউ একজন আছেন অথবা ঈশ্বরে বিশ্বাস লজিক্যাল।

ঈশ্বরবাদীদের এরকম লজিক কেন গ্রহণযোগ্য নয় তা একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছি। ধরা যাক, আমি দাবি করলাম ‘আপনার খাটের নিচে একটি অদৃশ্য কচ্ছপ আছে’। তারপর আপনি অনেক অনুসন্ধান করেও কোনো অদৃশ্য কচ্ছপ খুঁজে পেলেন না এবং বললেন আপনার খাটের নিচে কোনো কচ্ছপ নেই। এখন আপনাকে আমার কি জবাব দেওয়া উচিৎ? আপনার খাটের নিচে কচ্ছপ নেই তার প্রমাণ কি, এমন অর্থহীন কিছু বলা উচিৎ নাকি আপনার খাটের নিচে কচ্ছপ আছে কিনা সেটা প্রমাণ করা উচিৎ?

আপনার খাটের নিচে যদি কচ্ছপ না থাকে তাহলে “খাটের নিচে কচ্ছপ নেই” সেটা আপনি কিভাবে প্রমাণ করবেন? সেটা তো এমনিতেই প্রমাণিত। বরং কেউ যদি “কচ্ছপ আছে” বলে দাবি করে বা মনে করে খাটের নিচে কচ্ছপ আছে তাহলে কিভাবে আছে কোথায় আছে কেন আছে সেসব তাকেই প্রমাণ করতে হবে।

একইভাবে যিনি দাবি করেন ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে তাকেই প্রমাণ করতে হবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে, তার ওপরেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের দায়িত্ব চলে আসে।

ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হয়ে বিপরীত জনকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অপ্রমাণের বোঝা চাপানো যুক্তিবিদ্যা অনুযায়ী Burden of proof fallacy তে পড়ে। নিজের দাবি সঠিক প্রমাণিত করতে না পেরে বিপরীত জনকে সেই দাবি অপ্রমাণের বোঝা চাপানো হলে তা Burden of proof fallacy বলে বিবেচিত হয়।

মাতৃগর্ভের যমজ বাচ্চার গল্প

ঈশ্বর এবং পরকাল বিশ্বাসীদের মধ্যে একটি গল্প প্রচলিত আছে যা তুলে ধরে তারা মাঝেমাঝে বোঝাতে চায় যে ঈশ্বর বা পরকাল বিশ্বাস খুবই লজিক্যাল। আমি আগে সেই গল্পটা ছোট করে তুলে ধরবো এবং পরে ব্যাখ্যা করবো সেই গল্পটা আসলে কেন গ্রহণযোগ্য নয়।

একটি মাতৃগর্ভে জমজ দুই শিশুর মধ্যে কথা হচ্ছে। প্রথম জন দ্বিতীয় জনকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি প্রসব পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করো”? দ্বিতীয় জন বলে,”হ্যা করি। নিশ্চয় প্রসব পরবর্তী জীবন বলে কিছু আছে, হয়তো সেজন্যই আমরা এখানেই আছি”। তারপর আবার প্রথম জন বলে, “আরে বোকা পরবর্তী জীবন বলে কিছু নেই। তোমার সেই কাল্পনিক জগত কেমন হতে পারে বলতো দেখি”? দ্বিতীয়জন বললো, ”আমি ঠিক জানিনা। তবে হতে পারে সেখানে এখানের (মাতৃগর্ভ) তুলনায় আলো অনেক বেশি হবে। হতে পারে সেখানে আমরা আমাদের পা দিয়ে হাঁটতে পারবো। প্রথমজন বললো, “এটা নিছক কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। পা দিয়ে হাঁটাহাঁটি? অসম্ভব”। দ্বিতীয়জন বললো, ”আমি মনে করি প্রসব পরবর্তী জীবন বলে কিছু আছে এবং সেটা এই মাতৃগর্ভের জীবনের চেয়ে ভিন্ন”।

প্রথমত, পরকাল বিশ্বাসের ধারনা ঈশ্বর ধারনা থেকেই এসেছে। ঈশ্বর ধারনা অসার প্রমাণিত হলে পরকাল ধারনাও অসার প্রমাণিত হয়ে যায়। একজন ঈশ্বরবাদী যেসব কারণে মনে করে একজন ঈশ্বর অবশ্যই আছেন তা উপরে ইতিমধ্যে ভুল প্রমাণ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, একজন মানুষের মৃত্যুবরণ করার সাথে মাতৃগর্ভ থেকে একটা বাচ্চা প্রসব হওয়ার তুলনা করা ভুল। কেননা পরকালের ধারনা অনুযায়ী একজন মানুষ তার দেহত্যাগ করে পরকাল গমন করে। অপরদিকে মাতৃগর্ভ থেকে বাচ্চা তার দেহ নিয়েই পৃথিবীতে জন্মলাভ করে। পরকালের ধারনা অনুযায়ী মানুষ আত্মা ত্যাগ করলে একজীবন থেকে আরেক জীবনে প্রবেশ করে। অপরদিকে মাতৃগর্ভের আত্মা ত্যাগের কোনো ব্যাপারস্যাপার নেই।

পরকালের ধারনা এসেছে আত্মা ধারনা থেকে। আগের দিনের মানুষ জানতো না মানুষ কেন বেঁচে থাকে, কেন মারা যায় অথবা কেন কথা বলতে পারে, কেন কোনো অনুভূতি অনুভব করতে পারে বা কেন ভালবাসতে পারে। আগের দিনের মানুষের কাছে এসব প্রশ্নের একমাত্র সমাধান ছিলো আত্না ধারনা। তাদের ধারনা ছিলো এমন যে আত্মা নামক অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কারণে মানুষ বেঁচে থাকে এবং সেই অতিপ্রাকৃতিক শক্তি দেহত্যাগ করলেই মানুষের মৃত্যু হয় ও পরকালের যাত্রা আরম্ভ হয়। মৃত্যুর পরও মানুষের অস্তিত্ব থাকে এমন ধারনা আত্না ধারনা থেকেই এসেছে।

বাস্তব জগতে আত্মা বলে কিছু নেই। জীববিদ্যা প্রাণীর বেঁচে থাকা, মারা যাওয়া, অনুভব করা, চিন্তা করা, কথা বলাসহ প্রায় সবকিছুই ব্যাখ্যা করতে পারে এবং তাতে আত্মা নামক কোনো অতিপ্রাকৃতিক ধারনার প্রয়োজন হয় না। আমরা নিজেদের মনকে আত্মা বা অলৌকিক কিছু মনে করি। মন অতিপ্রাকৃতিক কোনো শক্তি নয় যার উপস্থিতিতে মানুষ বেঁচে থাকে বা ত্যাগ করলে মানুষ মারা যায়। মন মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের কাজকর্মের ফলাফল। দেহের বিভিন্ন অঙ্গের যেমন আলাদা কিছু কাজ আছে তেমনি মস্তিষের কাজ হলো চিন্তা করা। মানুষের আমিত্ব, আকাঙ্ক্ষা, বেদনা, সংবেদনশীলতা, স্মৃতি ইত্যাদি মানুষের মস্তিষের স্নায়ুকোষ এবং তাদের আনুষঙ্গিক অনুর বিবিধ ব্যবহার মাত্র। কথাটি বলেছেন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক তার The Astonishing Hypothesis : The Sscientific Search for the soul গ্রন্থে [2]। মৃত্যু মানে কাল্পনিক আত্মার দেহত্যাগ নয়, মৃত্যু মানে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ অচল হয়ে যাওয়া। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ অচল হয়ে গেলেই আমরা মনেকরি কাল্পনিক আত্মা দেহত্যাগ করেছে। (আত্মা জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে আরও অনেক তথ্য ও নিখুঁত বিশ্লেষণ পেতে অভিজিৎ রায় এবং রায়হান আবীরের ‘অবিশ্বাসের দর্শন‘ বইয়ের ‘আত্মা নিয়ে ইতং বিতং’ অধ্যায়টি বিশেষ পাঠ্য।)

অর্থাৎ যমজ বাচ্চার গল্পে আগেই ধরে নেওয়া হয়েছে “আত্মা” বলতে আসলেই কিছু আছে। অথচ “আত্মা” প্রাচীন মানুষের ধারনা ব্যতীত কোনো প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়।

যাইহোক শেষকথা হিসেবে বলতে চাই, লজিক্যাল ফ্যালাসি প্রয়োগ করে নিজেকে ধর্মীয় অন্ধত্বে ফেলে রাখা যায়, ধর্মান্ধদের আরও অনেক বেশি ধর্মান্ধ করে রাখা যায় তবে লজিক্যালি কোনোকিছু প্রমাণ করা যায়না।

1. Atkins, peter, The laws of thermodynamics: A very short introduction. Oxford: Oxford University press, 2010. 2. ‎Francis, The Astonishing Hypothesis : The Scientific Search for the soul, 1995, Scribner

19 comments
Enjoy
Free
E-Books
on
Just Another Bangladeshi
By
Famous Writers, Scientists, and Philosophers 
Our Social Media
  • Facebook
  • Twitter
  • Pinterest
Our Partners

© 2023 by The Just Another Bangladeshi. Proudly created by Sen